‘নামায়ন’ কি চলতেই থাকবে!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন কয়েকটি ইউনিয়নের নাম রাখা নিয়ে এক মহাবিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি নাম— ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির নামানুসারে ‘মীরবাড়ী’র নামকরণ করা হয়েছে। আর প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলে মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্তের নাম থেকে নেওয়া হয়েছে অন্য দুটি ইউনিয়নের নাম। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম অবশ্য সাফাই গেয়েছেন। তার দাবি, এ একেবারেই ‘কাকতালীয়’। ছেলেপুলে বা বংশের নামে নাকি নাম রাখা হয়নি। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণেই এই নামকরণ। উপরন্তু, প্রশাসনিক চুলচেরা বিশ্লেষণ আর গণশুনানির পরেই নাকি সিলমোহর পড়েছে।
এমনকি সংসদে দাঁড়িয়ে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের এই সাংসদ সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। বেশ রসিকতার মেজাজেই জবাব দিয়েছেন তিনি। তার টিপ্পনী— দেশের বহু নামি প্রতিষ্ঠানের নামই তো সীমান্ত বা দিগন্ত। সেগুলো কি সব তার নিজের? তিনি আরও এক কাঠি বাড়িয়ে বলেছেন, সন্তানদের নামে নাম রাখতেই যদি হতো, তবে নামের আগে একটা ‘মীর’ বসিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যেত।
শুনতে তার যুক্তিতে বেশ ধার আছে মনে হতেই পারে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ঢাকঢোলও পেটানো হয়েছে বটে। কিন্তু তাতে কি আর বিতর্ক ধামাচাপা দেওয়া যায়? উল্টো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে এখন তুমুল সমালোচনা চলছে। ট্রোলবন্যা বয়ে যাচ্ছে। মজার বিষয় হলো, শুধু যে বিরোধী শিবিরের মানুষই প্রশ্ন তুলছেন, তা কিন্তু নয়। খাঁটি বিএনপি সমর্থক বহু মানুষও এই নামকরণের যৌক্তিকতা নিয়ে আঙুল তুলেছেন। কারণ, আসল প্রশ্নটা লুকিয়ে রয়েছে অন্য এক গভীর জায়গায়।
আমজনতা আসলে কী দেখছে? পাবলিকের দরবারে কী বার্তা যাচ্ছে?
রাজনীতির দুনিয়ায় এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে মোক্ষম। কারণ, সাধারণ মানুষ সবসময় ক্ষমতাসীনের চশমা দিয়ে দুনিয়া দেখে না। তারা দেখে চোখের সামনে ঠিক কী ঘটছে। ঘটনাটা বাইরে থেকে কেমন দেখাচ্ছে। কী বার্তা ছড়াচ্ছে। আর সেই বার্তাই কিন্তু পরে আসল রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। ঠিক এ কারণেই এই নামকরণকে স্রেফ হালকা চালে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এ দেশের মানুষ নামকরণের নোংরা রাজনীতি বহু দেখেছে। অতীতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনামলে তো এটা একপ্রকার রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশ জুড়ে কতশত সেতু, বড় বড় স্থাপনা, ভবন, মেগা প্রজেক্ট, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় আর অবকাঠামোর নাম যে রাখা হয়েছিল, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। শুধু কেন্দ্র নয়; স্থানীয় স্তরেও একই রোগ বাসা বেঁধেছিল। কোথাও দলীয় নেতার নামে রাস্তা, কোথাও মস্ত স্মৃতিফলক। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পাতি জনপ্রতিনিধিরাও নিজেদের নাম কিংবা চৌদ্দপুরুষের পরিচয় অমর করে রাখার সস্তা প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলেন। ভাবখানা এমন, যেন ক্ষমতায় আসা মানেই ইট-পাথরের বুকে নিজের নামের একটা ছাপ রেখে যাওয়া।
