বাধ্যতামূলক শিক্ষার লক্ষ্য পূরণ কবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র’ শিরোনামে একটি দলিল গ্রহণ করে। এর ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক তথা স্কুল থেকে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। জাতিসংঘের এ ঘোষণাপত্র প্রতিটি সদস্য-রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। অনেক রাষ্ট্র এরই মধ্যে সে অঙ্গীকার শতভাগ পূরণ করেছে, অর্থাৎ বাধ্যতামূলক স্কুল শিক্ষা এবং মেধাভিত্তিক উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে, বেশিরভাগ দেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে জন্মলাভের পরই ১৯৭২ সালে গৃহীত সংবিধানে ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘সার্বজনীন ও অবৈতনিক শিক্ষা’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে। বাংলাদেশ এর দুই বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বাংলাদেশ আগে থেকেই জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র সম্পর্কে অবহিত ছিল। তবে সে সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নির্ধারণ করে লক্ষ্য অর্জনে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ১৯৭৩ সালেই ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। এর আগে আমাদের দেশে পাকিস্তানকালে, এ ধরনের কোনো অঙ্গীকার পাকিস্তান সরকারের ছিল না। সে কারণে ধাপে ধাপে শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নে সরকারের কোনো শিক্ষানীতি ও পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর যাত্রা কেবল শুরু হয়েছিল। কিন্তু সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে যত সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি করা দরকার ছিল, তা করা হয়নি। তখন মহকুমাভিত্তিক শিক্ষা কমিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে এসএসসি কিংবা অষ্টম শ্রেণি পাস আবেদনকারীদের মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করত। স্থানীয় পর্যায়ের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। এ ধারা ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ১৯৮৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সরকারি নীতিমালা গেজেট প্রথম প্রকাশিত হয়। তবে এটি তখনো জেলাভিত্তিক আলাদাভাবে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৮৭ সালে প্রথম দেশব্যাপী শূন্য পদে লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রাথমিক শিক্ষক পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা সর্বনিম্ন এসএসসি নির্ধারিত হওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের উপযুক্ত পাঠদানের সক্ষমতা যাচাই-বাছাই খুব বেশি করা হতো না। ক্রমেই এ পদে দুর্বল প্রার্থীরা নানা উপায়ে নিয়োগ লাভের সুযোগ পেতে থাকেন, যা পরে দলীয় প্রভাব, অর্থের বিনিময় এবং বদলি পরীক্ষা দেওয়ার ও নানা অভিযোগ, তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়।
উন্নত দুনিয়ায় একই ক্যাম্পাসে প্রথম-দশম অথবা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থাপনা থাকে। তাদের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এলাকাভিত্তিক শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়
২০১০ সালে জাতীয়ভাবে একযোগে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার নীতিমালা গ্রহণ এবং ২০১৩ সাল থেকে তা অনুসরণ করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। দীর্ঘ কালক্ষেপণের ফলে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা মানসম্মতভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য আমাদের যে নীতিমালা অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল, তা না হওয়ার ফলে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার চিন্তা ভেস্তে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে নানা ধরনের প্রাথমিক বেসরকারি কেজি স্কুল, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা চলতে থাকে। ফলে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন থেকে আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিচ্যুত হয়ে পড়ি। দেশে গরিবের সন্তানরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার একটি ‘নিয়ম’ যেন চালু হয়ে যায়। অপেক্ষাকৃত ধনীরা তাদের সন্তানদের এ ধারা থেকে সরিয়ে নেন। মাদ্রাসার প্রতি আস্থাশীলরাও তাদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে সরিয়ে নেন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পড়াশোনার মানের বৈষম্যের কারণে হয় তারা শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ে অথবা দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দেখা যায়। বাস্তবে প্রতি বছর প্রায় ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার (স্কুল ও মাদ্রাসা) শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে অর্থাৎ প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। সরকারি তথ্য সূত্রমতে, সর্বশেষ ২০২৪ সালে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়েছে। শিক্ষার মানের চরম বৈষম্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়নি। প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া, অনুপস্থিত থাকা এবং ফলাফলের ওপরে ও নিচের দিকে থাকার ব্যাপক তারতম্য ঘটছে। প্রধান কারণ হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড় হিসেবে গড়ে উঠছে, অর্থাৎ মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার অভাব পরবর্তী শিক্ষাজীবনে তাদের সঙ্গী হয়েই যেন থাকে। আমাদের দেশে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্কুল যেন অনেকটাই ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে রয়েছে। সেখানেও বেসরকারি স্কুল-কলেজ, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বিশেষায়িত ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, মাদ্রাসাসহ নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহর ও গ্রামে রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখভাল করার সরকারি কোনো একক প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দুবার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবচ্ছেদ ঘটাতে হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনেও ছেদ ঘটে। এর নেতিবাচক প্রভাব তাদের শিক্ষাজীবনে পড়ে। বস্তুত, বাংলাদেশে আমরা প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলে ধরে রাখার লক্ষ্য অর্জন করতে পারছি না। মাধ্যমিক স্তরে বাধ্যতামূলক শিক্ষার লক্ষ্য আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই অর্জনের কথা ঘোষণা করতে পারেনি। কারণ, দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অবকাঠামগত ব্যবস্থা, শিক্ষক নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা প্রশাসনসহ যাবতীয় বিষয় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠায় স্কুল শিক্ষার মধ্যে কোনো সমন্বয় সাধন করা অনেকটাই যেন অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
উন্নত দুনিয়ায় একই ক্যাম্পাসে প্রথম-দশম অথবা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থাপনা থাকে। তাদের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এলাকাভিত্তিক শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সুতরাং সব স্কুলই সমমানের পঠন-পাঠন, জ্ঞান অর্জন, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করে থাকে। ছোট দেশ সিঙ্গাপুরে গেলেও একই মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবার দৃষ্টিতে পড়বে। উন্নত অন্যান্য দেশেও একই দৃশ্য দেখা যায়।
আমাদের গোড়াতেই অনেক গলদ। দূর করার দৃঢ় সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার যেন কেউ নেই! সে কারণে বাংলাদেশে দশম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেমন বিশাল চ্যালেঞ্জের কাজ— একই সঙ্গে মানসম্মত পঠন-পাঠন, শিক্ষাক্রম, দক্ষতা, জ্ঞান, অর্জনসহ শিক্ষার্থীদের বর্তমান জ্ঞানবিজ্ঞানের যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা মোটের ওপর একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অভ্যন্তরে এমন সব ভিন্ন ভিন্ন ধারার শিক্ষা এবং অব্যবস্থাপনার জট যেভাবে জটিল হয়ে উঠেছে, তা ছিন্ন করে বের হয়ে আসার উপায় বের করতে হবে। এরই মধ্যে পৃথিবীব্যাপী আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। আমরাও হলফ করে বলতে পারি না, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিশ্বমানের কোনো জ্ঞানী-বিজ্ঞানী জন্ম নিতে পারছে। সুতরাং, মানসম্মত বাধ্যতামূলক শিক্ষা এখন আমাদের অস্তিত্বের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন।
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক







