মাতিস রঙের সুন্দর

অঁরি মাতিস (৩১ ডিসেম্বর ১৮৬৯ - ৩ নভেম্বর ১৯৫৪)
আমি মাতিসের আসল ছবি সরাসরি দেখিনি। প্যারিসের পঁপিদু সঁত্রের দেয়ালে ‘লা দঁস’-এর সামনে আমি দাঁড়াইনি, নিস্-এর মাতিস মিউজিয়ামের জানালা দিয়ে ভূমধ্যসাগরের আলো আমার চোখে পড়েনি, হার্মিটেজের ‘নৃত্য ও সঙ্গীত’ প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিঃশ্বাস নিইনি। আমার মাতিস-দর্শন সবটুকু ইন্টারনেটের সুবাদে— কম্পিউটারের স্ক্রিনে, মোবাইলের ছোট্ট কাচে বা কোনো ডিজিটাল আর্কাইভের ধূসর হতে থাকা থাম্বনেইলে। ক্যামেরা, লেন্স, মনিটরের রং-সেটিং— সব মিলিয়ে একটা অসম্পূর্ণ ছায়া। তবু সেই ছায়ার ভেতর দিয়েও এমন ঝলক আসে যে মনে হয়, মাতিস বুঝি আমার মনের দেয়ালেই ঝুলে আছেন। আসলটা দেখলে হয়তো আমার চোখ টলে যেতে পারে, তাই ঈশ্বর সে সৌভাগ্য দেননি। কিন্তু সেই অসম্ভব সম্ভাবনার আকাঙ্ক্ষাটুকুই হয়তো মাতিসের সবচেয়ে বড় উপহার— তিনি আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে রঙের ভেতরটাকে যাপন করতে হয়, অপেক্ষা করতে হয় একটা চিত্রকর্মের অন্তর কখন হৃদয় খুলে দেবে।
এই লেখায় আমি মাতিসের জীবন ও তার চিত্রকলাকে আলাদা করে লিখতে চাই। জীবনীতে থাকে তারিখ, বিয়ে, বিচ্ছেদ, অসুস্থতা, বন্ধুত্ব, রাজনীতি। ক্যানভাসে থাকে রঙ, রেখা, আকৃতি, নৈঃশব্দ্য। দুটোকে এক করে ফেলার ঝুঁকি অন্তত নিজস্ব শিল্পের যুক্তিবাদী আমি নিতে চাই না। তাই চলুন প্রথমে জীবনটাকে সাজিয়ে নিই, তারপর ক্যানভাসের ভেতর দিয়ে ফিরে তাকাই সেই জীবনের দিকে।
মায়ের দেয়া রঙের বাক্স
১৮৯০ সালের শীতকাল। উত্তর ফ্রান্সের এক ছোট্ট শহর। তরুণ এক আইনজীবী ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠলেন পাঁজরে অদম্য ব্যথা নিয়ে। সন্ধ্যা নাগাদ তাকে অপারেশন টেবিলে শুইয়ে পেট কাটতে হলো অ্যাপেন্ডিসাইটিসের জন্য। পরের সপ্তাহে তিনি মায়ের বাড়িতে বিছানা বন্দী— করার কিছু নেই, শুধু সেরে ওঠা, অপেক্ষা, আর ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকা।
মা একটা রঙের বাক্স এনে দিলেন। ছেলে চায়নি, আগে কখনো ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ দেখায়নি— মা শুধু ভেবেছিলেন, সুস্থ হওয়ার দীর্ঘ নিঃশব্দ সময়টায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার কিছু দরকার। ছেলের বয়স বিশ। নাম অঁরি মাতিস। তিনি আইন পড়ছিলেন কারণ আইন পড়াই ছিল তখনকার রীতি, আর আইনের নথি নকল করছিলেন কারণ আইন পড়ার পর সেটাই করার কথা। তার আগে শৈশব কৈশোর জুড়ে জীবনে কিছু আঁকেননি। আঁকবেন বলে বিশ্বাস করার কোনো কারণও তার ছিল না। কিন্তু মা বাক্সটা এনে দিলেন, তিনি বাক্স খুললেন, আর শুরু হয়ে গেল, যেনও খুললো এক প্যান্ডোরার বাক্স।
প্রথম দিনগুলোতে ওই ঘরে একা, হাতে তুলি নিয়ে তিনি যে অনুভব করেছিলেন, বাকি জীবনটা সেই অনুভূতিকে ভাষায় ধরতে চেয়েছেন— ব্যর্থ হয়েছেন, আবার চেষ্টা করেছেন। তিনি একে বলেছিলেন, এক ধরনের স্বর্গ। প্রথমে তিনি খুব একটা ভালো ছিলেন না। কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না, কম্পোজিশনের চোখ ছিল না, রঙ মেশানো বা হাতকে হাতের মতো দেখানোর কৌশল জানতেন না। কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কারণ তিনি যা খুঁজে পেয়েছিলেন তাকে দক্ষতা নয়— অনুমোদন বলে। দেখার অনুমতি, স্থির বসে থাকার অনুমতি, দেখার কাজটাকে সৃজনের কাজে বদলে দেওয়ার অনুমতি।
সুস্থ হয়ে তিনি আবার আইন অফিসে ফিরলেন। কিন্তু চিরদিনের জন্যই কিছু বদলে গিয়েছিল। তিনি সেই অন্য জিনিসটার স্বাদ পেয়ে গিয়েছিলেন— যার তখনো নাম নেই, কিন্তু যা আদালত বা লাইব্রেরিতে করা যেকোনো কাজের চেয়ে বেশি বাস্তব মনে হয়েছিল। ভোরে আর রাতে চুপচাপ আঁকতে লাগলেন, দিনের কিনারা থেকে সময় চুরি করতে লাগলে। কাউকে বললেন না কী করছেন।
মাতিসের জন্ম ১৮৬৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর, উত্তর ফ্রান্সের ল্য কাতো-কঁব্রেজিতে, বেলজিয়ান সীমান্তের কাছে ছোট একটা জায়গায়— টেক্সটাইল মিল, বিস্তীর্ণ শস্যের প্রান্তর আর ধূসর নিচু আকাশের অঞ্চল। বাবা বীজ আর হার্ডওয়্যার বিক্রি করতেন। মা সিরামিক কারখানায় চিনামাটির বাসন আঁকতেন— সাজসজ্জার প্লেট, ফুলদানি, ছোট ছোট পুনরাবৃত্ত নকশা, যা তিনি যত্ন আর কারখানার গতিতে ফুটিয়ে তুলতেন। বাড়িতে কোনো আঁকা ছবি ছিল না, ছবি আঁকার বই ছিল না, এমন পরিবারের ছেলের জন্য এমন জীবন সম্ভব— এমন কোনো ধারণাও ছিল না কারও। মাতিস যে পৃথিবীতে বড় হয়েছেন সেটা ছিল পরিশ্রমী, প্রায়োগিক, কাজের জিনিস বানানোর পৃথিবী। সৌন্দর্য যখন দেখা দিতো, তা সবসময় ছিলো উপজাত, লক্ষ্য নয়।
১৮৯১ সালে তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিলেন যা পরিচিত সবার কাছে অবোধগম্য লাগলো। বাবাকে বললেন, আইনপেশা ছাড়ছেন। বললেন, ছবি আঁকা শিখতে প্যারিসে যাচ্ছেন। মাতিসের বাবা— যে বেচারা বীজ এবং হার্ডওয়্যার এর ওপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে অর্জিত সামান্য নিরাপত্তার ওপর বাজি ধরে জীবন চালাচ্ছিলেন— অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। বুঝতে পারলেন না, ছেলে কেন একটা পেশা, একটা ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেবে এমন অনিশ্চিত, অপ্রায়োগিক জিনিসের জন্য। কিন্তু মাতিসকে থামানো গেলো না। বয়স একুশ, উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিভা নেই, সম্পর্ক নেই, নিজের টাকা নেই, সফল হবেন বলে বিশ্বাস করার কারণ নেই। তিনি শুধু জানতেন, ডেস্কের নথি আর ওকালিত, ওসবে ফিরে যেতে পারবেন না।
নকল থেকে নিজের রঙ
প্যারিসে পৌঁছে ভর্তি হলেন জুলিয়েট একাডেমিতে (আকাদেমি জুলিয়ঁতে)— প্রথাগত অঙ্কন প্রশিক্ষণের কারখানা, যেখানে তরুণ-তরুণীরা শিখতে আসতো একাডেমিক শিল্পের ব্যাকরণ: অনুপাত, শারীরবৃত্ত, কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কেমন আঁকা হবে, মসৃণ ফিনিশের কারিগরী। মাতিস সহপাঠীদের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। দক্ষতায়? পিছিয়ে।
তার আঁকা ছিল শক্ত, রঙ কর্দমাক্ত, কম্পোজিশন? বিশ্রী। তিনি এক ধরনের কঠোর সংকল্প নিয়ে কাজ করতেন— যেন এখনো আইনের নথি নকল করছেন, যেন শুধু পরিশ্রম দিয়েই হারানো বছরগুলোর ক্ষতি পূরণ করে ফেলবেন। এক বছর পর তিনি ভর্তি হলেন একোল দে বোজার-এ— ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিল্পবিদ্যালয়ে। সেখানে গুস্তাভ মোরোর স্টুডিওতে ঢুকলেন। মোরো সেই ধাঁচের শিল্পী যারা নিয়মে বিশ্বাস করতেন না। বলতেন, সবকিছু দেখো, লুভরে যাও, পুরনো আর নতুন মাস্টারদের দেখো আর পড়ো, নিজের স্বতন্ত্র দৃষ্টিটা খুঁজে বের করো। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সেই সেতু যার উপর দিয়ে তোমরা পার হবে, তারপর আমাকে ভুলে যাবে’।
মোরোর নির্দেশনায় মাতিস বুঝতে শুরু করলেন, ছবি আঁকা মানে পৃথিবীর নকল করা নয়— পৃথিবী তার মনে কী অনুভূতি তৈরি করে তার ভাষা খুঁজে বের করা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লুভরে বসে স্থির-চিত্রকরদের কাজ নকল করতেন মাতিস।
কিন্তু ইমপ্রেশনিস্ট ও পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্টরাই তার রঙ দেখার ধরন দিলেন বদলে। ক্লদ মানে আর পিসারো দেখালেন আলোকে বিশুদ্ধ রঙের আঁচড়ে ভেঙে দিতে। সেজানের কাজ দেখে তার ভেতরে নতুন উঠল। সেজান আঁকতেন যেন পৃথিবীকে শুরু থেকে গড়ছেন— যেন প্রতিটি আপেল, প্রতিটি পাহাড় রঙ আর আকৃতি দিয়ে টুকরো টুকরো করে নির্মাণ করতে হবে। পল সেজানে কোনো ভ্রম নাই, কোনো চালাকি নাই।
১৮৯৪ সালে তার কন্যা মার্গারিতের জন্ম। মা ক্যারোলিন ইয়োলো— প্যারিসে দেখা হওয়া এক মডেল। প্রায় কোনো টাকা নেই। বয়স চব্বিশ, ছোট্ট স্টুডিওতে থাকেন, এমন কাজ আঁকেন যা কেউ কিনতে চায় না। আর তিনি একজন বাবা। চার বছর পর তিনি বিয়ে করেন আমেলি পারেরকে— তুলুজের এক নারী, বুদ্ধিমতী ও সংকল্পবদ্ধ, যিনি তাকে বিশ্বাস করেছিলেন যখন বিশ্বাস করার প্রায় কোনো কারণ ছিল না। ১৮৯৮ সালে বিয়ে। তিনি মার্গারিতকে সংসারে নিয়ে আসেন। আমেলি সংসার চালাতেন, টাকা সামলাতেন, মডেল হতেন, সমালোচক ও পরিবারের বিরুদ্ধে তাকে রক্ষা করতেন। তিনি মাতিসের আঁকাআঁকিটাকে সম্ভব করে তুলতেন।
১৮৯৬ সালের গ্রীষ্মে মাতিস ব্র্যতাইনে গেলেন। পরিষ্কার উপকূলীয় আলো তার ভেতরের বহুকাল বন্ধ থাকা কিছু দরজা যেনও খুলে দিল। রঙ আরও উজ্জ্বল, আরও সম্পৃক্ত হয়ে উঠল। বুঝতে শুরু করলেন, রঙ শুধু জিনিসটা বর্ণনা করার উপায় নয়— জিনিসটা অনুভব করার উপায়। সিনিয়াকের রঙ-তত্ত্বের বই পড়লেন। শিখলেন, পরিপূরক রঙ কীভাবে একে অপরকে তীব্র করে— লাল আর সবুজ, নীল আর কমলা পাশাপাশি বসালে এক ধরনের দৃশ্যমান গুঞ্জন তৈরি হয়। তিনি রঙকে তার বর্ণিত বস্তু থেকে স্বাধীন কিছু হিসেবে ভাবতে শুরু করলেন। গাছকে সবুজ হতেই হবে না। মুখকে মাংসের রঙ হতেই হবে না। ছবির যা দরকার, রঙ তা-ই হতে পারে।
