অদৃশ্য ষড়যন্ত্র চলমান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শত বাধাবিপত্তির মধ্যেও আমরা বিএনপির জন্মলগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে আসছি। এবার প্রায় দুই দশক পর বিএনপি আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছি। গত ১৭ বছরের চরম জুলুম, নিপীড়ন ও বৈরী পরিবেশের মধ্যেও রাজপথ না ছেড়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীসহ সব রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মী যে বিরল দৃঢ়তা ও ইস্পাতকঠিন ঐক্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আমরা আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করব— এই আত্মবিশ্বাস ও আত্মতৃপ্তি আমাদের ছিল, আছে এবং থাকবে।
১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা পূরণে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা বটমূলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে এই নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীনতার ঘোষক তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনিই ছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।
দেশের স্বাধীনতার জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতিকে উজ্জীবিত করেছিলেন; ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে তিনি প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। তিনি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা ও গণতন্ত্র— এই তিনটি প্রত্যয় সামনে রেখে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশকে সমৃদ্ধ ও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে নেওয়া তার ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল সমৃদ্ধ দেশ গঠনে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। শহীদ জিয়ার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং দূরদর্শী বিভিন্ন কর্মসূচি তাকে দেশবাসীর কাছে ভীষণ জনপ্রিয় করে তোলে। জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এই দল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি, সবসময় প্রাধান্য দিয়েছে গণতন্ত্রকে।
বিএনপির রাজনীতি আগাগোড়াই শহীদ জিয়াউর রহমানের ঐক্যের রাজনীতি, অর্থাৎ দেশপ্রেমিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। কারণ, জাতি যদি ঐক্যবদ্ধ না থাকে, তাহলে সার্বভৌমত্বের ওপর আগ্রাসী শক্তি আঘাত হানতে পারে। এটাই ছিল শহীদ জিয়ার মূল ধারণা। সে কারণে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সব ধর্মের সমঅধিকারের ভিত্তিতে বিএনপি গঠিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতা আমরা ৪৮ বছর ধরে রাখতে পেরেছি বলেই শত বাধাবিঘ্নের মধ্যেও ঘুরেফিরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসছি।
বিএনপির রাজনীতি আগাগোড়াই শহীদ জিয়াউর রহমানের ঐক্যের রাজনীতি, অর্থাৎ দেশপ্রেমিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। কারণ, জাতি যদি ঐক্যবদ্ধ না থাকে, তাহলে সার্বভৌমত্বের ওপর আগ্রাসী শক্তি আঘাত হানতে পারে
১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল— তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বনির্ভর দলটি কি টিকে থাকবে? জিয়াউর রহমানের অবর্তমানে দল টিকবে না— এমন একটি ধারণা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু জিয়ার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী খালেদা জিয়া রাজনীতির কেন্দ্রভাগে উঠে আসেন। গৃহবধূ থেকে পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনি রাজনীতির সামনের সারিতে আসেন এবং দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ৯ বছর রাজপথে থেকে তিনি জিয়াউর রহমানের সেই নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করেছেন এবং ‘আপসহীন নেত্রী’ বা ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে জনগণের কাছে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন।
১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচনী পরাজয়ের পরও বিএনপি ভেঙে পড়েনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন পেয়ে (৪০.৯৭% ভোট) পুনরায় সরকার গঠন করে। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে খালেদা জিয়া ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই জয়ী হন, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক বিরল রেকর্ড।
পরে খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়ে বিএনপিকে ধ্বংস করার একটি চক্রান্ত ও নীলনকশা ছিল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে সাজা দিয়ে ম্যাডামকে জেলে দেওয়ার পর দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্বে আসেন। তিনি বিদেশের মাটিতে থেকেও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে, জুম ব্যবহার করে সারা দেশের নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের একক নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। তারেক রহমানের নেতৃত্বেই শেষ পর্যন্ত দেশে নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকার এসেছে। বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করার যে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত ছিল, তার মুখে ছাই দিয়েই তিনি নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন এবং আজ একজন প্রতিষ্ঠিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। অন্যদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মধ্যে এখন যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করার মতো বিকল্প কোনো নেতৃত্ব নেই।
২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বিএনপির ওপর চরম অত্যাচার-পীড়ন চলেছে। কেন্দ্রীয় নেতারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে; কিন্তু সুবিধাবাদী কিছু লোক ছিটকে গেলেও মূল নেতাকর্মীরা দল ত্যাগ করেননি। দীর্ঘ ১৭ বছরের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে।
এরপর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বর্তমানে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এ পর্যন্ত বিএনপি মোট পাঁচবার সরকার গঠন করার গৌরব অর্জন করেছে, যা দলের মূল সফলতা।
একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এ অবস্থায় জাতির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই; দৃশ্যমান না হলেও অদৃশ্য ষড়যন্ত্র চলমান। সেই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই আমাদের লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাচনী অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এই ছয় মাসে প্রতিশ্রুতির প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি মজবুত ‘ভিত্তি’ স্থাপিত হয়েছে। এগুলো পরিপূর্ণ করার জন্য যে আন্তরিকতা প্রয়োজন, তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে রয়েছে। জনগণও বিশ্বাস করে— বিএনপি পারবে এবং বিএনপি করবে। জনগণের সেই আস্থা নিয়েই বিএনপি সামনের দিনগুলোতে একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।
লেখক: স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)








