কিডস ক্লাব উপদেষ্টা পর্ষদের বৈঠক
শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে কাজ করার প্রত্যয়

আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন ও কিডস ক্লাবের পরিচালক দন্ত্যস রওশনের সঙ্গে কিডস ক্লাবের উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্যরা। সোমবার আগামীর সময়ের প্রধান কার্যালয়ে। ছবি: আগামীর সময়
শিশুরা বই পড়ছে না, ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীও চাকরির বাজারে এসে ‘বেসিক যোগ্যতা’ প্রমাণে ব্যর্থ হচ্ছেন।
সমাজের বিভিন্ন স্তরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শিষ্টাচার প্রায় উঠেই গেছে। এমন নানা অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়— কিন্তু সমাধান কী?
নালন্দা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুমনা বিশ্বাস বললেন, ‘আমাদের প্রায় সব বাড়ি থেকেই বই পড়ার সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে। বাড়িতে বই পড়ার সংস্কৃতিই যদি না থাকে, তাহলে শিশুরা বই পড়ায় আগ্রহী হবে না— এটিই তো স্বাভাবিক।’
খেলার মাঠকে শিশুদের সামাজিক বিকাশের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র উল্লেখ করে এই শিক্ষক বললেন, ‘শিশুদের জন্য খেলার মাঠ বাড়াতে হবে। কিডস ক্লাব শিশুদের নিয়ে ভাবছে, নতুন কিছু করার চিন্তা করছে। এ কাজটি আরও ভেবেচিন্তে করতে হবে। যেন সত্যিই শিশুরা উপকৃত হয়।’
আজ সোমবার বিকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দৈনিক আগামীর সময়ের কনফারেন্স কক্ষে বসেছিল ‘কিডস ক্লাব’-এর জাতীয় উপদেষ্টা পর্ষদের প্রথম বৈঠক।
এ সময় ক্লাবের প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি শিশুদের প্রতিভা বিকাশ, সৃজনশীলতা চর্চা, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে করণীয় নিয়ে পরামর্শ দেন উপদেষ্টারা।সূচনা বক্তব্যে কিডস ক্লাবের পরিচালক দন্ত্যস রওশন বললেন, ‘শিশুদের প্রতিভা বিকাশ, সৃজনশীলতার চর্চা, বই পড়ার অভ্যাস ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাই কিডস ক্লাবের লক্ষ্য। একই সঙ্গে শিশু, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করতে চায় ক্লাবটি।’
আগামীর সময় সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক মোস্তফা মামুন বলেছেন, ‘ছোটদের নিয়ে কাজ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে কঠিন কাজও। আমরা যেহেতু সংবাদমাধ্যম, মানুষের কাছে পৌঁছানোর প্ল্যাটফর্ম যেহেতু আমাদের আছে, এজন্য আমরা মনে করি— আমাদের একটা সামাজিক দায়ও আছে। ছোটদের সাংস্কৃতিক বিকাশে যদি আমরা ভূমিকা রাখতে পারি, সে ভাবনা থেকেই কিডস ক্লাব করেছি।’
প্রবীণদের জন্য ‘গোল্ড ক্লাব’ এবং তরুণদের জন্য ‘ক্যারিয়ার ক্লাব’ কাজ করছে বলেও জানালেন মোস্তফা মামুন। লেখক ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব বললেন, ‘শিশুরা কিন্তু নিজেদের ছোট মনে করে না; বরং নিজেদের বড় মনে করে। তাই শিশুদের সঙ্গে তাদের মতো করেই কথা বলতে হবে এবং তাদের উপযোগী করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।’ ক্লাবের কার্যক্রমে বিজ্ঞান বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শও দিলেন তিনি।
অদম্য মেধাবী প্রোগ্রামের নির্বাহী পরিচালক (এসিআই) ও শিশুসাহিত্যিক মো. শাহ আলম বললেন, ‘সমাজে শিষ্টাচার এখন আর দেখা যায় না। পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে। শিশুদের নিয়ে কাজ করার চিন্তাটা অগ্রসর মানুষরা করেন। আগামীর সময় সেই অগ্রসর চিন্তাটা করছে। এখন খেলাঘরের মতো সংগঠনও দলাদলিতে ভাগ হয়ে গেছে। শিশুদের নিয়ে কাজ করার মতো সংগঠন খুব বেশি নেই।’
