সাগরের শীর্ষে বসে ঘুরপথে বাণিজ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ নিয়ে গত কয়েক বছরে এত সেমিনার হয়েছে, এত প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, এত কূটনীতিক বঙ্গোপসাগরের মানচিত্রে আঙুল রেখে ‘কৌশলগত অবস্থান’ নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন যে, আমরা প্রায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, ভূগোল নিজেই আমাদের পক্ষে কাজ করছে। কিন্তু কনটেইনারবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছে মানচিত্র বড় কথা নয়। তার প্রশ্ন একটাই— তোমার বন্দরে পানি কতটা গভীর?
এ প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের আসল পরীক্ষা। গুরুত্ব ঘোষণা করা সহজ। সেটাকে বন্দরের ঘাটে, রেললাইনের ওয়াগনে আর রপ্তানির হিসাবে রূপ দেওয়াই কঠিন। এ লেখায় আমরা মানচিত্র রেখে খতিয়ান খুলছি।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারজাত পণ্যের ৯৮ শতাংশ যায়। ২০২৫ সালে বন্দরটি প্রথমবারের মতো ৩৪ লাখ টিইইউজ কনটেইনারের সীমা ছাড়িয়েছে, যা ১৯৭৭ সালে কনটেইনার পরিচালনা শুরুর পর সর্বোচ্চ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ৩৫ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে, আর এ সময়ে জাহাজের গড় অবস্থানকালও কমেছে। সংখ্যাগুলো আশাজাগানিয়া। তবু একই বন্দর লয়েডস লিস্টে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় ৬৮তম। অর্থাৎ যে দেশকে ‘ভূরাজনীতির কেন্দ্র’ বলা হচ্ছে, তার প্রধান প্রবেশদ্বার বিশ্ববাণিজ্যের মানদণ্ডে মাঝারি সারির খেলোয়াড়। আর ২০২৫ সালের সাফল্যের পেছনের গল্পও নিখুঁত নয়। জুনে শুল্ক স্টেশনে দুদিনের পূর্ণ অচলাবস্থা এবং অক্টোবরে পরিবহন ধর্মঘটে প্রায় ৪৬ হাজার কনটেইনারের জট তৈরি হয়েছিল।
এখানে একটা অস্বস্তিকর সত্য আছে। বন্দরের সক্ষমতা শুধু ক্রেন আর ইয়ার্ডের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে একটি রাষ্ট্র প্রতিদিন কতটা নিয়মিত ও অনুমানযোগ্য থাকতে পারে তার ওপর। একজন জাহাজ-মালিক ‘কৌশলগত গুরুত্ব’ দেখে বিনিয়োগ করেন না। তিনি দেখেন, তার জাহাজ তিন দিন আটকে থাকবে কি না।
এবার সেই গভীরতার প্রশ্নে আসা যাক। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫ মিটার এবং মোংলায় ৮ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। অথচ বিশ্ববাণিজ্যের ভরকেন্দ্র সরে গেছে বিশাল মাদার ভেসেলের দিকে, যেগুলোর জন্য প্রয়োজন এর চেয়ে ঢের বেশি গভীর পানি।
ফল কী দাঁড়ায়? আমাদের রপ্তানি পণ্য প্রায়ই ছোট ফিডার জাহাজে চড়ে প্রথমে অন্য দেশের বন্দরে যায়, তারপর সেখান থেকে বড় জাহাজে ইউরোপ বা আমেরিকার পথ ধরে। এতে সময় বাড়ে, খরচ বাড়ে, আর আমাদের বাণিজ্যের একটা অংশের লাভ চলে যায় অন্যের বন্দরে। যে দেশ নিজেকে ‘সংযোগস্থল’ বলে দাবি করে, তার নিজের পণ্যই ঘুরপথে সংযুক্ত হচ্ছে।
সমাধানের প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতির ইতিহাসটা দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর। সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ২০১৫ সালে বাতিল হয়েছে। পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিকল্পনা ২০২১ সালে শেষ পর্যন্ত থিতিয়ে যায়, আর বন্দরটির চ্যানেল এখন ১০ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত ড্রাফটের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খোলা। থাকল মাতারবাড়ী। এ বন্দরে ১৬ মিটার ড্রাফটের এবং ৮ হাজার ২০০ টিইইউ পর্যন্ত বহনক্ষম জাহাজ ভিড়তে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে, আর এটি দেশের কনটেইনার সক্ষমতায় প্রায় ১০ লাখ টিইইউ যোগ করবে। বর্তমান ৩৫ লাখ টিইইউর তুলনায় এটি সক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি বৃদ্ধি। ১৬ মিটার মানে চট্টগ্রামের চেয়ে