উদয়ন স্কুলে ‘যৌন হয়রানির’ প্রতিবাদ করায় শাস্তির মুখে ১০ শিক্ষার্থী

ছবি: আগামীর সময়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, ‘ব্যাড টাচ’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবি তৈরির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের ডিনের ছেলে।
এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো শাস্তির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন উদয়ন স্কুলের ১০ শিক্ষার্থী। অভিযুক্তের বাবার করা পাল্টা অভিযোগের পর তাদের কয়েকজনকে সাময়িকভাবে ক্লাসের বাইরে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছেন উদয়নের শিক্ষার্থীরা। অভিযুক্তকে ছাড়পত্র (টিসি) দেওয়া, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে নেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গত মে মাস থেকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময়ে ছাত্রীদের অস্বস্তিকরভাবে তাকানো, আপত্তিকর বার্তা পাঠানো ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেন। একপর্যায়ে এক ছাত্রীর ছবি এআই দিয়ে বিকৃত করে আপত্তিকর ছবি তৈরির অভিযোগও ওঠে। এসব বিষয়ে একাধিকবার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে চাইলেও অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি তাদের।
অন্যদিকে অভিযুক্তের বাবার দাবি, তার ছেলেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী জোর করে তুলে নিয়ে মারধর করেছে। ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট বিকৃতভাবে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে হেয় করা হচ্ছে। এ ঘটনায় তিনি বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ অক্টোবর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা ‘হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’, ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই’ এবং ‘ওর বাবা ডিন হলে আমাদের বাবা কি রিকশাওয়ালা?’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করে বিভিন্ন স্লোগান দেয়।
শিক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী ও নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের হয়রানি-হুমকি বন্ধ করা, ক্লাস থেকে বিরত রাখা শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ডিনের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।
ছবি বিকৃতি ও অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের অভিযোগ
অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ও তার এক সহপাঠীর ইনস্টাগ্রাম কথোপকথনের একটি স্ক্রিনশট সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। এতে এক নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্য রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, আইডিটি অভিযুক্তের। ওই আইডি থেকেই আগে অ্যাসাইনমেন্ট ও অভিযুক্তের ছোটবেলার ছবি পাঠানো হয়েছিল।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার অভিযোগ করা এক ছাত্রী জানান, গত মে মাসে একদিন অভিযুক্ত তাকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করে। প্রথমবার নিষেধ করে সরে গেলেও টিফিনের সময় সিঁড়ি দিয়ে নামার পথে আবারও একই আচরণ করে। অষ্টম শ্রেণিতে আরেক ছাত্রীর সঙ্গে এমন ঘটনার পর শিক্ষকেরা কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় শুরুতে বিষয়টি জানাতে সাহস পাননি তিনি।
ওই ছাত্রী অভিযোগ করেন, এআই ব্যবহার করে তার ছবি বিকৃত করে নগ্ন ছবি তৈরি করা হয়েছে। তার আরেক বান্ধবীর (উদয়ন স্কুলের শিক্ষার্থী নন) ছবিও একইভাবে বিকৃত করে বন্ধুদের কাছে পাঠানো হয়। পরে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকজন ছেলে তাকে কুরুচিপূর্ণ বার্তা পাঠাতে শুরু করেন।
নবম শ্রেণির আরেক ছাত্রী জানান, অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার সময় অভিযুক্ত তাকেও আপত্তিকর বার্তা পাঠিয়েছিল। পরে সেগুলো মুছে ফেলে। মেয়েদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিযোগে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে অভিযুক্তের মুখোমুখি হলে সে আগে এমন মন্তব্য করলেও এখন আর করে না বলে জানায়।
শাস্তির মুখে ১০ শিক্ষার্থী
শাস্তির মুখে পড়া শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর ক্লাস শেষে কয়েকজন সহপাঠী অভিযুক্তের সঙ্গে কথা বলতে যায়। একপর্যায়ে ৬০ থেকে ৭০ শিক্ষার্থী সেখানে জড়ো হয়ে তাকে আপত্তিকর ছবি ও বার্তা মুছে ফেলতে বলে। তবে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে এড়িয়ে যায় এবং তার বাবার পরিচয় দেয়।
পরে একদল শিক্ষার্থী তাকে আজিমপুর সরকারি কলোনিতে তাদের এক বন্ধুর বাসার নিচে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। উপস্থিত শিক্ষার্থী জামিল বলেন, অভিযুক্তকে দুবার চড় মারা হয়। পরে রিকশায় করে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
