মধ্যবর্তী নির্বাচন
ডেমোক্র্যাটরা কি ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ ও শুল্কনীতিতে লাগাম টানবেন?

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কোণঠাসা ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। গতকালের নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের পর কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। আগামী জানুয়ারির শুরুতে বসবে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের তুলনায় বড় পরিবর্তন আসছে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে।
এখন ট্রাম্পের নীতির ওপর নজরদারি ও তার বিরোধিতা করা আইন আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতা বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের। তবে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট। ফলে ইরানযুদ্ধ, শুল্কনীতি ও অভিবাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নতুন কংগ্রেসের ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, আসন্ন হামলা ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা না করলে ৬০ দিনের মধ্যে সেই অভিযান বন্ধ করতে হয়
ইরান যুদ্ধ থামাতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ‘ইরান যুদ্ধের প্রভাব’ ছিল বলে স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, এর পেছনে ইরান যুদ্ধের একটি ভূমিকা ছিল। তবে একই সময়ে ইরানের বিষয়ে আমি যা করেছি, মানুষ তার গুরুত্বও বুঝেছে।’
ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল— মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায়। নির্বাচনী প্রচারে এই সমস্যাগুলোকে সামনে এনেছিল ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে দিয়েছেন অভ্যন্তরীণ খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি।
গত ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানে যুদ্ধ শুরু করেন ট্রাম্প। নতুন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও প্রেসিডেন্ট চাইলে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বাধা আসতে পারে। আগামী ১১ ডিসেম্বর বর্তমান সরকারি ব্যয় বরাদ্দের মেয়াদ শেষ হবে। নতুন অর্থায়ন আটকে দেওয়ার ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। এতে ট্রাম্পের নেওয়া সামরিক সিদ্ধান্তে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
তবে বিষয়টি সহজ হবে না বলেই মন্তব্য করেছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিকসের গবেষক জেমস বয়েস। তার ভাষায়, ‘কংগ্রেস অর্থায়ন বন্ধ করতে চাইতে পারে। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা মোতায়েন থাকা অবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে। এতে মনে হতে পারে মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে ব্যবহৃত হতে পারে ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন। যদিও ১৯৭৩ সালের এ আইন প্রয়োগের আগের উদ্যোগগুলো কখনোই কার্যকর ফল আনতে পারেনি।
আইন অনুযায়ী, আসন্ন হামলা ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা না করলে ৬০ দিনের মধ্যে সেই অভিযান বন্ধ করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ভেটো দিতে পারেন। তবে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন ছাড়া সেই ভেটো অকার্যকর করা সম্ভব নয়। নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা দুই কক্ষের কোনোটিতেই এতটা নয়।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কংগ্রেসের ক্ষমতা সীমিত থাকবে বলে মনে করেন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের ইউসিডি ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাস।
তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনে ভোটারদের অসন্তোষের স্পষ্ট বার্তা পেয়েছেন ট্রাম্প। তার সঙ্গে ‘দূরত্ব তৈরি করতে পারেন’ এমন কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।’
এক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন লুকাস।
তার ভাষ্য, ‘জেডি শুরু থেকেই যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছেন। গত সপ্তাহে ইরানের নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানকে চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, আলোচনার পথ আবার চালু করে নতুন হামলা এড়ানোর চেষ্টা করছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।’
অধ্যাপক লুকাসের প্রশ্ন, ‘এখন কি যুদ্ধ বন্ধে আরও জোরালো ভূমিকা নেবেন তিনি?’
গবেষক জেমস বয়েস অবশ্য তা মনে করেন না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী দুই মেয়াদের পর ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করতে পারবেন না। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে তিনি আরও স্বাধীন মনে করতে পারেন।
‘এখন ট্রাম্পের মনে হতে পারে, বিশ্বমঞ্চে তিনি যা খুশি করতে পারবেন, তাকে জবাবদিহি করতে হবে না’, বলেছেন এ গবেষক।
অবশ্য এমন হলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের দুর্বল অবস্থান ঢাকতে মধ্যপ্রাচ্যে নীতি আরও কঠিন করে তুলতে পারেন ট্রাম্প। চেষ্টা করতে পারেন নিজের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠারও।
‘বিতর্কিত’ শুল্কনীতির কী হবে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে গত বছর প্রায় ৯০টি দেশের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। এতে বিশ্ববাজারে তৈরি হয় অস্থিরতা। গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট ওই শুল্ক বাতিল করে। তবে বিকল্প আইনি পথ ব্যবহার করে শুল্কনীতি কার্যকর রাখার চেষ্টা করে ট্রাম্প প্রশাসন।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কয়েক দিন পরই নতুন আইনের ভিত্তিতে নির্বাহী আদেশে শুল্কের হার ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেন ট্রাম্প। তবে এসব শুল্কের মেয়াদ ১৫০ দিন। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এ মেয়াদ বাড়ানো যায় না।
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে দেশটিতে আরও বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। কারণ, আমদানিকারকরা বাড়তি শুল্ক পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে। আর তা চেপে বসে ভোক্তাদের ওপর। ডেমোক্র্যাটরা এ নীতিকে বলেছে ‘মার্কিনিদের পকেট কাটা’।
নতুন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাবার পর শুল্কের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। এতে সাময়িক স্বস্তি পাবেন রপ্তানিকারকরা। যদিও বাণিজ্যনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং নতুন প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
জেমস বয়েস বলেন, ‘শুল্ক নিয়ে আইনি লড়াই এখনো চলছে। এরই মধ্যে আদায় করা শুল্কের অর্থ সরকারকে ফেরত দিতে হবে কি না এবং দিতে হলে কতটা ফেরত দিতে হবে, তা নিয়েও বিরোধ আছে।’
তবে দলের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এলেও চীনের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে কংগ্রেস। এক্ষেত্রে ‘রিমোট অ্যাকসেস সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ এবং ‘চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ নিয়ে কাজ এগোতে পারে। প্রথম আইনটি কার্যকর হলে মার্কিন পণ্য, সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিতে দূর থেকে প্রবেশের ক্ষেত্রেও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধ বাড়বে।
আর দ্বিতীয় আইনটি উন্নত এআই চিপ অনুমোদিত স্থানে আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে যাচাই করতে হবে। এর উদ্দেশ্য, বিদেশি প্রতিপক্ষের হাতে যেন এসব চিপ চলে না যায়!
অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ
আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাস বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলে কংগ্রেসের সব কমিটির সভাপতির দায়িত্ব এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাবে। এসব কমিটির তদন্ত শুরু করা এবং সাক্ষীদের তলব করার ক্ষমতা রয়েছে।
এর ফলে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, যৌনঅপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং ইরানযুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত হতে পারে। ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের উদ্যোগও নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতির বিষয়েও ব্যাপক তদন্তের পরিকল্পনা রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের। শরণার্থী ও অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কর বিভাগ এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় ও তথ্য বিনিময়ের বিষয়টি তদন্ত করতে নতুন পাওয়া তলব ক্ষমতা ব্যবহারের কথা বারবার বলেছেন তারা।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর অংশ হিসেবে বিমানবন্দরে মানুষকে আটক এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে হাজির করার ঘটনাও ঘটেছে। মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে ফক্স নিউজের প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, নিবন্ধিত ভোটারদের ৫৩ শতাংশ মনে করেন, অভিবাসনবিরোধী অভিযান মাত্রা ছাড়িয়েছে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের প্রায় ৭০ শতাংশই অপরাধী। তবে সমালোচকরা এ সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একজন অভিযুক্ত নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হন।
আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর নাজমুস সাকিব রহমান