প্রায় দেড়গুণেরও বেশি গভীরতা। প্রত্যাশা ছিল বন্দরটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কার্যক্রম শুরু করবে। অথচ সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি প্রায় ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়ে আছে। সময়সূচি আর বাস্তবতার এ ফারাকই আমাদের ভূরাজনৈতিক আখ্যানের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। কূটনীতির ভাষায় আমরা ‘কেন্দ্র’, নির্মাণের ভাষায় আমরা এখনো প্রথম ধাপে। এর পাশে রাখুন প্রতিবেশীর হিসাব। কলকাতার হলদিয়া ডক কমপ্লেক্সে সর্বোচ্চ ড্রাফট মাত্র ৯ দশমিক ১ মিটার। অন্যদিকে ওড়িশার গোপালপুর বন্দরের সর্বোচ্চ ড্রাফট ১৪ দশমিক ৫ মিটার। মানে, বঙ্গোপসাগরের উপকূল জুড়ে গভীর পানির একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। এ দৌড়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, পিছিয়েও পড়তে পারি। সুযোগের জানালা চিরকাল খোলা থাকে না। যে বন্দর আগে গভীর হবে, জাহাজ কোম্পানির রুট পরিকল্পনায় আগে ঢুকবে সেই বন্দরই।
গুরুত্ব ঘোষণা করা সহজ। সেটাকে বন্দরের ঘাটে, রেললাইনের ওয়াগনে আর রপ্তানির হিসাবে রূপ দেওয়াই কঠিন। এ লেখায় আমরা মানচিত্র রেখে খতিয়ান খুলছি
জাতিসংঘের মূল সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাধারণ পরিষদ সম্প্রতি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বরে নির্ধারণ করেছে। বিএনপি সরকার ফেব্রুয়ারিতে এজন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছিল। ইকোসকের সুপারিশের পর কোনো দেশের বিরোধিতা ছাড়াই প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। ইইউসহ সমর্থনকারী দেশগুলো অবশ্য সংস্কারের তাগিদও দিয়েছে। অর্থাৎ সময় বেড়েছে, কিন্তু চাপ কমেনি। এখন হাতে আছে তিন বছরের প্রস্তুতির সুযোগ।
কেন এ সময় জরুরি, তা বোঝা যায় রপ্তানির কাঠামো দেখলে। জাতিসংঘের মূল্যায়ন অনুযায়ী আমাদের রপ্তানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিভিন্ন শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় যায়, আর এ নির্ভরতা অন্য কোনো উত্তরণশীল দেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। রপ্তানির প্রায় ৫৪ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে। একটি গবেষণা অনুযায়ী, উত্তরণের পর গড় শুল্ক প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়তে পারে, যার ফলে রপ্তানি আয়ে প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা আছে। আরও সতর্ক কিছু বিশ্লেষণ এ ক্ষতিকে বছরে ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত টেনে নিয়েছে, আর জিএসপি প্লাস সুবিধা না পেলে ইইউর সাধারণ শুল্কহার ৯ থেকে ১২ শতাংশ। অনুমানগুলোর মধ্যে ব্যবধান বড়; কিন্তু স্পষ্ট যে, প্রতিযোগিতা কঠিন হবে। সরকার নিজেই স্বীকার করেছে, কভিড, যুদ্ধ, আর্থিক খাতের অনিয়ম ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে প্রস্তুতি ব্যাহত হয়েছে। তাই বাড়তি তিন বছর স্বস্তির নয়, বরং শেষ সুযোগের।
এখানেই ভূগোলের আসল কাজ। শুল্কসুবিধা হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে দাম কমাতে হবে। দাম কমানোর সবচেয়ে বাস্তব উপায় লজিস্টিকস খরচ কমানো। একটি কনটেইনার চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি বড় জাহাজে উঠলে যে সময় ও ডলার বাঁচে, সেটা কোনো কূটনৈতিক বিবৃতির চেয়ে বেশি কাজ করে। গভীর সমুদ্রবন্দর তাই ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ নয়, এলডিসি-উত্তর যুগে টিকে থাকার
শর্ত। সময়সীমা ২০২৯।
বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ, একই সঙ্গে ফাঁদ। ফাঁদটা হলো, দুর্বল দরকষাকষির অবস্থানে গিয়ে আমরা ‘ভাড়াটে ভূগোল’ হয়ে যেতে পারি, যেখানে বন্দর, রাস্তা কিংবা জমি বিভিন্ন শক্তিকে দেওয়া হয় বিনিময়ে একটা তাৎক্ষণিক ঋণ বা প্রকল্পের বিনিময়ে। সুবিধা মেলে এক দিনের, দায় থেকে যায় দশকের পর দশক।
