জীবনানন্দের যুগে যদি সেলফি থাকত!

ইরাজ আহমেদ
জীবনানন্দ দাশের ‘শ্যামলী’ কবিতার প্রথম লাইন ‘শ্যামলী তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতো’। কবিতাটি পাঠ করতে গিয়ে আচমকা মনে হলো, জীবনানন্দের যুগে সেলফি তোলার সুযোগ থাকলে মন্দ হতো না। সেকালের শক্তির মতো কোনো এক অজানা নারীর রূপ দেখা হয়ে যেত। কবি নিজে কোথায় দেখেছিলেন শ্যামলীর মুখ? হয়তো কোনোদিন দেখেননি। কল্পনায় জেগে ওঠা এক মুখ হয়তো তার চেতনাকে তাড়িত করেছে শুধু। মানব-মানবীর মুখ আসলে এমনই। মুখের রেখায় কত অনুভূতি, না-বলা কথার রেখাচিহ্ন, অনুরাগ, কামনা, কত যাত্রার ক্লান্তি, প্রাপ্তির আনন্দ! ৪৩টি পেশি আর ১৪টি হাড় দিয়ে গঠিত মানুষের মুখ কয়েক ডজন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে সক্ষম। সে প্রতিক্রিয়ার কিছুটা বোঝা যায়, বাকি কথা অবোধ্যই থেকে যায়। চোর, পুলিশ, ডাক্তার, প্রেমিকা, কবি, ভিখারি, অধ্যাপক, সেক্স-আইকন— প্রত্যেকের আলাদা আলাদা মুখ, পৃথক তাদের অভিব্যক্তি। ভিড়ের মানুষ কত ধরনের আবেগ মুখে সেঁটে নিয়ে পথ চলে। কতটুকু তার বুঝে ওঠা সম্ভব? তবুও পৃথিবীতে মানব-মানবীর সেই মুখেরই জয়গান।
এক সমীক্ষা বলছে, আজকের পৃথিবীর ৮৩০ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের মুখের ছবি প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে অর্ধেকই সেলফি। সেসব মুখের ভিড়ে শ্যামলীর মুখের দিকে কবে তাকিয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ?
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ইঙ্গমার বার্গম্যান নিজের সিনেমায় ক্লোজআপ শটের ওপর গুরুত্ব দিতেন। বার্গম্যান বলতেন, ‘মানুষের মুখের রেখায় তার উত্থান-পতনের গল্প লুকিয়ে থাকে।’
ডিজাইনার ও লেখক জেসিকা হ্যালফেন্ড তার বই ‘ফেইস, আ ভিজুয়াল অডিসি’তে মানুষের বিশেষ করে নারীর মুখের গল্প বলেছেন। জেসিকা মনে করেন, নান্দনিক মুখচ্ছবির প্রতিযোগিতা পৃথিবীতে লক্ষ কোটি টাকার এক শিল্প অথবা বাণিজ্য গড়ে তুলেছে। সেখানে পেশাদার মডেলিং থেকে সেলফি তোলার প্রতিযোগিতা সবই আছে। বেশ কয়েক বছর আগে মার্কিন মুলুকের একাডেমি অব প্লাস্টিক সার্জন থেকে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, পৃথিবীতে এখন নারীদের শুধু নাকের সার্জারি ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীরা শুধু নিজেদের মুখাবয়ব নয়, নিজেদের নাকের গড়ন নিয়েও বেশ উদ্বিগ্ন। তারা প্লাস্টিক সার্জারি করে বদলে নিচ্ছেন নাকের গঠন যাতে মুখের সৌন্দর্য আরও প্রখর হয়ে ওঠে। জীবনানন্দের কবিতায় শ্যামলীর নাকের গড়ন সম্পর্কে অবশ্য কোনো ধারণা পাওয়া যায় না।
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় মুখের সৌন্দর্য পাল্টে নেওয়ার কাহিনির বিবরণ আছে। ১৬০০ সালে ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ এবং তার আশপাশে থাকা নারীরা মুখের ত্বক আরও ফর্সা করার জন্য সিসা এবং ভিনেগারের সংমিশ্রণে তৈরি একধরনের বিষাক্ত ফেসপ্যাক ব্যবহার করতেন। জাপানে মধ্যযুগে গেইশা সম্প্রদায়ের নারীরা মুখ সুন্দর রাখতে পাখির বিষ্ঠা দিয়ে তৈরি প্রসাধন ব্যবহার করতেন।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, মানুষের মুখ সাধারণত ছয়টি আবেগকে প্রকাশ করে। তার মধ্যে রয়েছে— আনন্দ, বিষাদ, রাগ, ভয়, দুশ্চিন্তা ও ঘৃণা। কিন্তু মানুষ কখনো কখনো সুনিপুণ অভিনয়শিল্পীর মতো এ আবেগগুলোকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম। কিন্তু সবসময় সে অভিনয় প্রতিভা সাফল্য পায় না। মুখের রেখা আড়াল করতে পারে না আবেগের তীব্রতাকে। মানুষের ভ্রু, চোখ আর ঠোঁট কখনো শব্দহীনভাবে প্রকাশ করে দেয় অনেক প্রতিক্রিয়া।
একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের মুখের রেখা লম্বা সময়ের জন্য ঢাকা পড়েছিল মাস্কের নিচে। কভিড মহামারী মানুষকে বাধ্য করেছিল এ আড়াল বেছে নিতে। কবি শঙ্খ ঘোষের বিখ্যাত ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ কবিতার কাছে ফিরে যেতে হয়। অসুখের বিজ্ঞাপন মানুষের মুখকে আড়াল করে রেখেছিল তখন। মানুষের মুখের সঙ্গে মুখোশ বহুকাল ধরে গভীরভাবে যুক্ত। মুখোশ কখনো বাহ্যিক আবার কখনো মানসিক আড়াল হয়ে উঠেছে। ইলিয়াড মহাকাব্যের কাহিনিতে যে হেলেনের মুখশ্রীর কারণে সমুদ্রে ভেসেছিল হাজার জাহাজ, প্রাণ দিয়েছিল বহু বীরযোদ্ধা, সেই মুখই কখনো মুখোশের আড়ালে প্রতারিত করে। জীবনানন্দের কবিতার কাছে ফিরে দেখি তিনি লিখেছেন, ‘তোমার মুখের দিকে তাকালে এখনো/আমি সেই পৃথিবীর সমুদ্রের নীল, দুপুরের শূন্য সব বন্দরের ব্যথা, বিকেলের উপকণ্ঠে চিল, নক্ষত্র, রাত্রির জল, যুবাদের ক্রন্দন সব/শ্যামলী, করেছি অনুভব।’ মুখের রেখা আসলে চিররহস্যময়, প্রেমময়। মানুষের মুখের অভিব্যক্তির প্রকৃত রহস্য উদ্ধার করতে বহু অপরিমেয় যুগ হয়তো অতিক্রান্ত হবে।