১৯০০ সালে তিনি ও আমেলি দক্ষিণ ফ্রান্সে গ্রীষ্ম কাটালেন। ভূমধ্যসাগরের আলো ছিল এক নতুন আবিষ্কার তার জন্য। উত্তরাঞ্চলের নরম, ছড়ানো আলো নয়— এ আলো কঠোর, উজ্জ্বল, প্রায় অন্ধকার করা, এবং যা ছুঁয়েছে সবকিছুকে সমতল করে দেয়। ছায়া তীক্ষ্ণ আর গাঢ়, রঙ যেন জ্বলে উঠছে। মাতিস চারপাশের ল্যান্ডস্কেপ আঁকলেন, আমেলিকে আঁকলেন, এবং প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করতে শুরু করলেন এমনভাবে যা বাস্তববাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। তার মুখ আঁকলেন সবুজ আর বেগুনির সমতলে, পোশাক আঁকলেন কমলা আর লালের প্রশস্ত আঁচড়ে। তিনি আমেলিকে আমেলির মতো দেখাতে চাইছিলেন না। তিনি ছবিটাকে অনুভব করাতে চাইছিলেন— সেই আলোয়, সেই গরমে, সেই বিশেষ মুহূর্তে তাকে দেখতে কেমন লাগে। বয়স ত্রিশ, এক দশক ধরে আঁকছেন, এবং অবশেষে বুঝতে শুরু করেছেন ছবি আঁকা তার কাছে কী হতে পারে।
বন্য পশুরা এবং তাদের আর্তনাদ
১৯০৫ সালে মাতিস প্যারিসের শরৎকালীন শিল্পমেলায় একগুচ্ছ ছবি প্রদর্শন করলেন— আন্দ্রে দেরাঁ, মরিস দ্য ভ্লামিংকের কাজের পাশে। সমালোচকরা হতবাক। তারা ঘরটাকে বললেন বন্য পশুর খাঁচা— লে ফভ— আর নামটা লেগে গেল ছবিটার সাথে। ছবিগুলোকে বলা হলো হিংস্র, অপ্রাকৃতিক, বর্বর। রঙ অতিরিক্ত উজ্জ্বল, অসম্পূর্ণ। এ ছিল সুস্বাদের সুরুচির বিরুদ্ধে এক অপমান। কিন্তু মাতিস পরোয়া করলেন না। তিনি যা খুঁজছিলেন তা পেয়ে গেছেন। তিনি এমন এক আঁকার পথ পেয়েছেন যা পৃথিবীর নকল নয়— পৃথিবীর প্রতি সাড়া দেওয়া; রঙ আর আকৃতিকে জিনিসের চেহারার বদলে তার অনুভূতি বহন করতে দেওয়া।
এই বছরই তিনি আঁকেন ‘লা রে ভের্ত’— ‘সবুজ ডোরা’, অথবা ‘শ্রীমতি মাতিসের প্রতিকৃতি’। একটি নারীর মুখ। তার কপাল, ভুরু আর নাক বরাবর সবুজের একটি প্রশস্ত, নির্লজ্জ আঁচড়। প্রথমে মনে হয়, এ কী কাণ্ড! মুখে সবুজ রেখা! তারপর মনে হয়, এই সবুজ রেখাটাই তো মাতিসের ঘোষণা— রং জিনিসের গায়ে লাগানো প্রলেপ নয়। রং নিজেই একটি ভাষা, নিজেই একটি অনুভূতি। আমাদের চোখ এতদিন শিখেছে আকাশ নীল, ঘাস সবুজ, মুখ গোলাপি। মাতিস সেই পাঠ বাতিল করে দেন। তিনি বলেন, মুখ যদি সবুজ রেখায় প্রকাশ পায়, তবে সেটাই সত্য। শিল্পের সত্য বাস্তবের নকল নয়, অনুভূতির প্রকাশ। এই সবুজ রেখাটি আমি কখনো আসল ক্যানভাসে দেখব না। কিন্তু স্ক্রিনের পিক্সেলের ভেতর দিয়েও সেই সবুজ আমার মনে একটা দরজা খুলে দেয়— যে দরজা দিয়ে ঢুকে আমি বুঝি, সৌন্দর্য মানে নিয়ম মানা নয়, সৌন্দর্য মানে নিয়ম ভাঙার সাহস।
১৯০৫ সালের ওই প্রদর্শনীতে একটা ছবি ছিল ‘উইমেন উইথ আ হ্যাট’। আমেলির প্রতিকৃতি— বসে আছেন, মাথায় বিশাল, জটিল টুপি, ফুল, ফিতে, পালক। মুখ আঁকা সবুজ, হলুদ, গোলাপি আঁচড়ে; পোশাক কমলা আর নীলের কাটায়; পটভূমি অবিন্যস্ত রঙের কোলাহল। বিশৃঙ্খল, আনন্দময়, প্রায় হিংস্র— বাধ্য হতে অস্বীকার করার হিংস্রতা। সমালোচকরা ঘৃণা করলেন। জনতা হাসল। কিন্তু ছবিটা কিনলেন দুই আমেরিকান প্রবাসী— লিও আর গেরট্রুড স্টাইন। সেই কেনাকাটা মাতিসের জীবন বদলে দিল। একটা পা রাখার জায়গা, একজন বিশ্বাসী, একটা ছোট্ট নিশ্চয়তা— কোথাও কেউ বুঝতে পারছে তিনি কী করতে চাইছেন। স্টাইনরা হয়ে গেলেন তার পৃষ্ঠপোষক ও বন্ধু। তাদের রু দ্য ফ্লোরাসের অ্যাপার্টমেন্টেই মাতিস প্রথম দেখা করলেন পাবলো পিকাসোর সঙ্গে— তরুণ স্প্যানিশ চিত্রকর, যার কাজ মাতিসের থেকে যতটা আলাদা হতে পারে ততটাই আলাদা। পিকাসো ছিলেন ড্রাফটসম্যান— আকৃতি, গঠন, মানবমূর্তি ভেঙে ফেলার প্রতি আগ্রহী। মাতিস ছিলেন কালারিস্ট— আলো, পৃষ্ঠ বা টেক্সচার, সুর তৈরি করার প্রতি আগ্রহী। দুজনের বয়স একই, পঁয়ত্রিশ। তারা একে অপরের কাজ দেখতেন মুগ্ধতা আর সন্দেহের মিশ্রণে। পরের পঞ্চাশ বছর তারা এক সংলাপে কাটাবেন— দীর্ঘ কথোপকথন, যা একদিক থেকে বন্ধুত্ব, অন্যদিক থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
ক্যানভাসে ক্যানভাসে নৃত্যমুদ্রা
