ত্রিমাত্রিক
কোনো কোনো মাতাল দিন

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় বাংলাদেশের
সায়েন্স ল্যাবের মোড়ে গুটিকয়েক তরুণকে আমরা দাঁড় করিয়েছিলাম ফুটপাতে, কিছুটা ভ্রাম্যমাণ কিংবা তাৎক্ষণিক কাঠগড়ায়। তাদের অপরাধ— তারা একটি গাড়ির সাইড মিরর ভেঙেছে। অথচ গাড়ি ভাঙার মতো কর্কশ চেহারা নয় তাদের, উগ্র আর মারকুটে মেজাজও প্রকাশ পায়নি বিন্দুমাত্র। সভ্যতার পুরো মানচিত্র তাদের অবয়বে— কী স্নিগ্ধ, কী পরিস্ফুটিত, মায়াবী দর্শন!
ধানমন্ডি আর কলাবাগান থেকে শোরগোল শোনা যাচ্ছে মিছিলের। ঢাকা কলেজ সম্ভবত প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও। হয়তো এরই মধ্যে শুরু করে দিয়েছে অন্যরাও।
১৩ এপ্রিল, ১৯৯৭ সাল সেদিন। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে কেনিয়াকে ফাইনালে ৭২ রানে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি জিতেছিল বাংলাদেশ। ক্রিকেটের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল সেদিন বাংলার সোনার ছেলেরা। এই সাফল্যে ১৯৯৯ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ, পরে সুগম হয় টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার দুর্গম পথ।
আনন্দ মিছিলে হঠাৎ কিংবা অসাবধানতাবশত ভেঙে ফেলা সেই মিররের মালিক ছিলেন একজন স্থপতি। গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে কী একটা কাজে গিয়েছিলেন ওপাশে। ফিরে এসে ড্রাইভারের কাছে সব শুনলেন তিনি। প্রতিনিয়ত দুঃখী দেশের এই সুখের খবর শুনলেন সেই মুহূর্তে, আড়চোখে তাকালেন ড্রাইভারের হাতে থাকা গাড়ির অংশটার দিকে। মুখটা হাসি হাসি হয়ে উঠল ওনার। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেগুলো— অপরাধী, বিব্রত। অপেক্ষাকৃত কাছের ছেলেটার দিকে এগিয়ে গেলেন, মাথার হাত রাখলেন, এলোমেলো চুলগুলো আরও এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, ‘একটা আয়না ভেঙেছো তোমরা, ওটা স্রেফ একটা আয়না। দেশের আজ এত বড় আনন্দের দিনে এটা খুব ক্ষুদ্র একটা ব্যাপার। ও ইয়ে, চলো, আজকের এই মহাআনন্দে কোল্ড ড্রিংকস তো খেতে পারি সবাই মিলে।’
০২
ইংল্যান্ডের সঙ্গে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা জেতার রাতে পুরো মিরপুর প্রায় শব্দে ভেসেছিল ঢোল আর ড্রামে। ফাইনালে স্পেনের সঙ্গে হারার পরও একই শব্দ। আমরা বাংলাদেশিরা মূলত আনন্দে ভেসেছিলাম, বাঁধভাঙা আনন্দে। কোথাকার কই আর্জেন্টিনা, স্পেন; বিদ্যুৎ দেয় না আমাদের, গ্যাস দেয় না, এমনকি তাদের কোনো সিনেমাও মনে পড়ে না হঠাৎ। ভাব বা ভালোবাসার আদান-প্রদান নেই, নেই লেনদেন বা ভূরাজনৈতিক সমঝোতা। তবু তাদের জন্য আমাদের কী আকুলতা, হৃদয়ের সব রকমের উষ্ণতা!
বিশ্বকাপ এলেই পুরো দেশ পাল্টে ফেলি আমরা— পতাকায়, আয়োজনে, মিছিলে। অথচ কতগুলো দুঃখের ধারাপাত আছে আমাদের; আমাদের তরুণদের, আমাদের মা-বাবাদের। আমরা ওসব মনেই রাখি না। মনে রাখি না বলেই নিজের জমি বিক্রি করে কয়েকশ হাত পতাকা বানাই আমরা; নিজের দেশের নয়, অন্য দেশের!
খেলা আমাদের এরকমই করে, পাগল বানায় নিমেষে।
০৩
পাগল হই আমরা নিজের দেশের খেলায়ও। আবাহনী-মোহামেডান বিলুপ্তপ্রায়, ফুটবল এখন ইতিহাস। তাইতো অন্য দেশের ফুটবলে আমরা মগ্ন হই, আনন্দে ভাসি রাত-রিবাতে।
জীবনের খুব কম কিছুতে দর্প আছে আমাদের, আছে অহংকার। কিন্তু আমরা মাঝেমধ্যে অন্যের দর্প ভেঙে দিতে পারি, চূর্ণ করতে পারি অহংকার।
আজ কি সেরকম একটা দিন?
