ইসলামে শ্রমিক-মালিকের অধিকার ও দায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানবসভ্যতার বিকাশে শ্রমজীবী মানুষের অবদান অপরিসীম। কৃষি-শিল্প, নির্মাণ-পরিবহনসহ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্র শ্রমিকের ঘাম ও শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বাস্তবতায় শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হয়। কোথাও শ্রমিককে দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করানো হয়, কোথাও যথাসময়ে সঠিক মজুরি দেওয়া হয় না, আবার কোথাও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সম্মানজনক আচরণের অভাব দেখা যায়। ইসলাম শ্রমিকের অধিকার ও মালিকের দায়িত্বকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। শ্রমিক-মালিক সম্পর্ককে শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন নয়; বরং ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও পারস্পরিক দায়িত্বশীলতার সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘মানুষ তাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে।’ (সুরা নাজম, আয়াত: ৩৯) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না’ (বুখারি, হাদিস: ২০৭২)। এ শিক্ষা প্রমাণ করে, হালাল উপার্জনের জন্য শ্রম ও প্রচেষ্টা সম্মানজনক। কাজের ধরন কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে কোনো শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করা যায় না। তাই শ্রমিককে অবহেলা, অপমান করা কিংবা তার শ্রমের যথাযথ মূল্য না দেওয়া ইসলামের মানবিক শিক্ষার পরিপন্থী।
শ্রমিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো যথাসময়ে চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ মজুরি পাওয়া। শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে মালিকের প্রতিষ্ঠানকে সচল রাখেন। বিনিময়ে নির্ধারিত পারিশ্রমিক পাওয়া মালিকের অনুগ্রহ নয়; বরং এটি তার ন্যায্য অধিকার। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হবেন। তাদের একজন হলো, যে কোনো শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করে তার কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে, অথচ তার মজুরি পরিশোধ করে না। (বুখারি, হাদিস: ২২২৭) অন্যদিকে সামর্থ্যবান ব্যক্তির পাওনা পরিশোধে বিলম্ব করাকেও রাসুলুল্লাহ (সা.) জুলুম বলে অভিহিত করেছেন। (বুখারি, হাদিস: ২৪০০) সুতরাং শ্রমিকের বেতন আটকে রাখা, অযৌক্তিকভাবে কর্তন করা কিংবা পাওনা পরিশোধে টালবাহানা করা গুরুতর অন্যায়।
শ্রমিকের বেতন আটকে রাখা, অযৌক্তিকভাবে কর্তন করা কিংবা পাওনা পরিশোধে টালবাহানা করা গুরুতর অন্যায়
শ্রমিকের অধিকার শুধু মজুরি পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও মালিকের দায়িত্ব। কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, নিরাপদ যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, ‘ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতি সহ্য করাও যাবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০) এ নীতির আলোকে শ্রমিকের জীবন ও স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, বিশ্রাম এবং অতিরিক্ত কাজের যথাযথ পারিশ্রমিক নিশ্চিত করাও জরুরি।
শ্রমিকের সঙ্গে মালিকের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত মানবিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের অধীন কর্মচারীরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং যার ভাই তার অধীনে রয়েছে, সে যেন তাকে তা-ই খাওয়ায়, যা সে নিজে খায় এবং তা-ই পরিধান করায়, যা সে নিজে পরিধান করে। তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না, যা তাদের সাধ্যের বাইরে। আর যদি এমন কাজ দাও, তাহলে তাদের সহযোগিতা করো।’ (বুখারি, হাদিস: ৩০) এই হাদিস শ্রমিকের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের অনন্য দৃষ্টান্ত। শ্রমিককে অপমান করা, ভয়ভীতি দেখানো, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা এবং নারী-পুরুষ কিংবা ধর্ম-বর্ণের পরিচয়ে বৈষম্য করা ইসলামের সাম্যনীতির পরিপন্থী।
অন্যদিকে, শ্রমিকেরও মালিক ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি কিছু দায়িত্ব রয়েছে। ইসলাম অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা চুক্তিগুলো পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ১) সুতরাং শ্রমিককে নির্ধারিত দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। কর্মঘণ্টায় কাজে ফাঁকি দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নষ্ট করা, চুরি, প্রতারণা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে উৎপাদন ব্যাহত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতগুলো তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮) প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়িত্বও শ্রমিকের কাছে আমানত। তাই শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা যেমন আদায় করতে হবে, তেমনি শ্রমিককেও নিজের দায়িত্বের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে হবে।
আধুনিক শ্রমবিজ্ঞানও ইসলামের এসব নীতির গুরুত্ব স্বীকার করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘ডিসেন্ট ওয়ার্ক’ ধারণায় ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আধুনিক গবেষণায়ও দেখা যায়, নিরাপদ পরিবেশ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, বিশ্রাম এবং সম্মানজনক আচরণ কর্মীর মানসিক সুস্থতা ও উৎপাদনশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শ্রমিকের কল্যাণ নিশ্চিত করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতিরও শর্ত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। পোশাকশিল্প-নির্মাণ, কৃষি-পরিবহন ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মালিকের সদিচ্ছার পাশাপাশি শ্রম আইন বাস্তবায়ন, কার্যকর তদারকি, শ্রমিকের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং অধিকার লঙ্ঘনের যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
মূলত ইসলাম শ্রমিক ও মালিক উভয়কেই দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছে। শ্রমিকের শ্রমের মূল্য পরিশোধ করা যেমন মালিকের আমানত, তেমনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা শ্রমিকের কর্তব্য। কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের অধিকার নষ্ট করতে পারে না। যে কর্মব্যবস্থায় শ্রমিক ন্যায্য পাওনা ও মর্যাদা পায় আর মালিক বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল কর্মী পান, সেটিই কল্যাণকর। তাই শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মালিকের নৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক শ্রমনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



