নৈতিক শিক্ষা অবশ্যই অবশ্যপাঠ্য

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধানতম সমস্যা হলো দুর্নীতি। সুনীতির অভাব হলেই দুর্নীতি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তাই জাতীয় প্রয়োজনেই সর্বাগ্রে সুনীতির শিক্ষণ ও চর্চা প্রয়োজন। সুনীতির অন্য নামই হচ্ছে নৈতিকতা। মানুষের নৈতিক জীবন গড়ে ওঠে বাল্যকাল থেকেই। বলা চলে বাল্যকালের শিক্ষা ও অভ্যাসই মানুষের সমগ্র জীবনে প্রভাব ফেলে। শিশুকাল থেকেই চরিত্র গঠনের বিশেষ শিক্ষা পেলে মানুষ সুন্দর নৈতিক জীবনের দিকে অগ্রসর হতে পারে। এজন্য শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমে নৈতিক শিক্ষার বিশেষ পাঠ থাকা জরুরি।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় তাদের শিক্ষক এবং পাঠ্যপুস্তক দ্বারা। পাঠ্যবইকে তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং শিক্ষকের নির্দেশনাকে তারা পিতামাতার নির্দেশনার চেয়েও বেশি অনুসরণযোগ্য বলে মনে করে। তাই স্কুলপর্যায়ে নৈতিক শিক্ষায় পাঠ থাকলে ছোটবেলা থেকেই একটি শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে। ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করলে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা ছোটবেলা থেকে পেলে সেই মানবশিশুর অন্তরে সেটা দৃঢ়ভাবে গেঁথে যায় এবং এই
দেশের বর্তমান স্কুলপর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমে নৈতিক শিক্ষার কোনো স্বতন্ত্র পাঠ নেই। আমাদের ছোটবেলায় বাল্যশিক্ষার বইয়ে অনেক নীতিকথা ছিল। আজও সেখানের অনেক নীতিবাক্য। কিন্তু প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে স্কুল শিক্ষা কার্যক্রমের, এমনকি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কোথাও নৈতিক শিক্ষার কোনো সুযোগ নেই। উচ্চশিক্ষায় একমাত্র দর্শনের অন্তর্গত ‘নীতিবিদ্যা’ নামক একটি কোর্স পড়ানো হয়ে থাকে। সম্প্রতি ব্যবসায় নীতিবিদ্যাসহ প্রায়োগিক নীতিবিদ্যার কিছু দিক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা শুরু হয়েছে।
এ জাতির জন্য প্রবর্তিত সব শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে প্রণীত শিক্ষানীতিতেও নৈতিক শিক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে নৈতিক আর ধর্মশিক্ষাকে একসঙ্গে করে ফেলা হয়েছে। ধর্মশিক্ষা অবশ্যই জরুরি। ধর্মের মূল শিক্ষা কল্যাণকর। তবে নৈতিক শিক্ষাকেও স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে আবশ্যিক করা জরুরি। এর মাধ্যমে সব শিক্ষার্থীকে সর্বজনীন বা কমন কিছু চারিত্রিক শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নৈতিক আর ধর্মশিক্ষাকে একসঙ্গে করে ফেলা হয়েছে। ধর্মশিক্ষা অবশ্যই জরুরি। ধর্মের মূল শিক্ষা কল্যাণকর। তবে নৈতিক শিক্ষাকেও স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে আবশ্যিক করা জরুরি
প্রাক প্রাথমিক স্তরে কিছু নীতিবাক্য, প্রথম শ্রেণি থেকে কিছু নীতিশিক্ষামূলক কবিতা, গল্প এবং পর্যায়ক্রমে সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা, পরমতসহিষ্ণুতা, ক্ষমা, পিতামাতার প্রতি কর্তব্য, দেশের প্রতি কর্তব্য, মানবসেবা, সৃষ্টজগতের প্রতি দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, পরপোকার ইত্যাদি সদগুণসমূহের ওপর বিভিন্ন শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়া হলে নিঃসন্দেহে তা তাদের জীবনে প্রভাব ফেলবে। এজন্য আলাদা একটি পাঠ্যপুস্তক থাকতে হবে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক এবং ব্যবসায় শিক্ষা সর্বক্ষেত্রেই নৈতিক শিক্ষা নামক একটি আলাদা কোর্স বাধ্যতামূলক
নৈতিক আচরণ করতে হলেও জানা দরকার কোন ধরনের কাজ নৈতিক এবং কোন ধরনের কাজ অনৈতিক। বস্তুত জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের চিন্তা, কর্ম ও বিশ্বাসের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। সক্রেটিস মনে করতেন ‘জ্ঞানই পুণ্য’। তিনি তার শিষ্যদের বোঝাতে চেষ্টা করেন, অজ্ঞানতাই সব অপকর্ম বা অশুভ কর্মের মূল কারণ। আমরা হয়তো মনে করি যে, যারা অন্যায় কাজ করে তারা তো জেনেশুনেই অনেক সময় অন্যায় করে থাকে। কিন্তু সক্রেটিসের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তিনি
আমাদের কোমলমতি শিশুদের যদি এটা বোঝানো যায় যে, ভালো কাজই জীবনকে সুন্দর, শান্তিময় করে আর মন্দ কাজ জীবনকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে— তাহলে অবশ্যই তারা ভালো কাজে উৎসাহী হবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে চেষ্টা করবে। এ প্রক্রিয়াটি যদি ছোটবেলা থেকে কারও অভ্যাসে পরিণত হয় তাহলে এটি হবে তার চরিত্রের অংশ। সৎচরিত্র বলতে অ্যারিস্টটল ভালো কাজ করার অভ্যাস ও প্রবণতাকেই বুঝিয়েছেন। ছোটবেলা থেকে ভালো কাজের অভ্যাস ও প্রবণতা সুদৃঢ়
তবে এখানে একটি প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক যে, নৈতিক শিক্ষার পর্যাপ্ত পাঠ প্রদান করা হলেই কি সবাই নৈতিক আচরণে অভ্যস্ত হবে? ছোটবেলা থেকে মানুষ অনেক নৈতিক শিক্ষাই পরিবার ও সমাজ থেকে গ্রহণ করে কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ সবসময় দেখা যায় না। এ বিষয়টি মোটেই এ বিদ্যার কোনো ত্রুটি নয়, বরং এ বিদ্যা যারা শেখাচ্ছেন অথবা যেসব প্রতিষ্ঠানে এগুলোর জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব হলো এ বিদ্যাকে
লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাবি



