চাকরিজীবীদের যেসব আয় ও সুবিধা করমুক্ত

সংগৃহীত ছবি
চাকরি খাতের আয়ের ক্ষেত্রে বেতন-ভাতার সঙ্গে পাওয়া প্রতিটি অর্থ বা সুবিধার ওপর আয়কর দিতে হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। চাকরি থেকে পাওয়া কোনো অর্থ করযোগ্য কি না, তা নির্ভর করে অর্থটি কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, কোন শর্তে পাওয়া গেছে এবং তা কোথায় ব্যয় হয়েছে, তার ওপরও। আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৩২(২)-এ চাকরি থেকে পাওয়া কয়েক ধরনের অর্থ ও সুবিধাকে করযোগ্য ‘চাকরি হইতে আয়’-এর বাইরে রাখা হয়েছে। সাধারণ চাকরিজীবী করদাতাদের জন্য এই বিধানগুলো জানা তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত গুরুতর রোগের চিকিৎসায় নিয়োগকর্তার আর্থিক সহায়তা, অফিসের দায়িত্ব পালনের জন্য পাওয়া কিছু ভাতা এবং গোষ্ঠী বীমাসংক্রান্ত সুবিধার ক্ষেত্রে, যেখানে আইন স্পষ্টভাবে কর-অব্যাহতির সুযোগ রেখেছে।
গুরুতর রোগের চিকিৎসায় সহায়তা করযোগ্য নয়
বড় ধরনের অসুস্থতার চিকিৎসা একটি পরিবারের আর্থিক অবস্থাকে মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে। এমন সময়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে কর্মচারীর পাশে অনেক সময় নিয়োগকর্তাও দাঁড়ায়। আয়কর আইনে এ ধরনের সহায়তার ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার পরিচালক নন—এমন একজন কর্মচারী নির্দিষ্ট গুরুতর রোগের চিকিৎসার জন্য নিয়োগকর্তার কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেলে সেই অর্থ তাঁর চাকরি থেকে করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য হবে না। আইনে উল্লেখ করা চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে হৃদযন্ত্র, কিডনি, চক্ষু, যকৃত বা মস্তিষ্কের অপারেশন, কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং ক্যানসারের চিকিৎসা।
ধরা যাক, একজন কর্মচারীর কিডনি বা হৃদযন্ত্রের বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলো এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান চিকিৎসার ব্যয়ের একটি অংশ বহন করল। আইন নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সেই সহায়তাকে কর্মচারীর অতিরিক্ত বেতন, পারকুইজিট বা করযোগ্য চাকরির আয় হিসেবে গণ্য করতে হবে না। এর তাৎপর্য সহজেই বোঝা যায়। একজন কর্মচারী যখন বড় ধরনের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে থাকেন, তখন সেই সহায়তার ওপর আবার আয়কর আরোপ হলে তাঁর আর্থিক দুর্দশা আরও বাড়ত। আইন ঠিক এই জায়গাতেই কর্মচারীকে বাড়তি চাপ থেকে সুরক্ষা দিয়েছে।
অফিসের কাজে পাওয়া ভাতা কখন করমুক্ত
চাকরির দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মচারীদের প্রায়ই অফিসের বাইরে যেতে হয়—কখনো অন্য জেলায়, কখনো অন্য শহরে, আবার কখনো দিনের পর দিন কর্মস্থলের বাইরে অবস্থান করে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কর্মচারীকে যাতায়াত ভাতা, ভ্রমণ ভাতা বা দৈনিক ভাতা দিতে পারে। তবে এ ধরনের অর্থ কর্মচারীর হাতে এলেই তা তাঁর ব্যক্তিগত আয় হয়ে যায় না।
আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৩২(২)(খ) এবং ষষ্ঠ তফসিলের ধারা ১৪ অনুযায়ী, চাকরির দায়িত্ব পালনের জন্য পাওয়া যাতায়াত ভাতা, ভ্রমণ ভাতা, দৈনিক ভাতা এবং অন্যান্য ব্যয় পুনর্ভরণ করযোগ্য চাকরির আয় হিসেবে গণ্য হবে না, যদি সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্যই দেওয়া হয় এবং সম্পূর্ণভাবে সেই কাজেই ব্যয় করা হয় এবং নিয়োগকর্তার জন্য উক্ত কর্মচারীর মাধ্যমে এইরূপ ব্যয় নির্বাহ সবচেয়ে সুবিধাজনক ছিল।
যেমন, ধরা যাক একজন কর্মকর্তা অফিসের কাজে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গেলেন। প্রতিষ্ঠান তাঁকে যাতায়াত, হোটেল ও দৈনিক খরচ বাবদ ২০ হাজার টাকা দিল। তিনি যদি ওই অর্থ যাতায়াত, থাকা এবং সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল কাজের ব্যয়েই ব্যবহার করেন, তাহলে সেই ২০ হাজার টাকা তাঁর ব্যক্তিগত উপার্জন নয়; ফলে তা করযোগ্য চাকরির আয়ের অংশও হবে না।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোনো অর্থের নাম ‘ভ্রমণ ভাতা’ বা ‘দৈনিক ভাতা’ হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হয়ে যায় না। দেখতে হবে, অর্থটি সত্যিই চাকরির দায়িত্ব পালনের জন্য দেওয়া হয়েছিল কি না এবং সেই উদ্দেশ্যেই ব্যয় হয়েছে কি না। অর্থাৎ ভাতার নামের চেয়ে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ব্যবহারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অর্থ যদি কার্যত অতিরিক্ত পারিশ্রমিক বা ব্যক্তিগত সুবিধা হিসেবে দেওয়া হয়, শুধু ‘ভাতা’ নাম দিলেই তা করযোগ্য আয়ের বাইরে চলে যাবে না।
গোষ্ঠী বীমার প্রিমিয়ামেও স্বস্তি
বেসরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে কর্মীদের জন্য গোষ্ঠী বীমা বা গ্রুপ ইনস্যুরেন্সের প্রচলন ক্রমেই বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ঝুঁকি মোকাবিলায় গোষ্ঠী বীমা পলিসি নেয় এবং কর্মচারীর পক্ষে প্রিমিয়াম সরাসরি বীমা কোম্পানিকে পরিশোধ করে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার পরিশোধ করা সেই প্রিমিয়ামের অর্থ আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৩২(২)(গ) এবং ষষ্ঠ তফসিলের ধারা ৩৭ অনুযায়ী কর্মচারীর করযোগ্য চাকরির আয় হিসেবে গণ্য হবে না। এখানেই শেষ নয়—গোষ্ঠী বীমার আওতায় কোনো কর্মচারী চিকিৎসা নেওয়ার পর বীমা কোম্পানি তাঁর চিকিৎসা ব্যয় ফেরত দিলে বা রিইম্বার্স করলে সেই অর্থও চাকরি থেকে আয় হিসেবে বিবেচিত হবে না।
ধরা যাক, একজন কর্মচারী প্রতিষ্ঠানের গ্রুপ স্বাস্থ্যবীমার আওতায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেন এবং বিলের একটি অংশ পরে বীমা কোম্পানি পরিশোধ করল বা তাঁকে ফেরত দিল। এই অর্থ তাঁর বেতন নয়, বোনাসও নয়—ফলে আইন অনুযায়ী একে করযোগ্য চাকরির আয় বা পারকুইজিট হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। কর্মচারীর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কর-সুবিধা, আর প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও কর্মীবান্ধব স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা চালু রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক দিক।
উপরোক্ত সুবিধাগুলো ছাড়াও, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ষষ্ঠ তফসিলের ধারা ৬ অনুযায়ী, গ্রাচুইটি তহবিল থেকে গ্রাচুইটি হিসেবে প্রাপ্ত অনধিক ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা করমুক্ত আয় হিসেবে বিবেচিত হবে। তাছাড়া, নিয়োগকর্তা কর্তৃক স্বীকৃত ভবিষ্যৎ তহবিল, অনুমোদিত বার্ধক্য তহবিল ও পেনশন তহবিলে গৃহীত চাঁদা এবং উক্ত তহবিল থেকে বিতরণকৃত আয় করমুক্ত আয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
এছাড়া, ষষ্ঠ তফসিলের ধারা ২৭ অনুযায়ী, চাকরিজীবী করদাতার চাকরির খাতে পরিগণিত আয়ের এক-তৃতীয়াংশ বা পাঁচ লাখ টাকা, যাহা কম, তা করমুক্ত আয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
কাগজপত্র সংরক্ষণ জরুরি
আইনে কোনো সুবিধা থাকলেই কেবল সেটি জানলে দায়িত্ব শেষ হয় না; প্রয়োজনে প্রমাণ করতে হতে পারে যে সংশ্লিষ্ট অর্থ বা সুবিধাটি সত্যিই আইনে নির্ধারিত শর্তের আওতায় পড়ে। তাই গুরুতর রোগের চিকিৎসায় নিয়োগকর্তার সহায়তা পেলে চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র, হাসপাতালের বিল, চিকিৎসকের নথি এবং প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনপত্র সংরক্ষণ করা ভালো। অফিসিয়াল ভ্রমণের ক্ষেত্রে ট্যুর অনুমোদন, যাতায়াতের টিকিট, হোটেলের বিল, ভাউচার এবং ব্যয়ের হিসাব রাখা উচিত।
একইভাবে গোষ্ঠী বীমার পলিসি, প্রিমিয়ামসংক্রান্ত তথ্য এবং চিকিৎসা ব্যয় ফেরত পাওয়ার নথিও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এসব নথি শুধু হিসাব রাখার জন্য নয়; কোনো অর্থ কেন করযোগ্য আয়ের বাইরে রাখা হয়েছে, প্রয়োজনে তার যৌক্তিকতা প্রমাণেও এগুলো কাজে আসবে।
সব সুবিধাকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক নয়
আয়কর রিটার্ন তৈরির সময় একটি সাধারণ ভুল হলো, নিয়োগকর্তার কাছ থেকে পাওয়া সব অর্থ ও সুবিধাকে একসঙ্গে যোগ করে করযোগ্য আয় ধরে নেওয়া। আবার এর বিপরীত ভুলও কম হয় না, কোনো অর্থের নাম ‘ভাতা’, ‘সহায়তা’ বা ‘রিইম্বার্সমেন্ট’ হলেই সেটিকে করমুক্ত মনে করা। দুটিই এড়িয়ে চলা দরকার। কোন অর্থটি বেতন, কোনটি ব্যক্তিগত সুবিধা, কোনটি প্রকৃত অফিসিয়াল ব্যয়ের প্রতিপূরণ এবং কোন সুবিধাকে আইন স্পষ্টভাবে করযোগ্য আয়ের বাইরে রেখেছে—এই পার্থক্য বুঝেই আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত করা উচিত।
চাকরি থেকে পাওয়া সব অর্থ ও সুবিধার ওপর আয়কর দিতে হয় না। গুরুতর কিছু রোগের চিকিৎসায় নিয়োগকর্তার সহায়তা, প্রকৃত অফিসিয়াল দায়িত্ব পালনের জন্য পাওয়া ও ব্যয় করা যাতায়াত, ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা এবং গোষ্ঠী বীমাসংক্রান্ত নির্দিষ্ট সুবিধাকে আইন করযোগ্য চাকরির আয়ের বাইরে রেখেছে। চাকরিজীবী করদাতার কাজ তাই এসব সুবিধা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করা। এতে একদিকে যেমন আইনসম্মত কর-সুবিধা পাওয়া যাবে, তেমনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি কর পরিশোধের ঝুঁকিও কমবে।
লেখক : আর্থিক খাতের বিশ্লেষক



