৭ নভেম্বর: ইতিহাসের বাঁকে বাংলাদেশ ও আগামীর প্রত্যাশা

ড. এ. আর. এম. মঈনউদ্দীন চৌধুরী লিটন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও আলোচিত দিন। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পরিচিত। এই দিনকে ঘিরে রয়েছে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ঐতিহাসিক স্মৃতি, সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের বর্ণনা এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপথ নিয়ে নানা মূল্যায়ন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করা হয়। সৈনিক এবং অফিসারের নেতৃত্বে সাধারণ সৈনিক ও জনতার এক গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। এই বিদ্রোহের ফলে সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন এবং জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আরোহণ করেন।
রাজনৈতিক বিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: এই ঘটনার পর বাংলাদেশে একদলীয় শাসন বাকশালের অবসান ঘটে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতির দুয়ার উন্মোচিত হয় । জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাত ধরে গঠিত বিএনপি এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের ধারা শুরু করে এবং দীর্ঘদিন এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হতো। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই ছুটি বাতিল করা হলেও ২০২৬ সালে অন্তর্বর্তীকালীন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতায় দিনটিকে পুনরায় সাধারণ ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দৈনিক যুগান্তরের একটি অনলাইন জরিপে দেখা গেছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব এবং তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা দূরীকরণের ভূমিকাকে নাগরিকরা কীভাবে দেখছেন:
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: ৬২% উত্তরদাতা এই দিনটিকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে মনে করেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান: ৬৫% মনে করেন এই দিনটি ১৯৭১-এর পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট ও বিশৃঙ্খলা থেকে দেশকে রক্ষা করেছিল।
ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি: ২৩% উত্তরদাতা এই দিনের সামরিক অভ্যুত্থান ও পরবর্তী হত্যাকাণ্ডগুলোকে নেতিবাচক বা ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেন।
নিরপেক্ষ/মন্তব্যহীন: ১৫% তরুণ প্রজন্ম এই দিনের ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ স্পষ্ট ধারণা রাখেন না।
রাজনৈতিকভাবেও যদি বিশ্লেষণ করি তাহলেও এই দিনের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি গঠিত হয় এবং বহুদলীয় রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দর্শন বিকশিত হয়।
তবে ইতিহাসের গভীরতা উপলব্ধি করতে হলে কোনো ঘটনাকে শুধু রাজনৈতিক আবেগের ভিত্তিতে বিচার করা যথেষ্ট নয়। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ, তৎকালীন সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর প্রভাব—সবকিছুরই তথ্যনির্ভর ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে কেবল নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা নয়; বরং সত্যকে যথাযথভাবে অনুধাবন করা।
বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী শক্তি: তাদের মতে, এই দিনটি ছিল বহিরাগত আধিপত্যবাদ এবং একদলীয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ সিপাহী ও জনতার এক অভূতপূর্ব সংহতি, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছে।
সংহতির চেতনা ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন
‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ নামের মধ্যেই সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। জাতীয় সংহতি অর্থ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের ঐক্য নয়; বরং মত, পথ ও আদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার এবং জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা।
আজকের বাংলাদেশে এই চেতনার প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে বিবেচনা করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত জাতীয় সংহতি অর্জন সম্ভব নয়।
আগামীর বাংলাদেশ
ইতিহাস থেকে ভবিষ্যতের শিক্ষা ইতিহাসের এই বাঁক থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং সমসাময়িক ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে আগামীর বাংলাদেশের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে:
জাতীয় ঐক্য ও বিভাজনের অবসান: ইতিহাসের রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ভিন্নতা থাকলেও, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং যেকোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সিপাহী-জনতা কিংবা ছাত্র-জনতার যে ঐতিহাসিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেই ঐক্যের চেতনাকে ধারণ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করা।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: কোনো ব্যক্তি বা দলীয় এজেন্ডার ঊর্ধ্বে উঠে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করা, যাতে ক্ষমতার অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
সার্বভৌমত্ব ও স্বনির্ভরতা: বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন এবং যেকোনো ধরনের নব্য-উপনিবেশবাদী বা আধিপত্যবাদী হস্তক্ষেপ থেকে দেশকে মুক্ত রাখা।
ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ পাঠ: রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাইরে গিয়ে ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়কে সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাথে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, যেখানে বীরত্ব যেমন স্থান পাবে, তেমনি অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়োগান্তক ঘটনার দায়ও স্বীকার করা হবে।
৭ নভেম্বরের মূল শিক্ষা হলো—জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও শক্তির বিরুদ্ধে কোনো শাসনই স্থায়ী হতে পারে না। আগামীর প্রত্যাশা হলো সেই শক্তির সঠিক ব্যবহার করে একটি জবাবদিহিমূলক, সমৃদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সুশাসনের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সমস্যার সমাধানে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যই থাকুক না কেন, এ দিনকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা সামনে আনা যেতে পারে—রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, জাতীয় স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা দলের চেয়ে বড় হলো রাষ্ট্রের সংবিধান, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। তাই ইতিহাসের উত্তরাধিকারকে সম্মান জানানোর সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে নাগরিকেরা নিরাপদে মত প্রকাশ করতে পারবেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ পাবেন এবং আইনের চোখে সমান মর্যাদা ভোগ করবেন।
৭ নভেম্বর বিএনপির কাছে নয় এই জাতির কাছে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এই দিনের স্মরণ রাজনৈতিক ইতিহাসের মূল্যায়নের পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তারও সুযোগ সৃষ্টি করে।
ইতিহাসকে জীবন্ত রাখতে হলে তাকে গবেষণা, যুক্তি ও সত্যের আলোকে বুঝতে হবে। আর ইতিহাস থেকে ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করতে হলে বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৭ নভেম্বরের প্রকৃত শিক্ষা হোক—জাতীয় স্বার্থে ঐক্য, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ একটি পিউর বাংলাদেশ নির্মাণ।
সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক গবেষক, হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান



