রাত ৮টা থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডারে ২২৩ টাকা বেশি
- প্রতি কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৭১.৬৮ টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রান্নার গ্যাসের খরচ সামলাতে গত মাসেও বাড়তি ২৫২ টাকা গুনতে হয়েছে ভোক্তাদের। অক্টোবরে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। নভেম্বর মাসে সেই সিলিন্ডার কিনতে খরচ করতে হবে আরও ২২৩ টাকা বেশি। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়াল ২ হাজার ৬০ টাকা। এতে প্রতি কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের দাম হয়েছে ১৭১.৬৮ টাকা।
আজ সোমবার নতুন এই দর ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), যা কার্যকর হচ্ছে আজ রাত ৮টা থেকে।
একই হারে বেড়েছে সাড়ে ৫ কেজি থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন ওজনের সিলিন্ডারের দাম। বাদ পড়েনি যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসও। প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বেড়ে ঠিক করা হয়েছে ৯১ টাকা ৯৫ পয়সা। অক্টোবরে ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে অটোগ্যাসের দাম ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন একই থাকলেও এবার সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে। সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ঠিক করা হয়েছে ১ হাজার ৮৬০ টাকা। তবে এই গ্যাসের সরবরাহ এতই কম যে তা সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের বাইরেই থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দাম বেড়েছিল এলপিজির। যুদ্ধবিরতি শুরু হলে বিশ্ববাজারে দাম কমতে শুরু করে। যদিও কয়েক মাস ধরে দাম ওঠানামার মধ্যে আছে। আবার, দেশের বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে কখনই এলপিজি বিক্রি হয় না। নতুন এই মূল্যবৃদ্ধির আগেই ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন খুচরা বিক্রেতারা। এখন সেই দাম আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এলপিজি আমদানিকারকরা বলছেন, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই এলপিজি বিক্রি করছেন। কিন্তু পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষের কাছে ইচ্ছেমত দাম আদায় করছে।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আয়োজিত গণশুনানিতে বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এলপিজি এবং অটোগ্যাস বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা। সেখানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারে বর্তমান কমিশন ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা দাবি করে। তবে সবচেয়ে কম ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দেয় মেঘনা গ্রুপ।
দেশের বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে কখনই এলপিজি বিক্রি হয় না। নতুন এ মূল্যবৃদ্ধির আগেই ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা
অন্যদিকে পরিবেশকরা ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার আবেদন করেন। এ ছাড়া পরিবহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের প্রতি লিটারের কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়।
পরবর্তী সময়ে বিইআরসির কারিগরি কমিটি আমদানিকারদের কমিশন ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২৮০ টাকা, ডিলারদের ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার পক্ষে মত দেয়।
কমিশন বৃদ্ধির স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে গণশুনানিতে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগে এলপিজি আমদানিতে জাহাজভাড়াসহ প্রিমিয়াম ছিল প্রতি টনে ৮০-১২০ ডলার। এখন তা ২৫০-৪০০ ডলারে ঠেকেছে। পরিচালন খরচ বেড়েছে। সব বিবেচনায় নিয়ে এমন দাম ঠিক করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকা বেশি বাজারে কেউ নিতে না পারে।’
তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের এলপিজির বাজার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে এ খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বড় জাহাজে আসে কুতুবদিয়া, সেখান থেকে লাইটারেজ ও সড়ক ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেই খরচ যোগ করা হয়নি বিগত ২০২১ সালের গণশুনানিতে।’
এলপিজি ব্যবসায় নানা জটিলতার কথা উল্লেখ করে অপারেটররা জানান, এ ব্যবসা করতে ৩১টি লাইসেন্স নিতে হয়। ঘাটে ঘাটে দিতে হয় টাকা, শুধু ফি দিতে হয় ৩ কোটি টাকার মতো।
আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে মিল রেখে প্রতি মাসে এলপিজির মূল্য ঠিক করছে বিইআরসি। ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথমবার যখন এই মূল্য ঠিক করা হয় তখন সিলিন্ডারপ্রতি দাম ছিল ৯৭৫ টাকা। সেই দাম এখন হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। এই সময়ে কখনো দাম বেড়েছে, কখনো কমেছে আবার অপরিবর্তিত থেকেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১২ কেজি এলপিজির দাম ঠিক করা হয় ১ হাজার ২৫৩ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৫৬ টাকা, ভ্যাট কমানোয় ১৫ টাকা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৪১ টাকা, মার্চে কোনো পরিবর্তন হয়নি, তারপর এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ে, প্রথমে ৩৮৭ ও পরে ২১২ টাকা, আর তাতেই সিলিন্ডারের দাম ওঠে ১ হাজার ৯৪০ টাকায়। এরপর কিছুটা স্বস্তি আসে, জুনে ৫৫ টাকা ও জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়, আগস্টে আবার ৭০ টাকা বাড়িয়ে দাম করা হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা, সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা করার পর অক্টোবরে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়।
এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান (ইনভয়েস) মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে বিইআরসি।



