লোকয়ত বাংলা
ময়মনসিংহের কাষ্ঠশিল্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাষ্ঠশিল্প সাধারণত সুতার সম্প্রদায়ের বৃত্তিভুক্ত। প্রাচীন বাংলার খোদাই, তক্ষণ এবং স্থাপত্যশিল্পও সুতারদের বৃত্তিভুক্ত ছিল। কিন্তু ইতিহাসের জটিলকাল পরিক্রমায় একদা সে এসে কাঠমিস্ত্রির কর্মের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ল।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের সর্বত্র বিশেষত ময়মনসিংহ জেলায় অল্পবিস্তর এবং তুলনামূলকভাবে টাঙ্গাইল জেলায় সর্বাপেক্ষা অধিক সূত্রধর সম্প্রদায়ের লোকের নিবাস। বর্তমানে এই সম্প্রদায়ের লোকেরা টিন-কাঠের নির্মিত গৃহ এবং কাষ্ঠনির্মিত আসবাব-তৈজসপত্রের ওপরই নির্ভরশীল। এসব শিল্পের মধ্যে পিঁড়ি, খঞ্চা, বারকোষা, হাতা, প্রদীপের গাছা বা পিলসুজ, কাঠের পেটরা-চারা-চইর্যা থালা, ছোট বাটি, সিন্দুক, পাদুকা ইত্যাদি টাঙ্গাইল সদর ও কিশোরগঞ্জের দক্ষিণাংশে প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়। আর গৃহনির্মাণে বাজিতপুরের মিস্ত্রিদের খ্যাতি আছে। ময়মনসিংহ সীমান্তের গারো, হাজং উপজাতির লোকেরা কাঠ খোদাই করে উদুখল, বিভিন্ন আসবাব এবং আস্ত গাছ খোদাই করে পানি সেচার ‘কোণ’, নৌকা জাতীয় কোন্দা-কোন্দি ইত্যাদি নির্মােণ অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
কাষ্ঠশিল্পের ক্ষেত্রে ময়মনসিংহের নৌশিল্প স্বীয় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। পূর্ব ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত জলমগ্ন থাকে, তখন নৌকাই এলাকাবাসীর জীবন-জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত ইত্যাদি একমাত্র অবলম্বন। এ ছাড়া পূর্ব ময়মনসিংহের স্থায়ী নৌকার বাসিন্দা বহুতর বেদে ও গাইন সম্প্রদায়ের আবাস। এসব ঘিরেই পূর্ব ময়মনসিংহের নৌকা নির্মাণের খানিকটা আভাস পাই চাঁদ সদাগরের নৌকা গঠনের মধ্যে। এখানে তার সামান্য উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যায়:
“পাট কর্ম করি সারা, সুতার চিড়িয়া দাঁড়া,
জানাইল চান্দের গোচর।
দেখে দিন শুভক্ষণ, করিতে নৌকা গঠন,
আদেশ করিলা সদাগর।।”
কোষা-কোষী, ডিঙ্গা-ডেঙ্গি, কুন্দা-কোন্দি, পাতাম, খিলুয়া, সরঙ্গা, ভাওয়াইল্যা, পানসি, দৌড়ের নাও ইত্যাদি নানা আকৃতির-প্রকৃতির নৌকার সমন্বয়ে পূর্ব ময়মনসিংহের নৌশিল্পের গঠন। পূর্ব ময়মনসিংহের বিশিষ্ট পাতাম, খিলুয়া, সরঙ্গা জাতীয় নৌকাগুলো পুরু এবং চ্যাপ্টা গলুইবিশিষ্ট; উভয় গলুই সমতল পৃষ্ঠ থেকে যথেষ্ট উঁচু। পাতাম সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ, পুরু-চ্যাপ্টা গলুইবিশিষ্ট এবং অত্যন্ত দ্রুতগামী। পরিবহন কাজে ব্যবহৃত সরঙ্গা নৌকা সর্বাপেক্ষা এবং পেটবিশিষ্ট। ডিঙ্গি জাতীয় পানসি-ভাওয়াইল্যা উচ্চবিত্তদের বিলাস-ব্যাসন এবং যাতায়াতে ব্যবহৃত। বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে, বোন-ভাগ্নিদের ‘নাইয়র’ আনার কাজে পানসি অবশ্য সাধারণ মধ্যবিত্তদের দ্বারাও ব্যবহৃত। তাই পানসির সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা থাকে ময়মনসিংহের মা-বোনদের বাপের বাড়ির স্বপ্ন। এই স্বপ্ন ঘিরেই অসংখ্য মেয়েলিগীতিতে পানসির উল্লেখ আছে। মৈমনসিংহ গীতিকার অন্যতম নায়িকা রূপবতীকে বনবাসে দিয়ে পানসি যখন ফিরে আসছে, রূপবতীও তখন সেই সুরেই কাঁদছে—
“বাপের বাড়ির পানসিরে কোথায় চল্যা যাও।
মায়ের আগে খবর কইও আমার মাথা খাও।।”
আবার মৈমনসিংহ গীতিকায় ভাওয়াইয়ারও উল্লেখ সুপ্রচুর। মলুয়া দেওয়ান সাহেবকে ভাঁড়াতে গিয়ে বলেছিল—
“এইবার দিন তুমি বরদাস্ত করিয়া।
কোড়া শিকারে যাইতে সাজাও ভাওয়ালিয়া।।”
অন্যত্র আবার ‘দেওয়ান ভাবনা’য় সোনাই—
“ভাওয়ালিয়া সাজাইতে কইল আপন শ্বশুরে।
পতি উদ্ধারিতে কন্যা যায় ভাবনার ঘরে।।”
পানসি এবং ভাওয়াইল্যা নৌকাকে নানা প্রকারে ও উপকরণে সজ্জিত করে শিল্পায়িত করা হয় ময়মনসিংহ অঞ্চলের সর্বত্র।
এ ছাড়া পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চল বিশেষত নেত্রকোনার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের প্রতিটি গ্রামে অবশ্যই দু-একটি দৌড়ের নাও রাখাকে এবং গ্রামের মানসম্মান অধিকাংশই বর্ষায় নৌকাবাইচ এবং হেমন্তে ষাঁড়ের লড়াইয়ের জয়-পরাজয়ের ওপর নির্ভরশীল। এসব অঞ্চলে দৌড়ের নাও রাখাটা সমাজে মানসম্মান এবং প্রতিপত্তির চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত। মৈমনসিংহ গীতিকায় মলুয়ার বিবাহপ্রস্তাব এসেছিল যেসব ঘর থেকে, তার মধ্যে উত্তরাঞ্চলের ঘরটি হলো—
“উত্তরে সুসঙ্গ হইতে আইল আরও ঘর।।
অবস্থা ব্যবস্থা তার অতিশয় সুন্দর।
ঘাটে বান্ধা দৌড়ের নাও পছন্দ বাহার।
লড়াই করিতে আছে চাইর গোটা ষাঁড়।।”
ময়মনসিংহ অঞ্চলের কাষ্ঠশিল্পে বিধৃত হয়েছে এ অঞ্চলের কৃষ্টি, সভ্যতা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, যা আমাদের লোকায়ত বাংলার সম্পদ, যাতে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে লোকায়ত বাংলার মুখ, যেখানে খুঁজে ফিরি আমাদের সজীব-সজল বাংলাদেশের প্রতিকৃতি।