১৯০৬ সালে তিনি আলজেরিয়ার বিস্করা শহরে গেলেন। উত্তর আফ্রিকার আলো, রঙ, নকশা তাকে অভিভূত করল। টালির কাজ, বস্ত্র, জটিল জ্যামিতিক নকশা যা প্রতিটি পৃষ্ঠ ঢেকে রাখে— দেখলেন। বুঝলেন, সাজসজ্জা শিল্পের নিম্নতর রূপ নয়। এ নিজস্ব এক বুদ্ধিমত্তা, সৌন্দর্য সংগঠিত করার নিজস্ব উপায়। কাপড় আর গালিচা কিনে প্যারিসে ফিরলেন। সেগুলো ছবিতে যোগ করতে শুরু করলেন— এমন জায়গা তৈরি করে যেখানে সবকিছু সমতল, সবকিছু অলংকার, সবকিছু রঙ।
১৯০৯ সালে রুশ বস্ত্র ব্যবসায়ী ও সংগ্রাহক সের্গেই শ্চুকিন মস্কোর নিজের প্রাসাদের সিঁড়ির জন্য দুটি বড় সাজসজ্জার প্যানেল তৈরি করতে বললেন। মাতিস রাজি হলেন। মাসের পর মাস ভাবলেন, স্টাডি করলেন। জানতেন মানবমূর্তি আঁকতে চান, এবং চান তারা গতিময় হোক। গীত, নৃত্য, শরীর একসাথে ছন্দে কীভাবে নড়ে— ভাবলেন। প্রাচীন পৃথিবী, গ্রিক ফুলদানি আর তাদের সরল মূর্তি— কীভাবে অল্প কিছু রেখায় গতিকে ধরা হয়।
১৯১০ সালের মধ্যে তিনি দুটি বিষয়ে স্থির হলেন— নৃত্য আর সংগীত। শুরু করলেন নাচ দিয়ে। ক্যানভাস প্রায় তেরো ফুট চওড়া, আট ফুটের বেশি উঁচু। পাঁচটি নগ্ন মূর্তি, শরীর সমতল মরিচা-লাল, প্রায় টেরাকোটা রঙে, গোল হয়ে হাত ধরে, ছন্দে নড়ছে— যা একসাথে উন্মাদ আর নিয়ন্ত্রিত। শরীর সরলীকৃত প্রায় বিমূর্ততার পর্যায়ে— সব বাঁক আর দীর্ঘায়িত, কোনো বিবরণ নেই, কোনো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নেই। এরা প্রতিকৃতি নয়। এরা গতিময় শরীর। শরীর বিশুদ্ধরূপে নগ্ন। পটভূমি দুই ভাগে বিভক্ত— গভীর প্রাণবন্ত নীল আকাশের জন্য, উজ্জ্বল সম্পৃক্ত সবুজ মাটির জন্য। এটুকুই। কোনো ছায়া নেই, কোনো মডেলিং নেই, গভীরতা বা জায়গার অনুভূতি নেই। নীল আর সবুজ মূর্তির মতোই সমতল, একই তীব্রতায় সামনে চাপ দিচ্ছে— ছবিটা হয়ে উঠছে একক ঐক্যবদ্ধ পৃষ্ঠ, রঙ আর আকৃতির ক্ষেত্র, যেখানে কিছুই পিছিয়ে যায় না, সবকিছু একই দৃশ্যমান তলে থাকে। মূর্তিরা ঘড়ির কাঁটার দিকে নড়ছে, শরীর গতির দিকে ঝুঁকে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ টানা আর টানটান। ডানদিকের একটি মূর্তি পাশের মূর্তির হাত ছেড়ে দিয়েছে, তার হাত মুক্ত হয়ে দোলছে। বৃত্তে ফাটলের মুহূর্ত, ছন্দে বিরতি— যা গোটা কম্পোজিশনকে জীবন্ত, অনিশ্চিত করে তোলে, যেন নাচ যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে বা আরও তীব্র কিছু উৎপাদন করতে পারে। ছবিটি শক্তিতে কম্পিত— এক ধরনের বর্বর আনন্দে। তবু এটি নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত। প্রতিটি রেখা, বাঁক, রঙের ব্লক ঠিক যেখানে দরকার যেনও সেখানে বসানো।
‘নৃত্য’ যখন ১৯১০ সালের শরতে প্যারিসে প্রদর্শিত হলো, মস্কো পাঠানোর আগে, প্রতিক্রিয়াগুলো এলো দ্রুত এবং তার বেশিরভাগ শত্রুতাপূর্ণ। সমালোচকরা এটাকে অপরিশোধিত, আদিম, কুৎসিত বললেন। বললেন অসম্পূর্ণ, মূর্তিগুলো বিস্ময়কর, রঙগুলো চটকদার। তারা বুঝলেন না— এটাই মাতিস করতে চাইছিলেন: প্রথা আর কৌশলের স্তর ছাড়িয়ে এমন কিছুতে পৌঁছানো যা মৌলিক, যা প্রথম আঁকা ছবির মতো মনে হয়, যা সময়ের বাইরে, চেনা সংস্কৃতির বাইরে— বিশুদ্ধ, সরাসরি, নির্লজ্জ। প্রখ্যাত আর্ট ডিলার সের্গেই ইভানোভিচ শ্চুকিন প্যারিসে ছবিটা দেখলেন, দ্বিধা করলেন। তিনি সাজসজ্জামূলক কিছু প্রত্যাশা করেছিলেন, প্রচলিত অর্থে সুন্দর কিছু— ‘নৃত্য’ তার কোনোটাই নয়। এ শক্তিশালী, অস্বস্তিকর, প্রায় বর্বর। তিনি প্যারিস ছাড়লেন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে। কিন্তু শ্চুকিন মস্কো ফিরে ভাবলেন, ছবিটা নিয়ে বাঁচা মানে কী হবে, এবং সিদ্ধান্ত নিলেন— তিনি চান। মাতিসকে খবর পাঠালেন, ‘নৃত্য’ নেবেন, ‘সংগীত’-ও নেবেন।
মাতিস ‘সংগীত’ সম্পূর্ণ করলেন— সঙ্গী ছবি, পাঁচটি মূর্তি সবুজ পাহাড়ে বসে আছে নীল আকাশের নিচে, কেউ বাদ্যযন্ত্র ধরে বা বাজায়, কেউ শুধু শোনে। ‘নৃত্য’-এর চেয়ে শান্ত, বেশি ধ্যানমগ্ন, কিন্তু একই র্যাডিক্যাল সরলতা, একই গভীরতা ও প্রচলিত বিবরণের প্রত্যাখ্যান। দুটি ছবি মস্কো পাঠানো হলো, শ্চুকিনের প্রাসাদের সিঁড়িতে স্থাপিত হলো— বাড়িতে ঢোকা যে কেউ দেখতে পাবে। জায়গাটা রূপান্তরিত হলো। সিঁড়িটা যেন অন্য জগতের প্রবেশদ্বার মনে হতে লাগল— রঙ, ছন্দ, বিশুদ্ধ অনুভূতির জগৎ।
কিন্তু ‘নৃত্য’ আর ‘সংগীত’ তৈরি সহজ ছিল না। মাতিস এমন উগ্রতায় কাজ করেছিলেন যা তাকে ক্লান্ত করে দিয়েছিল। কোন অংশ পুনরায় আঁকছেন, পৃষ্ঠ ঘষে তুলে ফেলছেন, নতুন করে শুরু করছেন। ছবিগুলো যে সহজতা আর আনন্দ প্রকাশ করে তা ছিল নিষ্পেষণকারী, আচ্ছন্ন পরিশ্রমের ফল— এটাই মাতিসের জীবনের কেন্দ্রীয় প্যারাডক্স। তিনি ছিলেন আনন্দের, আলোর, খোলা জানালার চিত্রকর। আর তিনি এ অর্জন করেছেন প্রায় যে কারও চেয়ে বেশি পরিশ্রম করে। যে কয়টি ক্যানভাস রেখেছেন, তার চেয়ে বেশি ধ্বংস করেছেন। আমেলি এটা বুঝতেন। তিনি তাদের জীবন মাতিসের কাজের চারপাশে সাজিয়েছিলেন— ঘণ্টার পর ঘণ্টা মডেল হয়েছেন, টাকা আর সংসার সামলেছেন, সন্তানদের মানুষ করেছেন যাতে মাতিস নিবিষ্টভাবে আঁকতে পারেন।
নিস্-এর জানালা
‘নৃত্য’ আর ‘সংগীত’-এর পর মাতিস আর বহিরাগত নন। তিনি স্বীকৃত, সংগৃহীতও ততদিনে। কিন্তু স্বীকৃতি কাজ সহজ করে না। যদি কিছু হয়, কঠিন করে। তার কাছ থেকে প্রত্যাশা— উৎপাদন করতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখতে হবে, মানুষকে অবাক করতে হবে।
১৯১৭ সালে তিনি পরিবার নিয়ে দক্ষিণ ফ্রান্সের নিস্ শহরে চলে গেলেন— দৃশ্যত প্যারিসের ঠান্ডা শীত এড়াতে, আসলে কারণ, তার আলো দরকার ছিল। সমুদ্রের দিকে মুখ করা হোটেলের অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিলেন। মাতিস স্টুডিও বানালেন, ঘরের অন্তর্বাস আঁকতে শুরু করলেন— জানালা, আলো ঢুকে পড়ছে, বাইরের পৃথিবী নীল আর সবুজের প্যাঁচে নামানো। এখন সঙ্গতি হয়েছে শিল্পী হিসেবে, মডেল ভাড়া করলেন— তরুণীরা স্টুডিওতে আসতেন, পোশাক ছেড়ে দিয়ে পোজ দিতেন শিল্পীর চাওয়া মতোন। তাদের আঁকলেন— শুয়ে থাকা মূর্তি, হারেম প্যান্ট, পাগড়ি, নকশাদার বস্ত্র আর সাজসজ্জার জিনিসে ঘেরা। ছবিগুলো সমালোচিত হলো পলায়নপর বলে, স্টুডিওর বাইরের পৃথিবীর দুঃখ উপেক্ষা করার জন্যই বুঝি শিল্পী এসব আঁকছেন, মত দিলেন শিল্পসমালোচকরা। ইউরোপ তখনো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত থেকে সেরে উঠেনি, আর মাতিস আঁকছেন বিলাসে ঘেরা নারীদের ডিভানে শুইয়ে। কারও কাছে মনে হলো এ পশ্চাৎপসরণ। কিন্তু মাতিস তা মনে করলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, সৌন্দর্য সৃষ্টি, এমন জায়গা সৃষ্টি যেখানে চোখ বিশ্রাম পায়, মন শান্তি পায়— তা নিজেই গুরুতর কাজের একটা রূপ। তিনি বলেছিলেন, তার ছবি একটা আরাম কেদারার মতো হওয়া উচিত— যেখানে ক্লান্ত মানুষ বসে থেকে সেরে উঠতে পারে। তিনি অবমাননার অর্থে বলেননি। বলতে চেয়েছিলেন, পৃথিবী শব্দ, বিশৃঙ্খলা, দুঃখে ভরা, এবং আঁকা ছবি অন্য কিছু দিতে পারে— কিছু প্রয়োজনীয়, শান্তির একটা মুহূর্ত।
তিনি তখন পিকাসোর সাথে সংলাপ চালাচ্ছেন— যদিও খুব কম দেখা করেন। পিকাসো প্যারিসে, নিজের বিভিন্ন পর্যায় পার করছেন— নীল, গোলাপি, কিউবিস্ট, নিওক্লাসিক্যাল— প্রতি কয়েক বছরে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন, অস্থির, উৎপাদনশীল, সবসময় ধ্বংস আর পুনর্নির্মাণ করছেন। মাতিস নিস্-এই থাকলেন— আরও ধীরে, আরও যত্নে কাজ করছেন, নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিমার্জন করছেন, বিপ্লব ঘটাচ্ছেন না। সমালোচকরা দুজনকে বিপরীত হিসেবে দেখালেন। পিকাসো— র্যাডিক্যাল, ধ্বংসকারী। মাতিস— রক্ষণশীল, সাজসজ্জাকারী। কিন্তু মাতিস নিজেকে তা মনে করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন তার কাজ পিকাসোর মতোই র্যাডিক্যাল— শুধু দিকটা ভিন্ন। পিকাসো জিনিস ভাঙেন। মাতিস জিনিস জোড়া দেন। দুটোই দরকার।
১৯৩০ সালে ফিলাডেলফিয়ার বার্নস ফাউন্ডেশন মাতিসকে তাদের নতুন ভবনের মূল গ্যালারির জন্য একটা ম্যুরাল তৈরি করতে বললো। ম্যুরালটা তিনটি খিলান জানালার উপরে বসানো হবে— চল্লিশ ফুটের বেশি চওড়া, বারো ফুট উঁচু। নতুন কাজের নাম দিলেন ‘দ্য ডান্স’— একই নাম, কিন্তু এবার মূর্তিগুলো আরও সরল, আরও বিমূর্ত। এবার গোলাপি, নীল, ধূসর আভায়। ম্যুরালে তিন বছর কাজ করলেন। স্টুডিওতে পূর্ণ মাপের মকআপ বানালেন— দেয়ালে কাগজ পিন করে, মইয়ে দাঁড়িয়ে লম্বা লাঠির ডগায় কাঠকয়লা দিয়ে মূর্তি আঁকলেন দূর থেকে। ম্যুরাল যখন অবশেষে বসানো হলো, সমস্যা দেখা দিল। মাতিসকে ভুল মাপ দেওয়া হয়েছিল। ম্যুরাল ফিট করল না। তাকে নতুন করে শুরু করতে হলো। গোটা জিনিস পুনরায় আঁকতে হলো, সঠিক মাপে কম্পোজিশন সমন্বয় করে এবং তিনি তা করলেন কোনো অভিযোগ ছাড়া, কোনো বিরক্তিপ্রকাশের নাটক ছাড়া। শুধু আবার শুরু করলেন। আরও এক বছর লাগলো। দ্বিতীয় সংস্করণ সম্পূর্ণ হওয়ার সময় তিনি একটা প্রকল্পে চার বছর কাটিয়েছেন, ক্লান্ত— কিন্তু ম্যুরালটা সুন্দর। এটি তার শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর একটি।