জামিল জানান, পরদিন ৮ অক্টোবর পরীক্ষার সময় বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক প্রতিবাদে অংশ নেওয়া ১০ শিক্ষার্থীকে শিক্ষকদের কক্ষে নিয়ে যান। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা-৩টা পর্যন্ত তাদের সেখানে রেখে ঘটনার বিষয়ে লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। এ সময় শিক্ষকেরা তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোদের কারণে আমাদের চাকরি নিয়ে টানাটানি হচ্ছে, তোরা কার ছেলেকে ধরছিস জানিস? ঢাবি ডিনের ছেলেকে ধরছিস।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রথমে ১০ জনকে পরীক্ষা ও ক্লাস থেকে বিরত রাখা হয়। পরে অভিভাবকদের প্রতিবাদের মুখে আলাদা কক্ষে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও ক্লাসে ফিরতে দেওয়া হয়নি। আগামী ১২ নভেম্বর থেকে তাদের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। এ ছাড়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর পরিবারকে ফোন করে ভয়ভীতি দেখানো ও টিসির হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদের ডিন বলেন, গত ৭ অক্টোবর তার ছেলেকে (অভিযুক্ত শিক্ষার্থী) ৮ থেকে ১০ জন জোর করে নিয়ে যায়। প্রথমে পলাশী মার্কেটের ছাদে নিয়ে নিচে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় এবং জোর করে স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে আজিমপুর কলোনিতে নিয়ে মারধর করা হয়। স্থানীয় এক ব্যক্তির হস্তক্ষেপে তার ছেলে সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে পারে।
এ ঘটনায় তিনি বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এবং থানায় জিডি করেছেন বলে জানান।
অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, রাফসান নামের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার ছেলের ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট বিকৃতভাবে ছড়ানো হয়েছে। মারধরের ঘটনায় বিচার চাওয়ার পর তার ছেলেকে ফাঁসাতে ওই চ্যাটের স্ক্রিনশট ও ফটোকার্ড পুরো স্কুলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্তের সোশ্যাল মিডিয়া আইডির মালিকানা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমার ছেলের হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে।’
তদন্ত কমিটিতে পক্ষপাতের অভিযোগ
ডিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ অক্টোবর পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে বিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন সহকারী প্রক্টরকে রাখা হয়। ওই দুই সহকারী প্রক্টর অভিযুক্তের বাবার অনুষদভুক্ত বিভাগের শিক্ষক হওয়ায় কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন অভিযোগকারী শিক্ষার্থীরা।
তাদের দাবি, ডিনের পরামর্শে ওই দুই সহকারী প্রক্টরকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন এবং আইনি ব্যবস্থার ভয় দেখিয়েছেন। অভিযুক্তের সোশ্যাল মিডিয়ার আইডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিমেইল অ্যাকাউন্টের কোড যাচাই এবং ওই আইডি থেকে পাঠানো অ্যাসাইনমেন্টের হাতের লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রস্তাব দিলেও কমিটি তা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক আবুল হোসেন ব্যাপারী।
শিক্ষার্থীরা জানান, গত ১১ অক্টোবর ও ২ নভেম্বর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেও কর্তৃপক্ষের বাধায় তা পালন করতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, ২ নভেম্বর বিদ্যালয়ের বিভিন্ন তলার গেটে তালা দেওয়া হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা বের হতে না পারেন। ওই দিন কর্মসূচি তদারকিতে প্রক্টরিয়াল টিমের একটি গাড়িও বিদ্যালয়ের সামনে পাঠানো হয়। ৩ নভেম্বর একইভাবে বাধা দেওয়া হলে তারা তালা ভেঙে বের হন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানান, দুইবার অভিযোগ জমা দিতে চাইলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করেনি। গত ১ নভেম্বর তারা তিনটি লিখিত আবেদন জমা দিতে যান। এর মধ্যে ছিল মূল ঘটনার অভিযোগ, ১০ শিক্ষার্থীর ক্লাস করার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার লিখিত কপি চাওয়া। কিন্তু প্রশাসন আবেদনগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় বলে অভিযোগ তাদের।
আবেদন গ্রহণ না করার দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গেলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ধস্তাধস্তি করে ফোনটি কেড়ে নেন বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, ওই ফোনে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির কথোপকথনের রেকর্ড, অডিও-ভিডিও এবং কল রেকর্ড সংরক্ষিত ছিল। ফোনের ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
তবে কোনো তথ্য মুছে ফেলা হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে আসার অনুমোদন নেই। কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে তদন্ত কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করছিল, এ কারণে ফোনটি নেওয়া হয়েছে। ফোনের কোনো ভিডিও বা তথ্য মুছে ফেলা হবে না। অভিভাবকদের উপস্থিতিতে তাদের কাছে ফোনটি হস্তান্তর করা হবে।
তদন্ত কমিটিতে একই অনুষদের দুই সহকারী প্রক্টরকে রাখার বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, কমিটিতে একই অনুষদের দুজন শিক্ষক থাকলেও তাদের অনুষদগত সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তারা জানতেন না। তারা অভিভাবক ও পরিচিত হওয়ায় তাদের নাম দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা তদন্ত কমিটির প্রতি অনাস্থা জানানোয় বিষয়টি উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের ক্লাসের বাইরে রাখার বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে অভিযুক্তকে মারধরের অভিযোগ থাকা শিক্ষার্থীদের আপাতত ‘অপারেশন স্টে’-তে রাখা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকেও ক্লাসের বাইরে রাখা হয়েছে। পরীক্ষার আগে তাদের শিখনঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করা হবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।



