যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সমানে সমান

যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির প্রধানতম গন্তব্য কানাডা। আমদানির ক্ষেত্রে কানাডার অবস্থান তৃতীয়। আর কানাডার রপ্তানির পঁচাত্তর ভাগ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। আমদানির অর্ধেকই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। দুদেশের বাণিজ্য কমবেশি আটশ-নয়শ বিলিয়ন ডলারের মতো। এই বিশাল বাণিজ্যে দুদেশের আমদানি-রপ্তানি প্রায় সমান সমান এবং অধিকাংশ সম্পন্ন হয় স্থলপথে। দুদেশের মধ্যে স্থল-সীমানা ৮ হাজার ৮৯১ কিলোমিটার। সীমানায় কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই, নিরাপত্তা প্রহরাও নেই। দুদেশ দুই ভাইয়ের মতো। মেক্সিকোর সঙ্গে মিলে অল্প কদিন আগের বিশ্বকাপ ফুটবলও দুদেশ একসঙ্গে আয়োজন করেছে। কিন্তু খেলাধুলা হোক, বাণিজ্য হোক; সবকিছু ছাপিয়ে থাকে রাজনীতি।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হঠাৎ করে এত বিশাল হয়নি। প্রায় দেড়শ বছর ধরে দুদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বারবার কাঠামো বদল করেছে। নব্বইয়ের দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা নিজেদের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য ঘোষণা করে। বিশ্বব্যাপী মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তা ছিল উজ্জ্বল উদাহরণ। ১৯৯৪ সালে সেখানে মেক্সিকো যুক্ত হয়; স্বাক্ষরিত হয় নর্থ আটলান্টিক ফ্রি টেড অ্যাগ্রিমেন্ট। ২০২০-এ এসে এই চুক্তি আরও গভীর হয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে বসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র উল্টোরথে চলতে থাকে।
২০২৪-এর ডিসেম্বর, ট্রাম্প তখনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেননি। কিন্তু নিজের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে যখন দৌড়ঝাঁপ করছিলেন, তখন হঠাৎ কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাষ্ট্র হওয়ার উপদেশ দিলেন। এ ধরনের প্রস্তাব নতুন নয়। এমনকি তা যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের আগে-পরে বহুবার সামনে এসেছে। কানাডার কুইবেক রাজ্যে তো কানাডীয় রাজনীতিকরাই মাঝেমধ্যে এমন শোর তোলেন। তবে যে দুটি দেশের মধ্যে এত নিবিড় সম্পর্ক, একেবারে গলায় গলায় ভাই ভাই সম্পর্ক, সেখানে একটা দেশের প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য মানায় না। কূটনীতিতে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রথম শর্তই হলো পরস্পরের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ধার ধারেননি। হোয়াইট হাউজে বসার পর বিশ্ব জুড়ে যখন তিনি ট্যারিফ যুদ্ধ শুরু করলেন, তখন সবচেয়ে বেশি অবাক হলো কানাডা। শত বছর ধরে গড়ে ওঠা মুক্ত বাণিজ্যের টেক্সটবুক উদাহরণ কিনা ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্কের খড়্গে পড়ল!
ট্রাম্পের কূটনীতির প্রধান মৌল অর্থনৈতিক লাভক্ষতি। ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে তিনি কানাডার পণ্যের ওপর ঢালাওভাবে ঘোষণা করলেন পঁচিশ ভাগ শুল্ক। পরে তা বেড়ে পঞ্চাশে দাঁড়াল। ট্রাম্প বলছেন, কানাডা আঞ্চলিক প্রতিরক্ষায় তেমন কিছুই ব্যয় করে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ফলে কানাডা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সুবিধা পায়। সেজন্যই শুল্ক আরোপ।
কিন্তু কানাডা তা সহজভাবে নিতে পারেনি। সমসাময়িক সময়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পদত্যাগ করলে মার্ক কার্নি নির্বাচিত হয়ে আসেন। তিনি দীর্ঘদিন ব্যাংকার ছিলেন। ফলে ট্যাক্স, শুল্ক বা লেনাদেনার হিসাব ভালো বোঝেন। তিনি আমেরিকান শুল্কের বিপরীতে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলেন। একেবারে সমানে সমান। শুরু হলো যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য বিরোধ। পাশাপাশি চালু হলো দুদেশের মধ্যে একের পর এক বৈঠক। ডোনাল্ড ট্রাম্প একবার জানান, আলোচনা ভেস্তে গেছে; একবার বলেন, নতুন চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। এভাবে এক বছর চলেছে। কানাডাও জানিয়েছে, আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে। দুদিন আগে কানাডার প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্য আলোচনা থেকে নিজ দেশের প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করেছেন। জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো অযৌক্তিক। ওসব নিয়ে আর আলোচনার মানে হয় না। বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আমেরিকান কিছু নির্বাচিত পণ্যের ওপর কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে।
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় কার লোকসান? কার লাভ?
ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বলে, অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরান যেভাবে প্রতিরোধে অনড় থেকেছে, মাথা নোয়ায়নি, তাতে যুদ্ধে জয় হলে ইরানেরই হয়েছে। ঠিক একইভাবে বলা যায়, দুদেশের ভোক্তা বা উৎপাদকদের ক্ষয়ক্ষতি যা-ই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমানে সমান লড়ে কানাডাই প্রকারান্তরে জয়ী হয়েছে। সব যুদ্ধের ফলাফল অর্থনৈতিক মাপকাঠি দিয়ে নির্ণীত হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ পারমাণবিক শক্তি সঞ্চয় বা বাণিজ্য শুল্কের না। যুদ্ধটি আরও বড়। বিশ্বব্যাপী একটি দেশের খেয়ালখুশিমতো সবকিছু চলবে, নাকি দেশে দেশের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ন্যায়ভিত্তিক সম্মানের ভিত্তিতে নির্ণীত হবে— যুদ্ধটি সেই জায়গায়। যে লড়াইয়ে ভেনেজুয়েলা দাঁড়াতে পারেনি, সে লড়াইয়ে ইরান ও কানাডা দাঁড়িয়ে গেছে।
মার্ক কার্নি জিতে গেছেন, কারণ কানাডীয় জনগণ তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি দেশের জনগণের সমর্থন অক্ষুণ্ন রাখতে পারে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা না, যেকোনো আলোচনাতে বাংলাদেশ তখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে
মার্ক কার্নি প্রথম বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনামে আসেন দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তৃতা দিয়ে। তার সেই বক্তৃতা অনেক পাঠ্যসূচিতে উঠে গেছে। ট্রাম্পের নাম উচ্চারণ না করে তিনি মধ্যম সারির দেশগুলোকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, একটা-দুটো দেশের খেয়ালখুশিমতো আন্তর্জাতিক পদ্ধতি চলতে পারে না। সেজন্য মধ্যম সারির দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আলোচনার টেবিলে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। নয়তো কারও ডাইনিং টেবিলের খাবারে পরিণত হতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের ওপর একতরফা বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করে সুবিধা করতে পারেননি। চীন সফরে তার প্রাপ্তি ছিল প্রায় শূন্য। গ্রিনল্যান্ড দখলে নিতে চেয়ে শুধু ডেনমার্ক না, প্রায় সমগ্র ইউরোপ তার ওপর ক্ষুব্ধ। ইরান যুদ্ধে সেজন্য ইউরোপের কোনো দেশ তাকে প্রশ্নাতীতভাবে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেনি। এবারে কানাডার সঙ্গে যে ধাক্কা খেয়েছে তাতে আশা করি, হয় যুক্তরাষ্ট্রের বোধোদয় হবে, নয় বিশ্বব্যাপী ছোট-বড় দেশ অযৌক্তিক আচরণের বিরুদ্ধে সরব হবে।
কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের ফল রিপাবলিকানরা সরাসরি পেতে পারে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন আছে। সেখানে কানাডার সীমান্তবর্তী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মিশিগান, মেইন বা নিউ ইয়র্কে শুল্কযুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে গত এক বছরে কানাডীয় পর্যটক কমে গেছে। নিউ ইয়র্ক অর্থনীতিতে তা এমনই প্রভাব ফেলেছে যে এখন নিউ ইয়র্ক কর্তৃপক্ষ উল্টো ‘নিউ ইয়র্ক কানাডাকে ভালোবাসে’ শীর্ষক প্রচারণা শুরু করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপে কানাডার অন্টারিও রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অন্টারিওর নেতারা যাচ্ছেতাই ভাষায় ট্রাম্পকে গালাগালি করছেন। মার্ক কার্নি বলেছেন, কানাডার উৎপাদকরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে জেনেও কানাডা আলোচনা থেকে বের হয়ে এসেছে। তিনি সম্ভাব্য ক্ষতির বিরুদ্ধে সরকারি প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। বিকল্প বাজার খুঁজতে চীন ও ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আগে তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক উদ্ভট বাণিজ্য চুক্তি করে ফেলেছে। চুক্তির ফলে এখন শুধু বেশি দামে আমেরিকান পণ্য কিনতে হবে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হবে, তা না; বরং চুক্তির বড় অংশ এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু বাণিজ্য আলোচনা বা নেগোসিয়েশনে কখনো কোনো কিছু নিজে থেকে আসে না। এজন্য আলোচনায় নিজ দেশের স্বার্থ তুলে ধরতে হয়। যত সার্থকভাবে তা তুলে ধরা যায়, তত অনুকূল চুক্তিতে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়। মার্ক কার্নি জিতে গেছেন, কারণ কানাডীয় জনগণ তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি-ধমকির কাছে মাথা নত করতে হয়নি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সরকার যদি নিজ দেশের জনগণের সমর্থন অক্ষুণ্ন রাখতে পারে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা না, যেকোনো দেশের সঙ্গে যেকোনো আলোচনাতে বাংলাদেশ তখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত








