সম্পাদকের কথা
‘আরেকটা, কী দরকার?’

মোস্তফা মামুন, সম্পাদক, আগামীর সময়
জামিল সাহেব আমাদের সমালোচনা করেন। ‘আগামীর সময়’ আসছে শুনে ‘আরেকটা’— এমন আর্তনাদ করেছিলেন। কমিক চরিত্র, তার আর্তচিৎকার বাস্তবে শোনা যাওয়ার কথা নয় কিন্তু আমি যেন শুনতে পাই। আসলে শুনতে চাই । বা চেয়েছি।
আগামীর সময়-এর প্রকাশ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পর ভাবলাম, আচ্ছা আমি যদি এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত না থাকতাম, তাহলে আমার কী প্রতিক্রিয়া হতো? প্রথমেই মনে আসত, ‘আরেকটা! এত মিডিয়া চারদিকে, এর মধ্যে আরও একটার কি প্রয়োজন আছে?’ আমার মনে আসা এ প্রশ্ন নিশ্চয়ই আরও অনেক মানুষের প্রশ্ন। পত্র-পত্রিকার দিন প্রায় গেছে বলে মনে হচ্ছে। মিডিয়ারই দুর্দিন। না চাইতেই সোশ্যাল মিডিয়া কত খবর রঙ দিয়ে সাজিয়ে রাখে, সেখানে কোন বুদ্ধিতে নতুন গণমাধ্যম! সত্যি বললে, সেই মানুষদের কথাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিতেই জামিল সাহেব পুরো প্রচারণায় আমাদের সঙ্গে থাকলেন। খুব যে পরিকল্পনা করে শুরু হয়েছিল এমন নয়। একদিন অফিস থেকে বেরোনোর সময় কার্টুনিস্ট অরবিন্দকে সামনে পেয়ে মনে হলো, কমিকসে নিজেদের আক্রান্ত করলে কেমন হয়! অরবিন্দ সাড়া দিল। শিল্প সম্পাদক আতিক তাকে তাড়ার ওপর রাখল। আর জামিল সাহেব রাখলেন আমাদের প্রশ্নের ওপর। কেন? কী দরকার? কত দেখলাম? এই প্রশ্নগুলো আসলে নিজেদের জাগিয়ে রাখা। আজ শুরুর দিনের লেখা লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে, এ প্রশ্ন আর উত্তর ক্রমাগত খুঁজে যাওয়াই আসলে ‘আগামীর সময়’। এই অপ্রয়োজনের সময়ও প্রয়োজন আছে—
এটা প্রতিষ্ঠা করতে পারব তখনই যখন মনে হবে আমরা বাড়তি কিছু দিচ্ছি। কোনো একটা কিছু নতুন করে জানাচ্ছি। কোনো একটা মাত্রা যোগ করতে পারছি। একটা কিছু অন্তত...।
আমার এক বন্ধু পত্রিকা পড়ত না। টিভি খবর দেখত না। বলত, শুধু শুধু সময় নষ্ট। তরুণ বয়সে এমন বিশেষজ্ঞ এবং সর্ববিরোধী হয়ে ওঠে কেউ কেউ। আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিতাম না। একদিন কাঁচুমাচু মুখে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, পত্রিকায় লেখা ছাপানো যায় কী করে?’ কেন এমন পত্রিকাবিমুখ বন্ধু পত্রিকায় লিখতে চায়? যোগ-জিজ্ঞাসায় জানা গেল, তাদের পরিবারের জমিসংক্রান্ত একটা ঝামেলা।
একজন বলল, ‘তা পত্রিকা করবে কী? তারা তো পুলিশ না যে তোদের সম্পদ ফিরিয়ে দেবে। পুলিশের কাছে যা।’
‘গিয়েছিলাম তো, তারা বলেছে উঁচু মানুষদের ধরতে।’
উঁচু মানুষদের ধরার প্রয়োজনীয়তা সমাজের সবাই জানে কিন্তু কায়দাটা খুব বেশি মানুষ জানে না। এমন মানুষেরা আছে যাদের উঁচু জায়গায় যোগাযোগ নেই, বিখ্যাত বন্ধু নেই, প্রভাবশালী আত্মীয় নেই— তারা শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়? পুলিশে যায়, সবসময় পাত্তা পায় না। আদালতে দৌড়ায় বটে কিন্তু সে অনেক লম্বা দৌড় এবং যখন সব শেষ হয়ে যায় তখন শেষ ভরসা পত্রিকা বা সংবাদমাধ্যমে একটু জায়গা।
