চাকরি ছেড়ে মানুষের পাশে কাইয়ুম

অসহায়, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুম। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই যেন তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য।
১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কুলিয়ারচর উপজেলার সালুয়া ইউনিয়নে জন্ম নেন আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুম। ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে এমবিএস ডিগ্রির পর আরিয়ান ফ্যাশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে। কিন্তু তার মাথায় সবসময় থাকত কীভাবে অসহায় মানুষের সেবা করা যায়, সে বিষয়টি। একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দেন, নিজেকে সঁপে দেন মানবসেবায়।
কাইয়ুমের কর্মকাণ্ডের অন্যতম বড় ক্ষেত্র স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম। তার উদ্যোগ ও অনুপ্রেরণায় কুলিয়ারচরে গড়ে উঠেছে একাধিক ব্লাড ডোনার সংগঠন। গত আট বছরে তার উদ্যোগ ও সংগঠনের মাধ্যমে তিন হাজারের বেশি ব্যাগ রক্তদান করা হয়েছে। একসময় যারা রক্ত দিতে ভয় পেতেন, তারাই এখন স্বেচ্ছায় অন্যের জীবন বাঁচাতে রক্ত দিতে এগিয়ে আসছেন।
পাশাপাশি গৃহহীন মানুষকে ঘর তৈরিতে সহায়তা করেন। অন্তত ২০টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মাণে সহযোগিতা করেছেন তিনি। সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে স্থাপন করেছেন ৯টি টিউবওয়েল। প্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন চারটি হুইলচেয়ার। অসহায় প্রায় ১০০টির বেশি জটিল রোগীর চিকিৎসার জন্য অর্থ ফান্ডিং, বিধবাদের চারটি সেলাই মেশিন বিতরণ করেছেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তার উদ্যোগে ৬০০টির বেশি গাছ রোপণ করা হয়েছে। কভিড মহামারীর সময় ৮০০ পরিবারের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করেছেন তিনি।
অসহায় ও নিম্নআয়ের অনেক পরিবারের হাতে নিয়মিত মাসিক খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন কাইয়ুম। এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের নতুন পোশাক এবং পবিত্র কোরআন শরিফ উপহার দেন। পাশাপাশি অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং জরুরি প্রয়োজনে আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করেন।
মানুষের দুর্দশার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুম। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশ-বিদেশের প্রবাসী এবং সমাজের বিত্তবান ও মানবিক ব্যক্তিরা আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের দেওয়া অর্থ ও সহযোগিতা সমন্বয় করে অসহায় মানুষের প্রয়োজন পূরণে কাজ করেন তিনি।
চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর নিজের অল্প জমিতে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন মানুষের সমস্যা সমাধান, সহযোগিতা এবং অসহায় মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে।
আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুমের এসব কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রবাসী ও সমাজের বিত্তবান মানুষের আর্থিক সহযোগিতা। সম্মিলিত চেষ্টায় গড়ে উঠেছে মানবিক সহযোগিতার একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক, যার সুফল পাচ্ছেন কুলিয়ারচরের অসংখ্য অসহায় মানুষ।
স্থানীয় উপকারভোগী বিজয় চন্দ্র বলছিলেন, ‘আমাদের বাড়িতে সুপেয় পানির ব্যবস্থা ছিল না। তার সহযোগিতায় টিউবওয়েল পেয়ে আমরা খুবই উপকৃত হয়েছি। এলাকায় তার অনেক মানবিক কাজের দৃষ্টান্ত রয়েছে।’
আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুমের প্রশংসা করলেন স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. কাইয়ুম মিয়া। তিনি বললেন, ‘কাইয়ুম অসহায় মানুষের সমস্যা নিয়ে আসেন, আমরাও তার সঙ্গে সমন্বয় করে সহযোগিতার চেষ্টা করি।’
আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুমের এসব উদ্যোগ শুধু অসহায় মানুষের জীবনেই পরিবর্তন আসছে না; বরং নতুন প্রজন্মও স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক কাজে এগিয়ে আসার অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। তিনি বলছিলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অসহায়, এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে থাকতে চাই। আমার কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও মানুষ মানবসেবায় এগিয়ে আসুক, এটাই আমার প্রত্যাশা।’



