ত্রিমাত্রিক
সবার আগে দরকার...

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, চিৎকার করে জানাতে চাই, মৃত্যুর আগপর্যন্ত স্মরণ করাতে চাই— সবার আগে দরকার, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। স্লোগানে স্লোগানে বাতাস ভারী করতে চাই— চাই, চাই সংস্কার, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। এটি না হলে ১০০ বছর পিছিয়ে থাকা, এই জাতি আরও পিছিয়ে যাবে, আফ্রিকার আলো না দেখা মানুষরা আমাদের শাসন করবে একদিন।
এবার কিছু প্রশ্ন—
প্রশ্ন-১: স্কুলে গরু, পাট, নৌকা ভ্রমণ কিংবা তোমার জীবনের লক্ষ্য রচনা মুখস্থ করে কী সফলতা লাভ করেছি আমরা। স্রেফ পাস করেছি। আর যারা ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’ রচনা খাতায় যা লিখেছি, তাদের অন্তত ৯৯ জনের লক্ষ্যই বদলে গেছে পরবর্তী জীবনে।
প্রশ্ন-২: দি কাউ, ডিসিপ্লিন, ইউর ফেভারিট হবি নামে ইংরেজি রচনা মাথায় ঢুকিয়ে ইংরেজিতে কয়টা বাক্য লিখতে পারি বা বলতে পারি আমরা এখন? সদ্য প্রকাশ হওয়া এইচএসসির রেজাল্টও তাই বলে অকৃতকার্যদের অধিকাংশ অকৃতকার্য হয়েছে ইংরেজিতে!
প্রশ্ন-৩: বাঁশে তেল মাখানো বানরের অঙ্ক এখনো শেখানো হয় আমাদের; কিংবা সুদের অঙ্ক। ক্যালকুলেটর এসে অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছে এসব জটিলতার। এই এআইয়ের যুগেও ওসব অঙ্ক শেখানোর প্রয়োজন আছে, শিখতে হবে আমাদের?
প্রশ্ন-৪: গত দুই যুগে যারা শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন, তারা কতটুকু দায়িত্ববান ছিলেন? তারা কতটুকু আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতেন? তাদের কতজনের ছেলেমেয়েরা পড়ত এ দেশে?
দৃশ্যমান অথচ অদৃশ্যে থাকা কি এক চক্র আমাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, সংশয় আর দুশ্চিন্তায় কেটে যাচ্ছে এই কোমলমতিদের প্রথম জীবন! অনাগত জীবন তো বাকি রয়েই গেল।
বুদ্ধিতে কিলবিল করা কোনো বুদ্ধিজীবীর বাণী কিংবা কোনো লেখা দেখা গেল না স্পষ্টভাবে, জোরালো কোনো আওয়াজ উঠল না সারা দেশে, কোনো দৈনিক পত্রিকা কোনো গোলটেবিলের বন্দোবস্ত করল না একদিন কিংবা ধারাবাহিক খবর প্রকাশ হলো না এই অপতৎপরতা নিয়ে!
মূর্খ হয়ে জন্মেছি আমরা, মূর্খ হয়েই মারা যাচ্ছি!
দুই
পার্থক্য মূলত একটাই— একজন গার্মেন্টস মালিকের জীবন আর একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের জীবন। স্পষ্ট ব্যবধান, আকাশ-পাতাল তফাত।
এ দুটোর মাঝে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য এক শত্রু, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে— দেশের গার্মেন্টস ব্যবসাকে বিনাশ করা।
অথচ দুপক্ষই জানে ব্যাপারটা; কিন্তু গায়ে মাখে না, থোড়াই কেয়ার করে।
প্রতি বছরই এরকম হচ্ছে। চোখে প্রবল ধরা পড়ে— বৈষম্য। আমরা তো জানি— শ্রমিক শোষণ, বিভাজন আর জীবনযাত্রার মানের প্রভেদ সেই আদিকাল থেকেই ঘটে আসছে। তাই বলে এই চরম আধুনিক যুগেও! ন্যূনতম বেঁচে থাকার দাবি যে কেউ করতে পারে। সরকার কি একটা ঘোষণা করল, যা পাবে একশ্রেণি; কিন্তু ভোগান্তিতে পড়ল সব শ্রেণি। আয় আর ব্যয়ের ফারাকটা যে যোজন যোজন, বেড়ে গেল আরও। সংসার চলে না, অমানবিকতা প্রতিদিন, শাসন আর শোষণের ধারাবাহিক মঞ্চায়ন— আর কতদিন? ভুপেন হাজারিকা সেই কবেই বলে গেছেন— মানুষ মানুষকে পণ্য করে, মানুষ মানুষকে জীবিকা করে...!
অভিশাপ বলে একটা শব্দ আছে, যা মানুষকে পোড়ায়— প্রতিদিন, প্রতি জীবন। পোড়াচ্ছে আমাদেরও!
তিন
খবর আর খবরদারির চাপে পুলিশ— কী চমৎকার ও অর্থবহ একটা বাক্য, আগামীর সময়ের লিড নিউজ। আগামীর সময়ের সম্পাদক সাহেব যদি মনে করেন— আগামী এক মাস এরকম গরম খবর নিয়ে আগামীর সময় সাজাবেন তিনি; সম্ভব, খুবই সম্ভব।
পুুলিশকে দলীয়করণ, ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত অবৈধ কাজে ব্যবহার, নিজের পাহারাদার হিসেবে গোপন নিয়োগ, দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের চেয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখা— আরও অনেক অনেক।
এতে কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন বড় রাজনীতিবিদ; কেউ হয়ে ওঠেন বিশাল কর্মকাণ্ডের নীতিনির্ধারক; ক্ষমতাবান হয়ে যান মন্ত্রী-এমপিদের চেয়ে বেশি; সাধারণ মানুষ তো বটেই, রাজনীতিবিদরাও ভয় পান যত্রতত্র; বাগানবাড়ি-সম্পদ আর টাকার হিমালয় গড়ে তোলেন সারা দেশে; সেবা দেওয়ার চেয়ে সেবা পাওয়ার গাঢ় মানসিকতা গড়ে ওঠে স্বৈরাচারী কায়দায়; ঘুষ আর অন্যায় কাজের সহযোগী হয়ে ওঠে নির্দ্বিধায়।
পুলিশের অন্য পিঠও আছে। নিম্ন গ্রেডের পুলিশদের বঞ্চনা, অপ্রাপ্তির জীবন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিদিনের অজানা যন্ত্রণা, আরও অনেক বিভীষিকা। একটা সত্যিকারের বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা থাকা জরুরি— পুলিশকে আমরা কোনো কাজে ব্যবহার করব, কোনো কাজে করব না। অল্প অল্প করে জনরোষ তৈরি হয় তাদের বিরুদ্ধে, বারুদ হয়ে ফেটে যায় একদিন। ৫ আগস্ট তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।
একটি মামুলি মৃত্যু
ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবার রাকিবুল। জিপিএ ৫ পেয়েছেন তিনি। কিন্তু তিনি বেঁচে নেই। ১৬ সেপ্টেম্বর অপহরণ করা হয় তাকে। মেরে ফেলা হয় তারপর।
মৃত্যু প্রতিদিনই হচ্ছে আমাদের দেশে, হরেকরকম মৃত্যু, নানা কায়দার মৃত্যু। এসব দেখতে দেখতে সবকিছু কেমন যেন সহনীয় হয়ে গেছে আমাদের কাছে। আমাদের চোখ আর ভিজে ওঠে না, বুকে কাঁপন ধরে না, নীলচে যন্ত্রণা ছুঁয়ে যায় না মাথায়।
আমরা তরতাজা প্রাণের মৃত্যু দেখি, উজ্জ্বল প্রাণের অসময়ের যাত্রা দেখি, আমরা ভাত খাই, মাছ-সবজি-পেঁয়াজ খাই। আলো-আঁধারিতে স্যুপ আর ভাজা মুরগি খাই। রিল দেখি, ফেসবুকে জ্বালাময়ী বাণী দিই। তারপর রাত একটু বাড়তেই মৃতের মতো ঘুম দিই।
ওটা ঠিক ঘুম নয়, মরে যাওয়ার মহড়া। আমরা ধীরে ধীরে মরে যাই, জীবিত থেকেও মরে যাই, আমরা আসলে মৃত হয়ে জীবিত থাকার গান গাই।
আমাদের আর সত্যিকারের বেঁচে থাকা হয় না কোনো দিন!