সে অবশ্য পুরনো দিনের কথা। এখন তো দরকার নেই? ফেসবুক আছে। তাতেই কাজ হয়। হয় হয়তো। কিন্তু এখন আবার পত্রিকা বা মিডিয়ার প্রয়োজন অন্যভাবে। অন্যরকম। একভাবে দেখলে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। আগে পত্রিকা খবর দিত। একটাই ছিল কাজ। এখন কাজ আসলে আরও অনেক বড়। খবর বেছে দিতে হয়। চারদিকে হাজারো তথ্য, এত প্রবাহ যে, সঠিক তথ্য এর মধ্যে ভেসে কোথায় চলে যায়! পত্রিকা বা মিডিয়ার কাজ এ ভিড়ের মধ্য থেকে হারিয়ে যাওয়া খবর বের করে দেওয়া। সারা দিন আপনি দেখবেন, শুনবেন, ভুলবেন। আমরা মনে রাখব। আপনার অজান্তে আপনার তৃতীয় চোখ বা দ্বিতীয় অস্তিত্ব হয়ে বাছাই করে রাখব প্রয়োজনীয় এবং সঠিক সংবাদ।
বটে। কিন্তু এখন তো শুনি, মিডিয়াই বরং ভুল পথে মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে। আগে মিডিয়া মানুষের দিকে নজর রাখত। এখন মিডিয়ার দিকেও পাল্টা চোখ মানুষের। দুয়ে মিলে অদ্ভুত এক সমীকরণ। সেটা আরও অদ্ভুতাকার নেয় কারণ প্রায় সবাই চায় মিডিয়া যেন তার মতো করে সব বলে। এটাও একটা আধুনিক ট্র্যাজেডি যে, মিডিয়ার নিরপেক্ষতার পরীক্ষা অনেক ক্ষেত্রে দিতে হয় তাদের কাছে যারা নিজেরাই একটা পক্ষ। মোটের ওপর পরিস্থিতি অনেকটা এরকম— মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবাই চায় কিন্তু মতটা যেন আমার পক্ষে থাকে। এ অবস্থায় সাংবাদিকতাই কঠিন। তার ওপর নতুন মাধ্যম! হাত বেঁধে সাঁতারে নামার মতোই কি! ভাবি। উপায় তাহলে কী? সমস্যা আরও আছে। সোশ্যাল মিডিয়া একটা খবর শুনেই দিয়ে দিতে পারে। আমরা জেনেও দিতে পারি না, সূত্র লাগে, দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য, ফলে দেরি। কাজেই পিছিয়ে পড়া। ভাবনায় জট বাড়ে। মনে হয়, বোধহয় সময় শেষ। তখন আবার চিন্তা করি একটা ছবি। মূলধারার কোনো মিডিয়া নেই। পত্রিকা নেই, টিভি নেই, স্বীকৃত পোর্টাল নেই। সবাই যার যার মতো ফেসবুক-টুইটারে খবর প্রকাশ করছে। তথ্য, অপতথ্য, সত্য, অসত্য— একটা থেকে আরেকটাকে আলাদা করবে কে? তাই গণমাধ্যম লাগবে। আর সেই গণমাধ্যমকে আবার আধুনিকও হতে হবে। ছাপা পত্রিকা যদি হয় তার মুখ, তাহলে অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া দুই পাখা। আমরা যুগের সেই চাহিদা মেটাতে সজাগ থাকব ২৪ ঘণ্টা। আগামীর সময় তাই শুধু ছাপা পত্রিকা নয়, এটা সব মিলিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি সংবাদমাধ্যম।
সেদিন হকারদের এক সম্মেলনে গিয়েছিলাম। একজন এজেন্ট দুঃখ করে বলছিলেন, ‘আমাদের যৌবন চলে গেছে।’ সাধারণ কথার কথা। কিন্তু সেই দুপুরে মনে হলো, আরে এরও তো মানে আছে। যৌবন চলে গেলে মানুষ শুধু বুড়ো হয় না, অভিজ্ঞও হয়। পথ দেখায়। আমরা হয়তো এখন তেমনই। দৃশ্যত প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে কিন্তু আবার আছেও। ভেবে দেখলে গভীরভাবেই আছে।
এ বার্ধক্য আর প্রবীণ সূত্রে আরেকটা কথাও মনে আসছে। আগামীর সময়, সমাজের অভিজ্ঞ অংশকে নিয়েও কাজ করবে। ষাট পেরিয়ে যাওয়া মানুষেরা অবসর নেয়, স্বাস্থ্য আর চিকিৎসার উন্নতিতে এখন দিব্যি ৭৫-৮০ পর্যন্ত কর্মক্ষম কিন্তু কেন যেন সমাজে তাদের খুব জায়গা নেই। তাদের কথা শোনার লোক নেই। বলার জায়গা নেই। আগামীর সময় তাদের জন্য একটা জায়গা করবে।
তৈরি করছি গোল্ড ক্লাব, সেখানে সেসব মানুষ মিলিত হবেন। কথা বলবেন। মিলবেন। মেলাবেন। থাকবে তরুণদের জন্য ক্যারিয়ার ক্লাব, এই সময়ে তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় হতে চাই অংশীদার এবং চাই শিশু-কিশোরদেরও সাথী হতে। বোধ-চিন্তা বিকাশে সহায়তা করবে কিডস ক্লাব। তাদের পাশেও থাকব, যাদের কেউ নেই, কিছু নেই। ‘হাত বাড়িয়ে দাও’ সেসব মানুষের জন্য, বেঁচে থাকার চেয়ে বড় কোনো স্বপ্ন যাদের নেই। তাদের দুঃখ শুনব, শোনাব। এখানেই থামব না। দুঃখ দূর করার সামর্থ্য যাদের আছে তাদের পর্যন্ত আমরা যাব। আর তাই বলছি, আমাদের সংবাদে শেষ নয়, শুরু। খবর লিখব। লেগে থাকব। সমস্যার সমাধানে যতদূর দরকার ততদূর যেতে চাইব। আরও চাইব, যার বিরুদ্ধে খবর লেখা হবে সেও যেন মনে করে এটা তারও মিডিয়া। তার দোষ ধরিয়ে দেওয়া হবে তাকে শুদ্ধ করতে। শেষ করতে নয়। সাহসী সাংবাদিকতা, পেশাদার সাংবাদিকতা— এমন অনেক কথাই আছে। আমরা মনে করি, শুধু সাংবাদিকতাটা করলেই হবে। এর সংজ্ঞার মধ্যেই সব আছে। তার রীতিনীতি মেনে এগোলেই সব ঠিক থাকবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ। ন্যায়ের প্রতি নিষ্ঠতা। আক্রমণকারীকে প্রতিরোধ। আক্রান্তকে ভরসা।
ও, হ্যাঁ। আমাদের কাগজ হাতে নিয়ে দিন শুরু করলে সবার ওপরে কী দেখবেন জানেন! আপনার-আমার মতো কেউ একজন। খুব সাধারণ। কিন্তু করে ফেলেছে অসাধারণ কোনো কাজ। তেমন সোশ্যাল হিরোকে ধন্যবাদ জানিয়ে দিন শুরু করব আমরা। পড়তে পড়তে যদি আপনারও মনে হয়— আরে, এমন একটা কাজ তো আমিও করতে পারি...। তাহলেই হবে। তৈরি হবে আগামীর মানুষ।
রাজনীতি থাকবে। অতি রাজনীতি নয়। ইতিহাসের চর্চা থাকবে, অকারণ চর্বিতচর্বণ নয়। সংবিধান-চেতনা সব থাকবে কিন্তু মনে করিয়ে দেব, এ সবকিছুর কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষকে। মানুষের জীবন বদলের চেয়ে, তার সমৃদ্ধির চেয়ে বড় কোনো রাজনীতি হতে পারে না। কোনো সংবিধান, ইতিহাস, চেতনা মানুষকে বাদ দিয়ে নয়। কেন যেন মনে হয়, আমরা সবকিছু নিয়ে ভাবতে ভাবতে মানুষকেই যেন ভুলে যাচ্ছি। অতি রাজনীতি আর তর্কাতর্কির তিক্ততায় অন্য যে জীবন আছে, সেই জীবন যাচ্ছে হারিয়ে। আমরা সেই জীবনও দেখাতে চাই, যেখানে আনন্দ আছে, সম্ভাবনা আছে, সুর আছে, সহনশীলতা আছে। আছে ভালোবাসা। বহু বছর পর দেশে আবার আসছে একটা পরিপূর্ণ পত্রিকা, যাতে সব থাকবে। খেলা-ফিচার-বিনোদন মিলিয়ে সম্পূর্ণ পারিবারিক পত্রিকা।
এসব আয়োজনের মধ্যমণি মানুষ। মানুষের শক্তিকে জাগিয়েই গড়তে চাই সেই আগামী যে আগামী স্বপ্নের মতো সুন্দর।
অতএব আগামীর সময় আমাদের হাতে। আগামীর সময় আপনার হাতে।
আর হাতে নিলে মনে হতেও পারে, এই আরেকটার বোধহয় দরকার আছে!
সম্পাদক: দৈনিক আগামীর সময়