অথচ দেখা গেছে, ক্ষমতার কুর্সি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেসব নামও হাওয়া হয়ে যায়। ফলক বদলায়। পুরনো সাইনবোর্ড ডাস্টবিনে যায়, নতুন নামফলকের আমদানি হয়। এক দলের দেওয়া নাম অন্য দল ক্ষমতায় এসে বদলে দেয়। আর এই খামখেয়ালিপনার চক্করে জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা স্রেফ জলে যায়। অথচ সাধারণ মানুষের জীবনে এর থেকে কানাকড়িরও লাভ হয় না। মানুষ দেখেছে, স্কুলে পড়ানোর মতো শিক্ষক নেই, অথচ নাম নিয়ে নোংরা রাজনীতি চলছে। হাসপাতালে ডাক্তার নেই, অথচ ভবনের গায়ে কার নাম জ্বলজ্বল করবে, তা নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে। রাস্তাঘাট খানাখন্দে ভরা, কিন্তু উদ্বোধনী ফলকে নাম খোদাই করা নিয়ে নেত্রীবৃন্দের উৎসাহের অন্ত নেই। এসব দেখে দেশের সাধারণ মানুষের মনে চরম রাজনৈতিক ক্লান্তি জন্মেছে। বগুড়ার ঘটনাটি নিয়ে সে কারণেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
রাজনীতিতে অনেক সময় চাক্ষুষ সিদ্ধান্তের চেয়ে ‘প্রতীকী বার্তা’ অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। একটা সামান্য নাম, একটা ছবি, একটা আলটপকা মন্তব্য কিংবা একটা ছোট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও জনমানসে সুনামি ডেকে আনতে পারে। কারণ, মানুষ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে আলাদা করে বিচার করে না। তারা সবটাই দেখে অতীতের তেতো অভিজ্ঞতার আলোয়। তাই জনগণের মনে যদি অতীতের কালো স্মৃতি ফিরে আসে, তবে প্রতিক্রিয়া তো এমন চড়া হতেই হবে।
বিএনপির অত্যন্ত সুহৃদ এবং ইনফ্লুয়েন্সার ফাহাম আব্দুস সালাম এক পোস্টে এই বগুড়া ইস্যুতে লিখেছেন, ‘আপনারা মনে হয় হাসিনার আমল থেকে কোনো শিক্ষা নেন নাই। ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করছেন। এই সমস্ত ফকিন্নি মেন্টালিটির কাজ আপনাদের কোথায় নিয়ে যাবে— ধারণাও করতে পারছেন না।’ হতে পারে তার ভাষা কড়া, কিন্তু এটাই সাধারণ জনমতের একটা বড় অংশের আসল প্রতিধ্বনি।
অথচ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কিন্তু রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের একটা সুন্দর বার্তা দিয়ে আসছিলেন। অন্তত তেমন একটা আশার আলো মানুষ দেখতে পাচ্ছিল। কেরানীগঞ্জে তার নিজের মা, আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নামে একটা বড় প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব যখন তিনি নিজেই নাকচ করে দিলেন, তখন সেই বার্তা আরও জোরালো হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে একে এক উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী নজির হিসেবেই দেখা হয়েছিল। আর ঠিক সেই ভালো লাগার জায়গা থেকেই বগুড়ার এই নয়া বিতর্ক স্বাভাবিকভাবেই এক চরম অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে।
দেশের মানুষ এখন আর পুরনো সেই পচা রাজনীতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চাইছে না। তারা সাইনবোর্ড না, দেখতে চায় এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তিনটি ইউনিয়নের নাম সত্যি সত্যিই ‘কাকতালীয়’ কি না, তা হয়তো আমলারা ফাইলের পাতায় প্রশাসনিকভাবে প্রমাণ করে দেবেন। কিন্তু মনে রাখা ভালো, রাজনীতির ময়দানে অনেক সময় অকাট্য সত্যের চেয়েও মানুষের বিশ্বাসটা অনেক বেশি ভারী হয়ে দাঁড়ায়। আর জনতা যখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, তখন সেই প্রশ্নকে স্রেফ ‘কাকতালীয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়াটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়