এর বিপরীত পথটা হলো ভূগোলকে ‘বাজারে’ রূপ দেওয়া। বাজার মানে, যেকোনো শক্তির বিনিয়োগ আমাদের নিজস্ব শর্তে, প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় এবং স্পষ্ট চুক্তিতে আসবে। যেমন বে-টার্মিনাল ও লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের মতো প্রকল্পে পাবলিক-প্রাইভেট মডেলে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল ও একটি বহুমুখী টার্মিনাল হবে, যেগুলো আনুমানিক ১২ মিটার ড্রাফট ও ৫ থেকে ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ সামলাতে পারবে। এখানে আসল প্রশ্ন প্রযুক্তি নয়, চুক্তির স্বচ্ছতা: কে অপারেটর হবে, কত বছরের জন্য, কী কার্যকারিতা-শর্তে, কেউ ব্যর্থ হলে কী হবে। একাধিক অপারেটর, একাধিক দেশ, একাধিক টার্মিনাল থাকলে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয় না। আর সবচেয়ে বড় কথা, আগে নিজের ঘর গোছাতে হবে।
বঙ্গোপসাগর নিয়ে বক্তৃতার সময় ফুরিয়েছে। এখন দরকার এমন একটি কর্মসূচি, যা সাধারণ মানুষও সংবাদপত্রে মিলিয়ে দেখতে পারবে।
এক. মাতারবাড়ীর প্রকল্পের প্রতিটি মাইলফলক, বিলম্বের কারণ ও নতুন তারিখ প্রতি তিন মাসে প্রকাশ হোক। ১৫ থেকে ১০০ শতাংশে যেতে কত সময় লাগবে, সেই জবাবদিহি জাতির প্রাপ্য।
দুই. চট্টগ্রামে নতুন বন্দরের অপেক্ষায় পুরনোটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। শুল্ক প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, শ্রম-অসন্তোষের আগাম মীমাংসা ব্যবস্থা এবং ধর্মঘট-প্রতিরোধী বিকল্প পথ— এই তিনটি না থাকলে রেকর্ড কনটেইনার সংখ্যাও ভঙ্গুর।
তিন. বন্দরে পণ্য নামা মানেই যাত্রা শেষ নয়। ঢাকা ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে দ্রুত এবং সাশ্রয়ী রেল-নৌ যোগাযোগ না থাকলে গভীর বন্দরও ট্রাকের জটে আটকে যাবে।
চার. রপ্তানি বৈচিত্র্যের সঙ্গে বন্দরের সমন্বয়। পোশাকের বাইরে চামড়া, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইটি সেবার রপ্তানি বাড়াতে হলে প্রতিটি খাতের জন্য বিশেষায়িত লজিস্টিকস (কোল্ড চেইন, বিশেষ গুদাম) গড়ে তুলতে হবে।
পাঁচ. ভারতের উত্তর-পূর্ব, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে ছোট পরিসরে হলেও কাস্টমস-সমন্বয়ের পরীক্ষামূলক করিডর চালু হোক। ৫ শতাংশের নিচে থাকা আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যকে ১০ শতাংশে তুলতে পারলেও তার প্রভাব হবে বিশাল।
ছয়. সমুদ্র-অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণে বহু বছর ধরেই একটি ঘাটতির কথা বলছে: সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান এবং আহরণের জন্য দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তির অভাব। সমুদ্রবিজ্ঞান, জাহাজ প্রকৌশল, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকসে বিশেষায়িত শিক্ষা না থাকলে গভীর সমুদ্রের সম্পদও অন্যের হাতে যাবে।
ভূগোল কোনো রাষ্ট্রকে ধনী করে না, সেই ভূগোলকে কাজে লাগানোর সক্ষমতাই করে। সিঙ্গাপুরের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না, ছিল একটি ভালো প্রশাসন আর একটি সময়ানুবর্তী বন্দর। আমাদের ভূগোল তার চেয়ে ঢের বেশি উপহার দিয়েছে: একটি বিশাল উপসাগরের শীর্ষবিন্দু, বিশাল যুবশক্তি, বিস্তৃত নদীজাল আর প্রতিবেশী বাজার। কিন্তু উপহার পাওয়া আর সেটি ব্যবহার করা এক জিনিস নয়।
২০২৯ সালের নভেম্বরের পর থেকে কাগজে-কলমে বাংলাদেশ আর ‘স্বল্পোন্নত’ থাকবে না। কিন্তু তকমা বদলালেই বাস্তবতা বদলায় না। সেই বদলের অর্থ পূর্ণ হবে তখনই, যখন আমাদের জাহাজ গভীর পানিতে ভিড়বে, আমাদের কনটেইনার সময়মতো বন্দর ছাড়বে আর আমাদের চুক্তিগুলো সাধারণ মানুষ পড়তে পারবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়