লেখক ও সমাজকর্মী বাদল সৈয়দ বলেছেন, ‘শিশুদের ভাষাটা বোঝা খুব জরুরি। তারা কী চায়, সেটা বুঝে নিয়ে ক্লাবের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া উচিত। বিজ্ঞানমনস্কতা যেমন জরুরি, সুকুমারবৃত্তির বিকাশও তেমন জরুরি।’লেখক ও শিক্ষক মোস্তাক শরীফ বললেন, ‘কিডস ক্লাবের কার্যক্রমের সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বেশি করে যুক্ত করা উচিত। এখন যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে, তাদের বেসিক নলেজে খুবই অজ্ঞতা দেখতে পাই। কারণ শিশুদের শিখন ঘাটতি। কিডস ক্লাব এই শিখন ঘাটতি পূরণে কীভাবে কাজ করতে পারে, সেটা নিয়েও ভাবতে হবে। পথশিশুরাও যেন কিডস ক্লাবের কার্যক্রমের আওতায় আসতে পারে।’
শিল্পবাংলার প্রধান নির্বাহী রূপশ্রী চক্রবর্তী বলেছেন, ‘অভিভাবকদের কেউ কেউ মনে করেন, পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই শিশুদের বিকাশ হবে। কিন্তু শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ ছাড়া যে তাদের বোধ জাগ্রত হবে না— এটা বুঝতে চায় না। এজন্য অভিভাবকদেরও ক্লাবের কার্যক্রমে যুক্ত করা জরুরি। তাদের যুক্ত না করে শিশুদের নিয়ে কাজ সফল হবে না।’
কিন্ডার বুকসের প্রকল্পপ্রধান আজহার ফরহাদ বললেন, ‘শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সুইডেনে শিশুদের জন্য কোনো বই প্রকাশিত হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অথচ আমাদের দেশে শিশুদের বই প্রকাশিত হলে তা নিয়ে কেউ ভাবে না। আমাদের শিক্ষা কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে; কিন্তু তা শিশুদের উপযোগী হয়ে উঠছে না।’
লেখক নিশাত সুলতানা পূরবী বলেছেন, ‘কিডস ক্লাব কোন ধরনের শিশুদের নিয়ে কাজ করবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি।’ স্কুলের পাশাপাশি মাদ্রাসাপড়ুয়া শিশুদেরও এ কার্যক্রমে যুক্ত করা এবং শিশুদের সঙ্গে তাদের মা-বাবাকেও ক্লাবের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার পরামর্শও দিলেন তিনি। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে শিশুদের পাঠক হিসেবে বিবেচনা করা হয় না উল্লেখ করে নিশাত সুলতানা বললেন, ‘শিশুদের উপযোগী করে সংবাদ প্রকাশ করা উচিত।’
সিটিজেনস ব্যাংকের হেড অব কারওয়ান বাজার ব্রাঞ্চ মো. জাহিদ আলমগীর বললেন, ‘আমরা এখন ব্যাংক সেক্টরেও দেখছি, মাস্টার্স করা শিক্ষার্থীদের বেসিক শিক্ষায় এত ঘাটতি। মেধাবীরা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় কিডস ক্লাব শিশুদের নিয়ে যে ভাবছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাবের প্রথম ছয়টি অনুষ্ঠানের টাইটেল স্পন্সর হয়েছে সিটিজেনস ব্যাংক। ভবিষ্যতে আরও কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ রয়েছে আমাদের।’
আগামী ছয় মাসে ছয়টি শিশু উৎসব বা বিশেষ আয়োজন করা হচ্ছে। এসব আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, গল্প বলা, কুইজ ও পুরস্কার বিতরণ থাকবে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিডস ক্লাবের শাখা বা প্রতিনিধিদল গঠন করে পাঠচক্র, সৃজনশীল প্রতিযোগিতা, পরিবেশ-সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হবে।
শিশুদের বিজ্ঞানমনস্কতা ও সৃজনশীলতা বিকাশে বিজ্ঞান মেলা, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রদর্শন, প্রযুক্তিবিষয়ক কর্মশালা ও লেখালেখির আয়োজনও থাকছে পরিকল্পনায়। পাশাপাশি সহমর্মিতা, সততা, শিষ্টাচার, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিশুদের সুস্থ বিকাশ, ইতিবাচক অভিভাবকত্ব ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিয়ে অভিভাবক সম্মেলনের আয়োজন এবং বর্ষসেরা শিশু প্রতিভাদের স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন আগামীর সময়ের ক্রিয়েটিভ, রিসার্চ অ্যান্ড ইভেন্টসের হেড মোহাম্মদ নাজির হোসেন।