আজ কি চির অহংকারী অস্ট্রেলিয়াকে আমরা জানিয়ে দেব, বুঝিয়ে দেব— আমরা আসলেই বাঘ। বাঘরা যেমন ১৬ ঘণ্টা ঘুমায়, বাকি সময় সজাগ, আমরাও তেমন!
০৪
ক্লাসে এসে সচরাচর হাসতে দেখিনি আমরা ফরফরাজ সিদ্দিকী স্যারকে। সাড়ে ছয় ফুটের মতো লম্বা ছিলেন তিনি, আমরা ডাকতাম— কাবুলিয়ালা স্যার। ভূগোল পড়াতেন তিনি আমাদের। কিন্তু মাসে একবার কিংবা দুবার ক্লাসে ঢুকতেন হাসতে হাসতে, হাসিটা লেগেই থাকত শেষ পর্যন্ত।
জীবনের কোনো কিছুতেই আনন্দ নেই চেহারার রিপন একদিন বলল, ‘স্যার, হাসতাছেন যে!’
‘কেন, তোর কোনো সমস্যা হচ্ছে?’
‘না।’
‘মাঝেমধ্যে হাসতে হয় রে, গাধা।’
‘কেন হাসতে হয়?’
‘হাসলে ভেতর থেকে অনেক কিছু বের হয়ে আসে— আমাদের দুঃখ বের হয়ে আসে, কষ্ট বের হয়ে আসে, বেদনা বের হয়ে আসে।’
দুঃখ-কষ্ট-বেদনা নিয়েই আমাদের প্রতিটি দিন। আমাদের এই ছোট্ট দেশটায় শত অভাব, হাজারো সমস্যা। আমাদের সবুজ রঙের পাসপোর্টকে অন্য দেশের লোকজন অন্য চোখে দেখে। আমাদের ভালো হাসপাতাল নেই, বিশ্ববিদ্যালয় নেই, বেড়ানোর মতো নিরাপদ জায়গা নেই। আমাদের রাস্তাগুলো ভেঙে যায় প্রতিবছর, নদী ভাঙে কূল। মনিব হয়ে ওঠা হয়নি আমাদের কখনো, দাস হিসেবেই বেঁচে থাকা আমাদের। বিশ্বদরবারে আমাদের কোনো স্বর নেই, করুণা করে সবাই অবহেলায়। কিন্তু দু-একটা জিনিস আছে আমাদের। আমাদের শহীদ মিনার আছে। আমরাই একমাত্র দেশ, যে দেশের মানুষরা তার মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, বিশ্বে আর কোথাও এমনটি নেই। তাইতো প্রতি শহীদ দিবসে আমরা চিৎকার করে গেয়ে উঠি— আমার ভাইয়ের রঙে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...।
আরও একটা জিনিস আছে আমাদের— ক্রিকেট। মাতাল করা এই খেলাটি মাঝেমধ্যে আমাদের জাগিয়ে দেয়। আমরা জেগে উঠি, চিৎকার করি আনন্দে— আমাদের সারা বছরের ক্লেদ বেরিয়ে যায়, জমাট হাহাকার উড়ে যায় নিমেষে, আমাদের ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্ন আলো ছোঁয় মিটিমিটি। আমরা বেঁচে থাকি, স্বাদহীন জীবনে বেঁচে থাকার স্বাদ পাই নীরবে।
গর্বহীন জীবনে আমরা গর্বিতও হই মনে মনে।
০৫
সায়েন্স ল্যাবের সেই গুটিকয়েক তরুণের মতো কিছু তরুণ আমাদের বরাবরই দরকার। যারা শুধু কোনো অপরিসীম জয়ে বাদ্য বাজাবে না, গলা ফাটিয়ে গাইবে না কোনো গান, দাপিয়ে বেড়াবে না সারা পথ, এপথ-ওপথ, রাজপথ। তারা ঠুনকো গাড়ির মিরর ভাঙবে না শুধু, তারা আমাদের সংস্কার ভাঙবে, অচলায়তনকে সচল করবে, সব নীতিহীনতাকে পায়ে মাড়াবে সদর্পে।
তারা চিৎকার করে গাইবে— আমরা করব জয়...!
আমরা আমাদের খেলায় জয় চাই, জীবনেও। জয়ের জন্য আমরা বহু পথ হেঁটে যাব নীরবে; একা, মিলেমিশেও!









