জাঁকজমক কপে ‘জলবায়ু বাণিজ্য’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নভেম্বরেই তুরস্কের আনতালিয়া শহরে যখন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের ৩১তম আসর (COP31) বসতে যাচ্ছে। বিগত তিন দশক ধরে এই বৈশ্বিক সম্মেলন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছে; শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাচের প্রাসাদে বসে জলবায়ু কূটনীতিবিদরা বোতলের জল হাতে নির্গমন হ্রাসের দশমিক বিন্দু নিয়ে বিতর্ক করেছেন, অন্যদিকে আমাদের দেশের প্রমত্ত নদীগুলো নীরবে গিলে খাচ্ছে কতশত বসতভিটা, সোনাঝরা ফসলের মাঠ আর পূর্বপুরুষের স্মৃতির মিনার।
গত ৩০ বছরের কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা আজ এক নির্মম প্যারাডক্সের জন্ম দিয়েছে— সম্মেলনগুলোর জাঁকজমক যত বেড়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের মূল ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা তত গাঢ় হয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ুপ্রেক্ষিত থেকে এ প্রক্রিয়াটিকে দেখলে মনে হয় এটি এক বিয়োগান্তক নাট্যশালা; সংকটকে টিকিয়ে রেখে নিয়ন্ত্রণের এক নিখুঁত আমলাতান্ত্রিক যন্ত্র মাত্র। কপ প্রক্রিয়ার এ ব্যর্থ চক্র থেকে যদি আনতালিয়া সম্মেলনকে মুক্ত করতে হয়, তবে বিশ্ব জলবায়ু শাসনের পুরো কাঠামোটিকে শিকড় থেকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। আর এ পরিবর্তনের যাত্রা শুরু করতে হবে আমাদের নিজেদের ঘর থেকেই— গত তিন দশকে রাষ্ট্র এবং নাগরিক সমাজ আমাদের দেশে কী ভূমিকা পালন করেছে, তার এক নির্মম ও নির্মোহ মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের জলবায়ু নীতির ইতিহাস একাধারে দূরদর্শী আইনগত প্রয়াসের এবং গভীর কাঠামোগত দীর্ঘসূত্রতার এক জটিল মোজাইক। ১৯৯২ সালে রিও জলবায়ু কনভেনশন স্বাক্ষরের পর থেকেই বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে শুরু করেছিল; ২০০৫ সালে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বা ‘নাপা’ প্রণয়ন এবং পরে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন তারই উজ্জ্বল প্রমাণ। কিন্তু এই ৩০ বছরের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর ভূমিকা বারবার জরুরি সংকট মোকাবিলা আর প্রথারূপী টেকনোক্রেসির দোলাচলে দোলায়িত হয়েছে।
২০২৩-৫০ মেয়াদি জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা কিংবা জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনার মতো চমৎকার ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত নীতিমালা আমরা প্রণয়ন করতে পেরেছি ঠিকই; কিন্তু প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারিনি। আমাদের অধিকাংশ অভিযোজন প্রকল্পই ঢাকার দাপ্তরিক কামরায় নকশা করা হয়েছে, যেখানে নদীভাঙন রোধ বা বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেয়ে ঠিকাদারনির্ভর ভারী কংক্রিট বাঁধ নির্মাণকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র জলবায়ু সংকটকে মৌলিক মানবাধিকার ও সমতার বিপর্যয় হিসেবে না দেখে, একে শুধু বিদেশি ঋণ ও প্রযুক্তি দিয়ে সমাধানযোগ্য এক প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে।
সম্মেলনগুলোকে আজ সফলভাবে গ্রাস করে নিয়েছে বহুজাতিক করপোরেশন আর জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের লবিস্টরা। আলোচনার টেবিলগুলো আজ কার্বন ট্রেডিং আর আইনি ফাঁকফোকর খোঁজার বাণিজ্য মেলায় পরিণত হয়েছে
নাগরিক সমাজ বাংলাদেশের এই পরিবেশ আন্দোলনে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছে। আন্তর্জাতিক দাতা গোষ্ঠীগুলো এই অঞ্চলে পা রাখার অনেক আগে থেকেই আমাদের নাগরিক সমাজের কর্মীরা প্রান্তিক মানুষের কষ্টার্জিত কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সাতক্ষীরার লবণাক্ততা, কুড়িগ্রামের নদীভাঙন কিংবা সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে তারাই প্রথম রাজপথে নেমেছিলেন। কিন্তু তিন দশক অতিক্রম করে আজ দেখা যাচ্ছে, আমাদের নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশও বিদেশি অনুদান ও প্রজেক্ট কালচারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে এক প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতার শিকার হয়েছে। বৈশ্বিক কাঠামোগত বৈষম্য কিংবা জীবাশ্ম জ্বালানির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে নাগরিক সমাজ প্রায়ই আপসকামী সেবা প্রদানে ব্যস্ত থেকেছে— যেমন লবণাক্ততার স্থায়ী প্রতিকার খোঁজার চেয়ে সাইক্লোন, পরে কিছু পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণকেই বড় সাফল্য বলে গণ্য করা হয়েছে।
রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের এই দ্বিবিধ ব্যর্থতা মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন বা ‘কপ’-এর কাঠামোগত ব্যর্থতারই এক অভ্যন্তরীণ রূপ। বিশ্বখ্যাত জলবায়ু ন্যায়বিচার কর্মী কুমি নাইডুর মতো আন্তর্জাতিক অধিকারকর্মীরা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, জাতিসংঘের এই সম্মেলনগুলোকে আজ সফলভাবে গ্রাস করে নিয়েছে বহুজাতিক করপোরেশন আর জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের লবিস্টরা। আলোচনার টেবিলগুলো আজ কার্বন ট্রেডিং আর আইনি ফাঁকফোকর খোঁজার বাণিজ্য মেলায় পরিণত হয়েছে।
অক্সফোর্ড সাসটেইনেবল ল প্রোগ্রাম এবং গ্র্যানথাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায় স্পষ্ট উঠে এসেছে, বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমেনি, কারণ এই আন্তর্জাতিক পরিকাঠামো আইনগতভাবে বাধ্যবাধকতার বদলে শুধু স্বেচ্ছাধীন প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করে টিকে রয়েছে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, ধনী দেশগুলো জলবায়ু তহবিলের নামে যে অর্থ ছাড় করে, তার সিংহভাগই অনুদান নয় বরং উচ্চ সুদের ঋণ; যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও গভীর ঋণগ্রস্ততায় ঠেলে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতি তার সব নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলেছে।
এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় স্তরেই নিজেদের ভূমিকা নতুন করে পর্যালোচনা, পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠন করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণাধীন অভিযোজন থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ বিকেন্দ্রীভূত ও সম্প্রদায়, চালিত পরিবেশ সুরক্ষায় মনোনিবেশ করা। স্থানীয় জ্ঞান ও প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানে ফিরে যেতে হবে; গ্রামীণ সমবায় ও উপজেলা প্রশাসনকে তাদের নিজস্ব পরিবেশগত সম্পদ ব্যবস্থাপনার পূর্ণ আইনি অধিকার দিতে হবে। অন্যদিকে নাগরিক সমাজকে দাতানির্ভরতার খোলস ছেড়ে আবার তার প্রতিবাদী ও সামাজিক আন্দোলনের শিকড়ে ফিরতে হবে— যাতে তারা প্রান্তিক মানুষের হয়ে শুধু কথাই না বলে; বরং তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে পারে।
প্রকৃত পরিবর্তন সবসময় সেখানেই অঙ্কুরিত হয়, যেখানে মানুষের বেদনা সবচেয়ে গভীর। শ্যামনগরের উপকূলে কিংবা উলিপুরের ভাঙনকবলিত নদীর তীরে সাধারণ মানুষ কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফান্ডের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে না; তারা বৃষ্টির জল ধরে রেখে, লবণসহিষ্ণু ধানের বীজ বুনে এবং বাঁশ আর জালের বেড়ায় জীবনকে আবার নতুন করে গড়ে তোলে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সালাটা ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, স্থানীয় নেতৃত্বাধীন অভিযোজন তখনই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়, যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সম্পদ ও ভূমির ওপর সরাসরি আর্থিক ও আইনি কর্তৃত্ব পায়।
জাতীয় বাজেটে সরাসরি জলবায়ু বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আমলাতান্ত্রিক মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সেই অর্থ সরাসরি তৃণমূলের নারী সমবায় ও যুবদলগুলোর হাতে পৌঁছায়। পাশাপাশি দেশের বিচারব্যবস্থায় বিশেষায়িত পরিবেশ আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে আরও শক্তিশালী ও সর্বজনীন করা প্রয়োজন, যা সাধারণ মানুষকে করপোরেট ও কাঠামোগত পরিবেশগত অপরাধের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ দেবে।
আনতালিয়ার কপ৩১ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশকে এবং গ্লোবাল সাউথের সমমনা দেশগুলোকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে, আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে করুণাভিক্ষা করে আমাদের আর মুক্তি মিলবে না। আমাদের সেখানে হাজির হতে হবে ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের সুনির্দিষ্ট ও আপসহীন দাবি নিয়ে, যার পেছনে থাকবে আইপিসিসির কঠোর বিজ্ঞানসম্মত উপাত্ত এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজের সুদৃঢ় আইনি ভিত্তি। আর আমাদেরও একটি সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পরিবেশ রক্ষায় জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানোই হতে পারে আমাদের প্রতিদিনের নাগরিক সংগ্রাম। আগামী ৩০ বছরের ইতিহাস জাতিসংঘের শীতল সম্মেলনকক্ষে লেখা হবে না; সে ইতিহাস রচিত হবে আমাদের সাধারণ মানুষের কাদামাখা পায়ে, নদী বাঁচানোর আকুলতায় এবং নতুন এক পৃথিবী গড়ে তোলার অপরাজেয় সাহসিকতায়। জোয়ার সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই না হয় লেখা হোক এক নতুন ভোরের ইতিহাস। খুব বেশি কি এই চাওয়া?
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও লেখক




