হিমাগারের ভাড়া কমানোর দাবিতে ২য় দিনের মতো বন্ধ আলু কেনাবেচা

ছবি: আগামীর সময়
হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কমানোর দাবিতে রাজশাহীতে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের আন্দোলন দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে জেলার বিভিন্ন হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন ও বেচাকেনা কার্যক্রম রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ বন্ধ। এতে রাজশাহীর আলু সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে পবা উপজেলার সরকার কোল্ড স্টোরেজ ও উত্তরা কোল্ড স্টোরেজ ঘুরে দেখা যায়, সাধারণ সময়ে যেখানে ট্রাক, শ্রমিক ও পাইকারদের উপস্থিতিতে সরগরম থাকে, সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা। আলু উত্তোলন, পরিবহন কিংবা লোড-আনলোডের কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।
আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, হিমাগারের ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে, যা তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। তারা বলছেন, প্রকৃত খরচের ভিত্তিতে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত আলু উত্তোলন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ থাকবে।
রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষণা করে। সংগঠনের সভাপতি আহাদ আলী শাহ বলছিলেন, এক বস্তা আলু সংরক্ষণে হিমাগারের প্রকৃত খরচ সর্বোচ্চ ১০০ টাকা হলেও আমাদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৪৭৫ টাকা পর্যন্ত। এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও চাপিয়ে দেওয়া খরচ।
তিনি আরও বলছিলেন, এর আগেও ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল। তখন প্রশাসন ও বিভিন্ন মহলের অনুরোধে আমরা কর্মসূচি স্থগিত করেছিলাম। বলা হয়েছিল রাজনৈতিক সরকার এলে বিষয়টির সমাধান হবে। কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ব্যবসায়ী আহাদ আলী শাহ জানান, রাজশাহীতে ৩৬টি হিমাগার রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৬ হাজার বস্তা আলু বাজারে সরবরাহ হওয়ার কথা থাকলেও আন্দোলনের কারণে সেই সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরাও। কৃষক হারুন বললেন, স্টোর ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।
অন্যদিকে হিমাগার মালিকদের দাবি, বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে। আসমা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য খন্দকার আউলিয়া ওয়াহিদ রাজিব বলেছেন, গত বছর ভাড়া বৃদ্ধির পরও আমরা কৃষকদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছিলাম। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও অন্যান্য ব্যয় অনেক বেড়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, ভাড়া নিয়ে অসন্তোষের কারণে চাষি ও ব্যবসায়ীরা আলু উত্তোলন বন্ধ রেখেছেন, ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে দীর্ঘ সময় ধরে হিমাগার থেকে আলু বাজারে না এলে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এর প্রভাব পাইকারি ও খুচরা উভয় বাজারেই পড়তে পারে।
রাজশাহী জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেন বলছিলেন, এটি মূলত ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের মধ্যকার বিষয়। সরকার এখনো এ মৌসুমের জন্য আলুর নির্ধারিত মূল্য ঘোষণা করেনি। ফলে সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত।
তিনি আরও বলেন, বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে কে বেচাকেনা করবে বা করবে না, তা প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
দুই দিন ধরে চলা আন্দোলনের কারণে এখনো হিমাগারগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। আলু বোঝাই ট্রাকের সারি নেই, শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যও থেমে গেছে। ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। ফলে এই অচলাবস্থা কবে কাটবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।