কাগজের নৃত্য
নিস্-এ ফিরে তিনি অন্তর্বাস, মডেল, জানালা আঁকা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু শরীর তাকে পরাজিত করতে শুরু করেছে। ক্যান্সার ধরা পড়েছে, অপারেশন হয়েছে, অপারেশনের পর তিনি দুর্বল, ব্যথায়, প্রায়ই হুইলচেয়ার বা বিছানায় আবদ্ধ। বয়স সত্তরের ঘরে, শরীর বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তবু কাজ বন্ধ করতে পারেন না।
১৯৪১ সালে আগের মতো আঁকতে অক্ষম হয়ে মাতিস নতুন কৌশল নিয়ে পরীক্ষা শুরু করলেন। তিনি একে বললেন ‘কাঁচি দিয়ে আঁকা’। সহকারীরা বড় কাগজের শিটে এক রঙে রঙ করতেন— উজ্জ্বল নীল, সবুজ, হলুদ, লাল, কমলা, গোলাপি। তিনি বিছানায় বা হুইলচেয়ারে বসে কাঁচি নিয়ে কাগজ থেকে আকৃতি কাটতেন— জৈব, প্রবাহমান আকৃতি, পাতা, পাখি, তারা, শরীর। সাদা পটভূমিতে সাজাতেন, পিন দিয়ে আটকাতেন, এদিক-ওদিক সরাতেন, অবস্থান সমন্বয় করতেন যতক্ষণ ঠিক না লাগে। তারপর সহকারীরা আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিতেন। কাটআউটগুলো— যেমন নাম হলো— আগে করা কিছুর মতো নয়। এরা ছবি নয়, আঁকা নয়, প্রচলিত অর্থে কোলাজও নয়। এ নতুন কিছু— মাধ্যমের মধ্যে থাকা এক রূপ, যা রঙ আর আকৃতি বিশুদ্ধতম রূপে ব্যবহার করে, তুলি বা পেন্সিলের মধ্যস্থতা ছাড়াই। আকৃতিগুলো সরল, সাহসী, আনন্দময়, এবং সাদা পটভূমিতে এমন স্বাধীনতায় নড়ে যা প্রায় শিশুসুলভ— যেন মাতিস শুরুতে ফিরে গেছেন, সুন্দর কিছু বানানোর প্রথম প্রবণতায়। ‘জ্যাজ’ নামে সিরিজ বানালেন— বিশটি প্রিন্টের পোর্টফোলিও, তার কাটআউটের উপর ভিত্তি করে, নিজের হাতে লেখা টেক্সটসহ। ছবিগুলো উচ্ছ্বসিত, প্রায় বেপরোয়া— অ্যাক্রোব্যাট, নর্তক, সাঁতারু, বিমূর্ত আকৃতি যা জীবনে স্পন্দিত হয়। রঙ সম্পৃক্ত, বিদ্যুতের মতো, উপেক্ষা করা অসম্ভব। সিরিজ প্রকাশিত হলো ১৯৪৭ সালে, এবং বিশ্বকে জানিয়ে দিল— মাতিস, এখন সত্তরের শেষে, বিছানায় আবদ্ধ, ব্যথায়, তখনো এমন কাজ বানাচ্ছেন যা তরুণ শিল্পীদের প্রায় সবকিছুর চেয়ে বেশি জীবন্ত মনে হয়। যে সমালোচকরা তাকে সাজসজ্জাকার, পলায়নপর ফ্যান্টাসির চিত্রকর বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাদের পুনর্বিবেচনা করতে হলো। কাটআউটগুলো র্যাডিক্যাল। শিল্পকর্ম কী হতে পারে তার সম্পূর্ণ পূনর্বিচার। এরা ভ্রম, গভীরতা, আখ্যান নিয়ে নয়। এরা রঙ, আকৃতি, জায়গায় রূপ সাজানোর বিশুদ্ধ আনন্দ নিয়ে। এরা সৃষ্টিকর্ম নিয়ে— প্রতিবাদ হিসেবে, জোর দিয়ে বলা যে সৌন্দর্য তখনো তৈরি করা যায়, যুদ্ধে ছিন্নভিন্ন পৃথিবীতেও, ব্যর্থ শরীরেও।
‘দ্য সুইমিং পুল’ নামে সিরিজ বানালেন— নীল মূর্তি সাদা জায়গার ভেতর দিয়ে সাঁতরাচ্ছে, মাত্র কয়েকটা কাট, কয়েকটা বাঁক দিয়ে আঁকা, কিন্তু জলের ভেতর দিয়ে শরীরের গতি ধরেছে এমন নির্ভুলতা ও কৃপায় যা অলৌকিক মনে হয়। ‘সোরা অফ দ্য কিং’ বানালেন— লাল, হলুদ, সবুজ, কালোতে বিমূর্ত মূর্তির বড় কম্পোজিশন, নকশার ছদ্মবেশে শেষ জীবনের আত্মপ্রতিকৃতি, বয়স ও স্মৃতি নিয়ে ধ্যান। ‘দ্য স্নেইল’ বানালেন— রঙিন বর্গক্ষেত্রের সর্পিল বিন্যাস যা শামুকের রূপের ইঙ্গিত দেয় কিন্তু চিত্রিত করে না, বিশুদ্ধ বিমূর্ততার কাজ যা তখনো জীবন্ত মনে হয়। যে ঘরে কাজ করতেন তা কাটআউটে ঢাকা ছিল— দেয়ালে পিন করা, উপর্যুপরি জমা হওয়া, এমন জায়গা যা সম্পূর্ণ পরিবেশ হয়ে উঠেছে, সম্পূর্ণ রঙ আর আকৃতিতে গড়া পৃথিবী। যারা দেখতে আসতেন অভিভূত হতেন। বলতেন মনে হচ্ছে তার কোনো ছবির ভেতরে পা রাখছেন, এমন জায়গায় ঢুকছেন যেখানে দেখার স্বাভাবিক নিয়ম আর খাটে না, যেখানে সবকিছু উজ্জ্বল, আরও প্রাণবন্ত, আরও তীব্র। মাতিস সেই সবকিছুর মাঝখানে বসে— হুইলচেয়ারে বৃদ্ধ এক মানুষ, হাতে এক জোড়া কাঁচি, তখনো কাজ করছেন, তখনো ঠিক করার চেষ্টা করছেন। জানতেন কাটআউট অন্য কেউ যা বানাচ্ছে তার মতো নয়, এ নতুন ভাষা, রঙ, আকৃতি, জায়গা নিয়ে ভাবার নতুন উপায়। জানতেন এরা তাকে ছাড়িয়ে যাবে, তিনি নীরব হওয়ার অনেক পরে কথা বলতে থাকবে। এবং তারা করেছে।
মাতিসের শেষ ও শ্রেষ্ঠ প্রকল্পগুলোর একটি— ভেন্স শহরের শাপেল দ্যু রোজেয়ার। একজন ডোমিনিকান সন্ন্যাসী, যিনি একসময় তার নার্স ছিলেন, তাকে তার কনভেন্ট এর জন্য একটা গির্জা ডিজাইন করতে সাহায্য করতে বললেন। মাতিস— যিনি ধার্মিক ছিলেন না, কখনো কোনো বিশ্বাস স্বীকার করেননি— রাজি হলেন। চার বছর এই প্রকল্পে কাটালেন— প্রতিটি উপাদান ডিজাইন করলেন: রঙিন কাঁচের জানালা, টালির ম্যুরাল, পোষাক, বেদী, ক্রুশ। তিনি চাইছিলেন গির্জাটা একটা সম্পূর্ণ শিল্পকর্ম হোক— এমন জায়গা যেখানে সবকিছু একই সুরে আছে, যেখানে আলো, রঙ, আকৃতি একসাথে এসে শান্তির অনুভূতি তৈরি করে— এমনকি যারা বিশ্বাস করে না তাদের জন্যও; অত্যুর্ধতা যাকে বলে। জানালাগুলো নীল, সবুজ, হলুদে কাটআউট আকৃতির, এবং তাদের ভেতর দিয়ে আসা আলো সাদা অন্তর্দেশকে পরিবর্তনশীল দীপ্তিময় আভায় স্নাত করে। ম্যুরালগুলো সাদা টালিতে সরল কালো রেখার আঁকা— কুমারী ও শিশু— শেষ জীবনের কাটআউটের মতোই মিতব্যয়িতা ও কৃপায় ফুটিয়ে তোলা। গির্জা পবিত্র হয় ১৯৫১ সালে, এবং মাতিস বললেন এটি তার জীবনের কাজের চূড়ান্ত পরিণতি— যেখানে রঙ, রেখা, জায়গা সম্পর্কে শেখা সবকিছু একসাথে এসেছে। গির্জা সম্পূর্ণ হওয়ার সময় তার বয়স একাশি, এবং তিনি মরণাপন্ন। বেশির ভাগ সময় বিছানায় কাটান সহকারীদের ঘিরে—তখনো কাজ করছেন, তখনো কাগজ থেকে আকৃতি কাটছেন। কাজ করেছেন যতক্ষণ কাজ করতে পেরেছেন— যতক্ষণ হাত কাঁচি ধরতে পেরেছে।
থেকে যায় শুধু সুন্দর, থেকে যায় অশ্রুত সুর
১৯৫৪ সালের ৩ নভেম্বর মাতিস মৃত্যুবরণ করেন। বয়স চুরাশি। ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন, এবং সেই সময়ে রূপান্তরিত করেছেন ছবি আঁকা কী হতে পারে, রঙ কী করতে পারে, সরলতা কী প্রকাশ করতে পারে। তিনি শুরু করেছিলেন একজন আইনের পেশাজীবী হিসেবে, যিনি দুর্ঘটনাক্রমে ছবি আঁকায় ঢুকে পড়েছিলেন; আর হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক শিল্পের ভিত্তিস্থাপক ব্যক্তিত্বদের একজন। কিন্তু সত্য আসলেই জটিল। তিনি গোটা জীবন খুঁজেছেন, সংগ্রাম করেছেন, ব্যর্থ হয়েছেন, নতুন করে শুরু করেছেন। তার ছবির সহজতা আর আনন্দ স্বাভাবিক নয়— অর্জিত হয়েছে নিরলস পরিশ্রমে, প্রায় শাস্তিপ্রদানমূলক শৃঙ্খলায়। যে কাজ রেখেছেন তার চেয়ে বেশি ধ্বংস করেছেন। কখনো সন্তুষ্ট নন, কখনো নিশ্চিত নন। এমন কিছু বানানোর তাড়নায় চালিত যা সত্য মনে হয়, যা প্রয়োজনীয় মনে হয়— এবং সেই তাড়না কখনো তাকে ছাড়েনি, শেষ পর্যন্তও না।
মাতিসের সমকালীন শিল্পীরা মাতিসকে কী বলতেন!
মাতিস সম্পর্কে সবচেয়ে বিখ্যাত মন্তব্যটি পিকাসোর। কম বয়সে পিকাসো ছিলেন মাতিসের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী— পিকাসো আগ্রাসী, অহংকারী; মাতিস শান্ত, অন্তর্মুখী। কিন্তু পিকাসো একবার বলে উঠেছিলেন— ‘আসলে মাতিস ছাড়া আর কিছুই নাই’। আবার পিকাসোই মাতিসকে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, ‘মাতিস একটা রুমাল— একটা রঙিন টাই’। এই দুটো উক্তি একসাথে রাখলে পিকাসোর মনোভাব বোঝা যায়— তিনি মাতিসকে হালকা ভাবতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানতেন মাতিসকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মাতিসও পিকাসো সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শুধু পিকাসোই নিজেকে সবকিছুর জন্য রাজী করাতে পারেন। তিনি সবকিছু গুলিয়ে দিতে পারেন, বিকৃত করতে পারেন, টুকরো টুকরো করতে পারেন। তিনি সর্বদা, চিরকাল ঠিক থাকেন’। মাতিস মারা গেলে পিকাসো বিধ্বস্ত হলেন। বললেন, তিনি আর মাতিস বিবাহিত ছিলেন— একটা জীবন একসাথে কাটিয়েছেন (যদিও বেশির ভাগ সময় আলাদা থেকেছেন দুই শিল্পী, একে অপরের পেছনে লেগেও ছিলেন বলে বলেন কোন কোন সমালোচক)।
কিন্তু সবচেয়ে স্পষ্ট স্বীকৃতি এসেছে হুয়ান মিরোর কাছ থেকে। এক রাতের খাবারে মিরো বলেছিলেন— ‘আমরা তরুণ চিত্রশিল্পীরা দেখলাম, মাতিস অনেক অনেক দিক থেকে আমাদের থেকে এগিয়ে আছেন’। ক্লিমেন্ট গ্রিনবার্গ ১৯৪৭ সালে ‘দ্য নেশন’-এ লিখেছিলেন, মাতিসের ‘শীতল হেডোনিজম এবং নির্দয়ভাবে সবকিছু বাদ দেওয়া, শুধু তাৎক্ষণিক অনুভূতিটুকু রাখা’— এই দুটোই ভবিষ্যতে প্রথমার্ধের বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গভীর মেজাজ হিসেবে বোঝা যাবে’। গ্রিনবার্গ ‘হেডোনিজম’ শব্দটা অবমাননার অর্থে ব্যবহার করলেও তার স্বীকৃতিটা পরিষ্কার— মাতিসের সরলতা সহজ সরলতা নয়, সেটা এক ধরনের কঠোর নির্বাচন। আর কান্দিনস্কি আধুনিক চিত্রকলাকে দুটি পথে ভাগ করেছিলেন— একটি মাতিসের রঙে, অন্যটি পিকাসোর রেখায়। গন্তব্য একই; শিল্পের চরম রূপ। এই ভাগটা আসলে মাতিসের গুরুত্বের স্বীকৃতি— তাকে ছাড়া বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের চিত্রকলার মানচিত্রই অসম্পূর্ণ।
বিশ্বচিত্রকলার ইতিহাসে মাতিস কেন গুরুত্বপূর্ণ
মাতিসকে শুধুমাত্র ‘সুন্দর ছবির আঁকিয়ে’ বলে ভাবার কোনো কারণ নেই। আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগোর ভাষায়, মাতিস বিংশ শতাব্দীর শিল্পের একজন পথপ্রদর্শক, যিনি রং ও আকৃতিকে গঠনগত, প্রায় ভাস্কর্যসদৃশ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে আধুনিক চিত্রকলা, রেখাচিত্র ও ভাস্কর্যের দৃশ্যভাষাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন। মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টের মূল্যায়নে, তার শৈলীগত উদ্ভাবন— পিকাসোর উদ্ভাবনের সঙ্গে একসাথে— আধুনিক শিল্পের গতিপথ মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের বহু চিত্রশিল্পীকে প্রভাবিত করেছে।
এই গুরুত্বের প্রথম কারণ হলো, মাতিস রঙকে বর্ণনার হাতিয়ার থেকে সৃজনের হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। তার আগে ইউরোপীয় চিত্রকলায় রং ছিল বস্তুর গায়ে লাগানো উপাদান— আকাশ নীল, ঘাস সবুজ। মাতিস দেখালেন, রং নিজেই একটি স্বাধীন ভাষা। ‘লা রে ভের্ত’-এর সবুজ রেখা মুখের বর্ণনা দেয় না, মুখের অনুভূতি দেয়। এই সিদ্ধান্তটাই বিংশ শতাব্দীর চিত্রকলার ভিত্তি বদলে দেয়া। দ্বিতীয় কারণ, তিনি আকৃতিকে সরল করেছেন, কিন্তু সরলতাকে দুর্বলতা বানাননি। ‘লা দঁস’-এর পাঁচটি শরীর, ‘ব্লু নুড’-এর নীল টুকরো, ‘ইকারাস’-এর কালো মানুষ— সবই চরম সরল, কিন্তু প্রতিটির ভেতরে একটা গতিশীল টান আছে। তৃতীয় কারণ, তিনি চিত্রকলার সীমানা ভেঙেছেন। তেলরঙ, ভাস্কর্য, ছাপচিত্র, কাগজ-কাটা— সব মাধ্যমেই তিনি একই সমস্যার উত্তর খুঁজেছেন। ‘জ্যাজ’ বইটা তার প্রমাণ: একটি বই, যেখানে লেখা আর ছবি আলাদা নয়, দুটোই একই ছন্দের অংশ। চতুর্থ কারণ, তিনি ‘শিল্প কী জন্য’— এই প্রশ্নের একটা উত্তর দিয়েছেন যেটা বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইউরোপে বিরল ছিল। তিনি রাজনৈতিক শিল্পকর্ম আঁকেননি বা করেননি, কিন্তু তার শিল্প নিজেই এক রাজনৈতিক অবস্থান: মানুষের জন্য বিশ্রাম, আনন্দ, সৌন্দর্য— এই দাবিটুকু যুদ্ধের বাজারে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
এই কারণগুলো একসাথে করলে মাতিসের স্থানটা স্পষ্ট হয়: তিনি পিকাসোর সাথে বিংশ শতাব্দীর চিত্রকলার দুটি স্তম্ভের একটি। পিকাসো বিশ্লেষণ করেছিলেন, ভেঙেছিলেন, পুনর্গঠন করেছিলেন। মাতিস সরল করেছিলেন, নির্বাচন করেছিলেন, একীভূত করেছিলেন। পিকাসোর রেখা প্রশ্ন তোলে, মাতিসের রঙ উত্তর দেয়। দুজনকে ছাড়া আধুনিক শিল্পের প্রথমার্ধ কল্পনা করা যায় না— এটা কোনো অতিরঞ্জন নয়, এটাই হয়তো শিল্প-ইতিহাসের স্বীকৃত মানচিত্র।
যবণিকা
আমি মাতিসের আসল ছবি দেখিনি। কিন্তু ইন্টারনেটের পর্দায় ‘লা দঁস’ ভেসে উঠলে, ‘দ্য রেড স্টুডিও’-র লাল চোখে লাগলে, ‘ইকারাস’-এর কালো মানুষটা যখন নীল আকাশে উড়তে থাকে, তখন মনে হয়— আমি একটা কিছু দেখছি যা শুধু চোখের জন্য নয়। মাতিস রঙকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন যেখানে রং আর অনুভূতির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। সেটাই তার সবচেয়ে বড় কীর্তি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সৌন্দর্য মানে নিয়ম মানা নয়; সৌন্দর্য মানে দেখার সাহস রাখা।
মানবসভ্যতা কতদিন থাকবে আমরা কেউই জানি না। কিন্তু সভ্যজীবনে সৌন্দর্য-সচেতন মানুষ যতদিন থাকবে, অঁরি মাতিসকে কেউ সরিয়ে রাখতে বা মুছে ফেলতে পারবে না। আমি তার সমাধীতে ফুল দিতে পারিনি, তার জাদুঘরে ঢুকতে পারিনি। কিন্তু আমার ল্যাপটপের স্ক্রিনে যখন তার ‘লা দঁস’ ভেসে ওঠে, তখন মনে হয়— আমিও সেই নাচে সামিল। রং আমাকে ডাকে, সৌন্দর্য আমাকে ডাকে। মাতিস বলছেন, ‘দেখো, কী সুন্দর’ আমি চোখ মেলে তাকাই। স্ক্রিনের আলোয়, পিক্সেলের ভেতর, একটা অস্পষ্ট ছবিতে— মাতিস। কী দারুণ সুন্দর!





















