গবেষণাপত্র প্রকাশে সঠিক জার্নাল নির্বাচন করবেন কীভাবে?

ছবি : এআই
দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানসহ নানা ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষক ও গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। কিন্তু এই দীর্ঘদিনের মেধা, শ্রম ও অর্থ ব্যয়ে প্রস্তুত করা গবেষণার ফলাফল বিশ্ব দরবারে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই দেখা দেয়; আর তা হলো, কোন জার্নালে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করা উচিত? একটি জার্নাল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কি না, বিশ্বখ্যাত ডেটাবেসগুলোতে এর ইনডেক্সিং এবং ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কত, গবেষণাপত্রের মূল বিষয়বস্তুর সঙ্গে জার্নালটির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এবং প্রকাশনার প্রক্রিয়াটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, এসব বিষয় গভীরভাবে যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো গবেষণাও ভুল জায়গায় প্রকাশিত হয়ে তার গুরুত্ব হারাতে পারে।
গবেষণাপত্র প্রকাশ করা স্রেফ কোনো একাডেমিক আনুষ্ঠানিকতা বা ডিগ্রি লাভের মাধ্যম নয়; এটি হলো গবেষকের দীর্ঘদিনের কঠোর শ্রম, মেধা ও সৃজনশীলতার ফসলকে বৈশ্বিক জ্ঞানজগতে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান পথ। তাই জার্নাল নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে সঠিক তথ্য যাচাই, গবেষণার মান এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বিবেচনা করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সঠিক নির্দেশনার অভাবে কিংবা দ্রুত প্রকাশের তাড়াহুড়ায় অনেক প্রতিশ্রুতিশীল গবেষক ভুল জার্নালে পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আন্তর্জাতিক একাডেমিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং গবেষণার যথার্থ মূল্যায়ন পেতে হলে বাংলাদেশের গবেষকদের মধ্যে জার্নাল নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা ও সতর্কতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
জার্নাল নির্বাচনের প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ইনডেক্সিং বা আন্তর্জাতিক গবেষণা ডেটাবেসে জার্নালটির অন্তর্ভুক্তি যাচাই করা। সহজ ভাষায়, ইনডেক্সিং হলো নির্দিষ্ট ও স্বীকৃত কোনো গবেষণা ডেটাবেসে একটি জার্নালের প্রকাশিত নিবন্ধগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে সারা বিশ্বের গবেষকেরা খুব সহজেই অনুসন্ধান করে প্রাসঙ্গিক নিবন্ধ খুঁজে পেতে পারেন। তবে বাজারে বিদ্যমান সব ডেটাবেসের গুণগত মান ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা এক নয়। কোনো জার্নাল সাধারণ কোনো ডিরেক্টরিতে তালিকাভুক্ত থাকলেই সেটিকে স্কোপাস কিংবা ওয়েব অব সায়েন্স-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ ডেটাবেসে অন্তর্ভুক্ত জার্নালের সমতুল্য বলা যায় না। স্কোপাস এবং ওয়েব অব সায়েন্স অত্যন্ত কঠোর পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জার্নাল তালিকাভুক্ত করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য পাবমেড, কৃষিবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ক্যাব অ্যাবস্ট্রাক্টস বা উন্মুক্ত প্রকাশনার জন্য ডিওএজে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। গবেষকদের মনে রাখতে হবে, জার্নালের ওয়েবসাইটে কোনো ডেটাবেসের লোগো দেখলেই সেটিকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যাবে না; বরং সংশ্লিষ্ট ডেটাবেসের মূল ওয়েবসাইটে গিয়ে জার্নালের নাম, ই-আইএসএসএন এবং প্রকাশকের নাম অনুসন্ধান করে সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
ইনডেক্সিং যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডেটাবেস থেকে কভারেজ বাদ পড়া। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো জার্নাল অতীতে হয়তো স্কোপাস বা ওয়েব অব সায়েন্সে অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে মান ধরে রাখতে না পারায় বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সেটি তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কিন্তু জার্নালটি তাদের ওয়েবসাইটে পুরোনো প্রশংসাপত্র বা ইনডেক্সড থাকার ভুয়া দাবি প্রদর্শন করে গবেষকদের বিভ্রান্ত করতে থাকে। তাই গবেষকদের অবশ্যই দেখতে হবে জার্নালটির বর্তমান কভারেজ চালু আছে কি না। অতীতে কোনো ডেটাবেসে তালিকাভুক্ত থাকা আর বর্তমানে তালিকাভুক্ত থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। এই অসাবধানতার কারণে গবেষকের মূল্যবান কাজ বাতিল হয়ে যেতে পারে, যা প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নে কোনো ভূমিকা রাখে না।
জার্নালের গুণগত মান ও প্রভাব মূল্যায়নে ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর, সাইটস্কোর, এসজেআর এবং স্নিপ-এর মতো সূচক ব্যবহৃত হয়। তবে গবেষকদের বুঝতে হবে যে এসব সূচকের সংজ্ঞা ও গণনার পদ্ধতি আলাদা। ফলে ভিন্ন সূচকের মানকে সরাসরি একে অপরের সঙ্গে তুলনা করা যুক্তিসংগত নয়। যেমন, জার্নাল ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর মূলত ক্লারিভেট-এর জার্নাল সাইটেশন রিপোর্টস দ্বারা নির্ধারিত হয়, আর সাইটস্কোর হলো স্কোপাস-ভিত্তিক পরিমাপক। সমস্যা দেখা দেয় যখন গবেষকেরা কেবল একটি সংখ্যার ভিত্তিতে দুটি ভিন্ন বিষায়ক জার্নালের মান তুলনা করেন। উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসাবিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞানের জার্নালে উদ্ধৃতির হার যেভাবে বাড়ে, সমাজবিজ্ঞান বা কৃষি সম্প্রসারণের বিষয়গুলোতে সাইটেশন সেভাবে বাড়ে না। ফলে শুধু ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের সংখ্যা দেখে এক বিষয়ের জার্নালের সঙ্গে অন্য বিষয়ের জার্নালকে তুলনা করলে ভুল সিদ্ধান্ত হবে। এছাড়া বাজারে অসংখ্য ভুয়া ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে; এই ভুয়া মেট্রিকগুলো সম্পর্কে গবেষকদের সতর্ক থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক জার্নাল মূল্যায়নে কোয়ার্টাইল বা কিউ১, কিউ২, কিউ৩ এবং কিউ৪ র্যাংকিং অত্যন্ত পরিচিত। নির্দিষ্ট কোনো বিষয়শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত জার্নালগুলোকে তাদের সাইটেশন ও প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে সমপরিমাণ চার ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে কিউ১ নির্দেশ করে ওই বিষয়ের শীর্ষ ২৫ শতাংশ জার্নালকে, কিউ২ পরবর্তী ২৫ শতাংশ, কিউ৩ তার পরের ২৫ শতাংশ এবং কিউ৪ হলো তালিকার শেষ ২৫ শতাংশ। তবে গবেষকদের মনে রাখতে হবে, একই জার্নাল একাধিক বিষয়ে গবেষণা প্রকাশের কারণে এক ক্যাটাগরিতে কিউ১ হলেও অন্য ক্যাটাগরিতে কিউ২ হতে পারে। আবার প্রতি বছর সাইটেশনের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই অবস্থান পরিবর্তিত হয়, তাই বর্তমান বছরের সর্বশেষ কোয়ার্টাইল দেখে নেওয়া জরুরি। তবে কিউ১ জার্নালে প্রকাশিত হলেই যে গবেষণাপত্রটি উচ্চমানের হবে, আর কিউ৩ বা কিউ৪-এ প্রকাশিত হলে সেটি মানহীন হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। কোয়ার্টাইল কেবল জার্নালের একটি আপেক্ষিক অবস্থান নির্দেশ করে, তা গবেষণার গুণমানের একমাত্র মাপকাঠি নয়।
গবেষণাপত্র প্রকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জার্নালের লক্ষ্য ও পরিধি-এর সঙ্গে নিজের গবেষণার বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য রাখা। কোনো জার্নাল উচ্চমানের হলেও যদি সেখানে গবেষণার বিষয় উপযুক্ত না হয়, তবে পাণ্ডুলিপি শুরুতেই সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকের জীবিকায়ন নিয়ে প্রস্তুতকৃত গবেষণার প্রধান অংশ যদি হয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব, তবে সেটিকে নিছক কৃষিবিজ্ঞান জার্নালে না পাঠিয়ে পরিবেশ-সমাজবিজ্ঞান কিংবা উন্নয়ন বিষয়ক জার্নালে পাঠানো অধিক উপযোগী। তাই পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট জার্নালের লক্ষ্য পড়ে নেওয়া এবং সেখানে সাম্প্রতিক প্রকাশিত নিবন্ধগুলো পর্যালোচনা করা উচিত। এতে বোঝা যায় জার্নালটি কী ধরনের পদ্ধতি ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিচ্ছে এবং সেখানে নিজের কাজ মানানসই হবে কি না।
বর্তমান একাডেমিক বিশ্বের বড় হুমকি হলো শিকারি জার্নাল বা প্রেডেটরি জার্নাল এবং মানহীন পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়া। একটি মানসম্মত জার্নাল সর্বদা নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কঠোর পিয়ার রিভিউ নিশ্চিত করে, যেখানে গবেষণার পদ্ধতি, তথ্যের সত্যতা ও ফলাফলের যৌক্তিকতা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু শিকারি জার্নালগুলো কোনো পর্যালোচনা ছাড়াই কেবল আর্টিকেল প্রসেসিং চার্জআদায়ের উদ্দেশ্যে দ্রুততম সময়ে গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেয়। এসব জার্নাল থেকে বাঁচতে গবেষকদের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্যদের পরিচয় যাচাই করতে হবে, প্রকাশকের বিশ্বাসযোগ্যতা দেখতে হবে এবং প্রকাশনার নিয়মকানুন খতিয়ে দেখতে হবে। গবেষকেরা এই জটিলতা এড়াতে ‘Think. Check. Submit’-এর মতো স্বীকৃত চেকলিস্ট ব্যবহার করে জার্নালের সততা সহজেই যাচাই করতে পারেন।
একই সাথে প্রকাশনা ফি, প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের ভূমিকাও অনেক বড়। উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার বা ওপেন অ্যাক্সেস জার্নালগুলোতে প্রায়শই মোটা অঙ্কের ফি প্রয়োজন হয়, যা আমাদের অনেক গবেষকের পক্ষে একা বহন করা কঠিন। তাই পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার আগেই জার্নালের ফি কাঠামো ও ফি মওকুফের সুযোগ সম্পর্কে পরিষ্কার হতে হবে। গবেষকদের জন্য কার্যকর কৌশল হলো প্রকাশের জন্য উপযুক্ত তিন থেকে চারটি জার্নালের একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করা। প্রতিটি জার্নালের ইনডেক্সিং, বিষয় সামঞ্জস্য, ফি ও পর্যালোচনার সময় বিবেচনা করে প্রথম পছন্দটিতে আগে পাণ্ডুলিপি পাঠানো উচিত। যদি কোনো কারণে তা প্রত্যাখ্যাত হয়, তবে প্রাপ্ত মতামত অনুযায়ী নিবন্ধটি পরিমার্জন করে তালিকার পরবর্তী জার্নালে পাঠানো যায়। তবে একই সময়ে কখনোই একাধিক জার্নালে একই পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়া যাবে না, কারণ এটি একাডেমিক নীতিবিদ্যার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
গবেষণাপত্র প্রকাশের এই বিভ্রান্তি দূর করার দায়িত্ব কেবল ব্যক্তিগতভাবে গবেষকের নয়; বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোরও এখানে গঠনমূলক ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জার্নাল যাচাইকরণ সেল, লাইব্রেরি ভিত্তিক তথ্য সহায়তা এবং তরুণ গবেষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন করা প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক পদোন্নতি বা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেবল 'প্রকাশনার সংখ্যা' না দেখে গবেষণার প্রকৃত মান, নৈতিকতা ও সামাজিক প্রভাবকে প্রধান মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে। অন্ধভাবে উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের পেছনে না ছুটে সঠিক জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য পিয়ার রিভিউ-এর মাধ্যমে গবেষণা প্রকাশ করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। তবেই বাংলাদেশের মেধাবী গবেষকদের পরিশ্রম বৈশ্বিক অঙ্গনে সঠিক মর্যাদা পাবে এবং দেশের টেকসই উন্নয়নে বাস্তব অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
লেখক : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা
[email protected]



