শ্রদ্ধাঞ্জলি
প্রজ্ঞার নির্জন আলোকবর্তিকা

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক
যখন কোনো মহীরুহের পতন ঘটে, তখন চারপাশটা হাহাকার করে ওঠে না, বরং এক গভীর ও স্তব্ধ নিস্তব্ধতা গ্রাস করে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন সেই নিস্তব্ধ প্রজ্ঞার নাম, যিনি দীর্ঘ চার দশক ধরে আমাদের ম্লান হতে যাওয়া চিন্তাশক্তি শাণিত করেছেন। আজ তার প্রয়াণ সংবাদটি যখন কানে এলো, মনে হলো সময়ের এক বিশাল জীবন্ত নথিপত্র হঠাৎ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। তিনি কেবল একজন অধ্যাপক বা প্রাবন্ধিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের জাতীয় জীবনের সেই ‘উদ্ধারকর্তা’— যখনই রাজনীতির কালো ধোঁয়া আমাদের নিশ্বাস রোধ করতে চেয়েছে, আমরা তার স্বচ্ছ চিন্তার জানলা খুলে বুক ভরে মুক্ত বাতাস নিয়েছি।
একটি নতুন পত্রিকা ‘আগামীর সময়’— যার উদ্বোধনী সংখ্যাটির প্রথম পর্বের বিষয় নির্ধারিত হয়েছে ‘রাজনীতি’। এই ঘোরতর রাজনীতির চলমান গোলকধাঁধায় পথ দেখানোর জন্য এবং উগ্রবাদ নিয়ে কথা বলার জন্য কার কণ্ঠস্বর সবচেয়ে বেশি অনিবার্য ছিল? আমরা যারা সংবাদপত্রের পাতায় শব্দ সাজিয়ে দিনাতিপাত করি, আমাদের কাছে একটি নামই ধ্রুবতারার মতো ভেসে উঠেছিল— অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। কারণ, তিনি বর্তমানকে দেখেন ইতিহাসের আয়নায় আর ভবিষ্যৎকে মাপেন দর্শনের নিখুঁত পাল্লায়। গত দেড় দশকের ‘জগদ্দল পাথর’ হয়ে চেপে বসা দুঃশাসন কিংবা ক্ষমতার সাম্প্রতিক সময়ে পালাবদলের সন্ধিক্ষণে যখনই আমাদের কলম থমকে গেছে নিরাপত্তার শঙ্কায়, যখন অ্যাক্টিভিস্টরা কথা বলতে গিয়ে ভয়ে কুঁকড়ে গেছেন, তখনই আমরা অধ্যাপক হকের কাছে ছুটে গিয়েছি। তিনি ছিলেন সেই প্রাজ্ঞ পুরুষ, যার কথা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কারও নেই; বড়জোর ক্ষমতাসীনরা অস্বস্তি নিয়ে তাকে ইগনোর করার ভান করতে পারে, কিন্তু তার যুক্তির হুল তাদের অবচেতনকে বিদ্ধ করবেই।
আজ দুপুর ১২টার দিকেও তার সঙ্গে আমার কথা হলো। কী অদ্ভুত আর অলৌকিক সমাপতন! আমাদের উদ্বোধনী সংখ্যার সাতজন বিশিষ্ট লেখকের সম্মানীর বিষয়ে তাকে ফোন করেছিলাম। বাকি ছয়জনের বিকাশ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অনায়াসেই পাওয়া গেল, কিন্তু অধ্যাপক হকের ক্ষেত্রে এসে থমকে যেতে হলো। তিনি জানালেন, তার কোনো বিকাশ নম্বর নেই, আর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঠিক নামটা কাল বাংলা একাডেমিতে গিয়ে আমাদের পাঠিয়ে দেবেন। এই আধুনিক ও যান্ত্রিক ডিজিটাল যুগেও তার এই ‘অর্থডক্স’ বা প্রথাবদ্ধ অবস্থান এক দীর্ঘশ্বাস উপহার দেয়। মনে পড়ে গেল ষাটের দশকের সেই ঋজু বুদ্ধিজীবীদের কথা, যাদের কাছে লেখালেখি ছিল এক পবিত্র ব্রত; যেখানে বৈষয়িক পাওনার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান ছিল সত্যের অনমনীয় প্রকাশ। তিনি কি আদৌ তার অগণিত নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারের কোনো বিনিময় গ্রহণ করতেন? নাকি তার রাষ্ট্রচিন্তা ও দার্শনিক আভিজাত্যের কাছে এই পার্থিব লেনদেনগুলো অতি তুচ্ছ ছিল?
কালের পরিক্রমায় দেখলেও বোঝা যায় তার ইতিহাসনিষ্ঠ দার্শনিক বুদ্ধিজীবীতা ছিল একেবারেই অবিচল। গত শতাব্দীর একাত্তর, পঁচাত্তর কিংবা নব্বইয়ের উত্তাল সময়, অথবা এই কৈশোরউত্তীর্ণ নয়া শতকের চব্বিশ ও চব্বিশ-উত্তর কালখণ্ডের বুদ্ধিজীবীতার খোঁজখবর নিলেই তা স্পষ্ট হয়।
অধ্যাপক হকের ব্যক্তিত্বে ছিল এক আশ্চর্য রেনেসাঁসুলভ দৃঢ়তা। তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল পুত্র ফয়সাল আরেফিন দীপনের হত্যাকাণ্ড। উগ্রবাদীদের চাপাতির আঘাতে যখন প্রগতিশীল প্রকাশক দীপনের রক্তে ভিজে গিয়েছিল ঢাকার মাটি, তখন শোকাতুর পিতার মুখে আমরা যা শুনেছিলাম, তা কোনো সাধারণ মানুষের কথা ছিল না। তিনি কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা প্রতিহিংসার বিচার চাইলেন না; বরং এক চরম নির্লিপ্ততায় বললেন— ‘আমি চাই মানুষের শুভবুদ্ধি জাগ্রত হোক।’
কোনো বিরাগ নেই, বিচার ব্যবস্থার ওপর কোনো হীনম্মন্যতা নেই, নেই কোনো অন্ধ আবেগ। তিনি যেন ইতিহাসের সেই সক্রেটিসের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন, যিনি হেমলক পানের মুহূর্তেও সত্যের রূপ সন্ধান করেন। এরপর যতবার তার মুখোমুখি হয়েছি, দেখেছি এক অদ্ভুত প্রাজ্ঞ গাম্ভীর্য। ব্যক্তিগত আবেগ বা পুত্রের স্মৃতি তিনি কখনো ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণের সামনে দাঁড় করাননি। কেউ কেউ হয়তো তাকে ‘আবেগহীন’ মনে করতে পারেন, কিন্তু আসলে তার প্রজ্ঞার গভীরতা ছিল রেনেসাঁ পুরুষদের মতো— যার শিখরে কেবল স্থিরতা আর শান্ত সমাহিত ভাব বিরাজ করে।
‘আগামীর সময়’ পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যার প্রথম পর্বে উগ্রবাদ নিয়ে তার সর্বশেষ নিবন্ধটি যেন এক চরম সতর্কবার্তা। তিনি স্পষ্টভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন কেন আমাদের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক দলগুলো বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। তার মতে, যারা ধর্মকে কেবল শত্রু জ্ঞান করে বা সমাজ থেকে বিলুপ্ত করতে চায়, তারা আসলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। তিনি মনে করতেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.) কেবল একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক; ফলে ইসলামের রাজনৈতিক দিকটিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। গণতন্ত্রীরা যদি সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে মানুষ বিকল্প হিসেবে ধর্মের দিকেই ঝুঁকবে। তিনি বামপন্থীদের হঠকারিতা এবং উদারপন্থীদের সুবিধাবাদের কঠোর সমালোচক ছিলেন। তার কাছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা ছিল অস্তিত্বের মূল ভিত্তি, যা কখনো কোনো পরিস্থিতিতেই আপসের বস্তু হতে পারে না।
অধ্যাপক হক ছিলেন এক জীবন্ত আর্কাইভ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তার চার দশকের পথচলা কেবল ব্যাকরণ বা সাহিত্যের চর্চা ছিল না, তা ছিল মননশীল প্রবন্ধ চর্চার এক অনন্য ও দীপ্তিময় ধারা। ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’— এমন সব কালজয়ী গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি বাঙালি জাতিকে তার শিকড় চিনিয়েছেন। অথচ কী আশ্চর্য আর নির্মম পরিহাস! যখনই আমাদের ক্রুশিয়াল সময় এসেছে, যখন আমরা নিরাপত্তার সংকটে ভুগেছি, তখন তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছি। কিন্তু প্রয়োজন ফুরালেই আমরা খুব সহজে তাকে ভুলে গেছি। অথচ এই অবহেলাতেও তিনি কখনো কোনো অভিমান করেননি।
আজ বড় বেশি মনে হচ্ছে, আমরা কেবল একজন গবেষক বা অধ্যাপককে হারাইনি, হারিয়েছি আমাদের এক পরম নির্ভরযোগ্য পরামর্শককে। শোককে শক্তিতে পরিণত করার যে অসাধ্য সাধন তিনি পুত্রশোকের পর করেছিলেন, তা আমাদের নৈতিকতার ইতিহাসে এক স্বর্ণালি অধ্যায় হয়ে থাকবে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আজ থেকে ‘ছিলেন’ হয়ে গেলেন সত্যি, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ৩২টি মৌলিক গ্রন্থ এবং তার অনন্য দার্শনিক নির্লিপ্ততা আমাদের পথ দেখাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
কালের পরিক্রমায় দেখলেও বোঝা যায় তার ইতিহাসনিষ্ঠ দার্শনিক বুদ্ধিজীবীতা ছিল একেবারেই অবিচল। গত শতাব্দীর একাত্তর, পঁচাত্তর কিংবা নব্বইয়ের উত্তাল সময়, অথবা এই কৈশোরউত্তীর্ণ নয়া শতকের চব্বিশ ও চব্বিশ-উত্তর কালখণ্ডের বুদ্ধিজীবীতার খোঁজখবর নিলেই তা স্পষ্ট হয়। অধ্যাপক হক চিরকাল কেবল তার নিজের সত্যটুকুই বলে গেছেন, যেখানে স্বার্থ হাসিলের কোনো হিসাব-নিকাশ ছিল না। আর তার সেই উচ্চারিত সত্যের গভীরে তাকালে এক বাংলাদেশ অবিকল চিনে নেওয়া যায়, যা আমাদের পরম চেতনা হিসেবে উদ্ভাসিত হতে পারে, আবার ব্যর্থতার এক বুকচেরা হাহাকার হয়ে বুকে বিঁধে থাকতে পারে।
স্যার, আপনি বলেছিলেন ধর্ম দিয়ে নয়, বরং মানুষের নৈতিক বোধ আর যুক্তি দিয়ে সমাজ গঠন করতে হবে। আপনার সেই আদর্শের মশাল বাংলাদেশ বা এদেশের চিন্তাজগতের তথাকথিত ‘ন্যারেটিভ যোদ্ধারা’ কতটুকু বহন করবেন, তা আমার জানা নেই। তবে যখনই কোনো ঘোর অন্ধকার আবার আমাদের চারপাশ ঘিরে ধরবে, আমরা আপনাকে খুব মিস করব। আপনি আপনার প্রিয় পুত্র দীপনের কাছে চলে গেছেন এক শান্ত, সমাহিত মেঘের মতো।
সবশেষে আপনার এক অনুগত ভক্ত হিসেবে শেষবারের মতো বলি— ‘ভালো থাকবেন স্যার।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক







