মোনাজাতউদ্দিন
আমাদের চারণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ

মোনাজাতউদ্দিন
সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিন কত খবরই না পড়ি! বন্যার্ত মানুষের কান্না, নদীভাঙা গ্রামের মানুষের করুণ গাথা, দুর্ভিক্ষপীড়িত জনপদের হাহাকার— এসব খবর চোখের সামনে ভেসে ওঠে, আবার মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কে নিয়ে আসেন এই খবর? কে পৌঁছে দেন প্রত্যন্ত গ্রামের অসহায় মানুষের আর্তনাদ রাজধানীর বারান্দায় চা নিয়ে বসা পাঠকের টেবিলে? যে মানুষটি সারাজীবন সংবাদের পেছনে ছুটেছেন, অথচ নিজে কখনো পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে চাননি, শেষ পর্যন্ত সংবাদের খোঁজে ছুটতে ছুটতে এক নদীর জলে হারিয়ে নিজেই হয়ে গেছেন সংবাদ।
আজ ২৭ জুন চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে রংপুর শহরের কেরাণীপাড়ায় জন্মেছিলেন তিনি। পিতা আলিমউদ্দিন, মাতা মতিজাননেছা। ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর মারা যাওয়া এই মানুষটি মাত্র পঞ্চাশ বছরের জীবনে সাংবাদিকতাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যার তুলনা বিরল। আজও যখন কোনো তরুণ সাংবাদিক প্রান্তিক জনপদে মানুষের গল্প খুঁজতে বের হন, তিনি মোনাজাতউদ্দিনের পথ অনুসরণ করেন। কারণ, মোনাজাতউদ্দিনই বুঝিয়েছিলেন, সাংবাদিকতা মানে ডেস্ক-চেয়ার-ফোনালাপ নয় শুধু, সাংবাদিকতা মানে পায়ে হাঁটা পথ।
রংপুর কৈলাশরঞ্জন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাস করার পর বাবার মৃত্যুতে পরিবারের হাল ধরতে হয় মোনাজাতউদ্দিনকে। পড়াশোনায় ছেদ পড়লেও পরে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে বিএ পাস করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁকে কখনো টানেনি। টেনেছিল সংবাদ। স্কুলে পড়ার সময়ই মুকুলফৌজের সদস্য হিসেবে দেয়াল পত্রিকা বের করতেন।
ষাটের দশকের প্রথমভাগে বগুড়ার ‘বুলেটিন’-এর মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। এরপর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আওয়াজ, দৈনিক আজাদ, দৈনিক পূর্বদেশ— বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। স্বাধীনতার পর রংপুর থেকে নিজ সম্পাদনায় বের করেন ‘দৈনিক রংপুর’। চার বছর পত্রিকাটি চালানোর পর যোগ দেন দৈনিক সংবাদে, উত্তরবঙ্গের সংবাদদাতা হিসেবে। টানা বিশ বছর এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বলা যায়, দৈনিক সংবাদ আর মোনাজাতউদ্দিন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন। শেষ জীবনে, ১৯৯৫ সালে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন দৈনিক জনকণ্ঠে। কিন্তু জনকণ্ঠের সঙ্গে তাঁর পথচলা ছিল মাত্র আট মাসের। নদী তাঁকে আসছিল নীরবে গিলে খেতে।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ‘চারণ সাংবাদিকতা’ কথাটি এখন বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু এই ধারার পথপ্রদর্শক মোনাজাতউদ্দিনই। চারণ সাংবাদিকতা মানে শুধু খবর সংগ্রহ নয়, খবরের জন্য চারণের মতো ঘুরে বেড়ানো, মানুষের কাছাকাছি যাওয়া, তাঁদের মুখের ভাষায় তাঁদের কথা তুলে আনা। মোনাজাতউদ্দিনের কাছে সাংবাদিকতা ছিল ব্রত, শুধুমাত্র পেশা নয়। দৈনিক সংবাদে তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র পাঁচ শ টাকা। অথচ সেই পাঁচ শ টাকার চাকরির জন্য তিনি মাসের পর মাস নিজের বাড়িতে থাকতে পারতেন না। ছুটে বেড়াতেন জেলা থেকে জেলায়। রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী— উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জনপদ ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। সেসব জায়গায় তখন রাস্তাঘাট ছিল না, ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না যোগাযোগের আধুনিক মাধ্যম। পায়ে হেঁটে, সাইকেলে চেপে, নদী সাঁতরে তিনি পৌঁছে যেতেন সংবাদের উৎসে। তাঁর হাতের নোটপ্যাড ভরে উঠত মানুষের দুঃখ-কষ্টের গল্পে। ঘটনাস্থল থেকেই প্রতিবেদন লিখে পাঠিয়ে দিতেন ঢাকায়।
মোনাজাতউদ্দিনের প্রতিবেদন নিছক খবর ছিল না, ছিল একেকটি জীবন্ত দলিল। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিবেদনগুলোর একটি ‘নদীর নাম গণহত্যা’। যমুনা নদীর ভাঙনের ওপর লেখা এই প্রতিবেদনে তিনি শুধু ভাঙনের ভৌগোলিক কারণ ব্যখ্যা করেননি, বরং তুলে ধরেছিলেন ভাঙনের শিকার কৃষক পরিবারগুলোর অসহায়ত্ব, তাঁদের কান্না, তাঁদের সর্বস্ব হারানোর বেদনা। আরেকটি প্রতিবেদন ‘দুখাই জমাদ্দারের বেহেশত যাত্রা’, যেখানে তিনি এক বৃদ্ধ কৃষকের মুখের ভাষায় তাঁর সংলাপগুলো ফুটিয়ে তুলেছিলেন। পড়তে পড়তে মনে হতো, কোনো ছোটগল্প পড়ছি। অথচ তথ্যের কোনো হেরফের নেই। ‘আর্তনাদের অক্ষরমালা’ ছিল মঙ্গাকবলিত অঞ্চলের শিশুদের নিয়ে এক হৃদয়বিদারক প্রতিবেদন। ‘মধুপুরের পথ ধরে’, ‘রজনীগন্ধার জন্য ভালোবাসা’— প্রতিটি লেখাতেই তিনি প্রমাণ করেছেন, সাংবাদিকতা কেবল তথ্য নয়, সাংবাদিকতা মানুষকে জাগাতেও পারে।
১৯৯২ সালে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তিনি তুলে ধরেছিলেন রংপুরের মিঠাপুকুরের জয়রামপুর গ্রামের আছিরন নেছার কথা। বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য, পরিবার পরিকল্পনার নামে প্রতারণা— সবকিছুর চিত্র এঁকেছিলেন তিনি এতটাই মর্মস্পর্শীভাবে যে, প্রতিবেদনটি চোখে পড়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের। ঢাকা থেকে মালেকা বেগম-সহ কেন্দ্রীয় নেতারা ছুটে যান সেই গ্রামে। ২৩ বছর পর ২০১৫ সালে প্রথম আলোর প্রতিবেদক আরিফুল হক ফিরে যান আছিরনের কাছে। ‘সেই আছিরন এই আছিরন’ শিরোনামে তিনি লিখলেন— এখন আছিরন নিজেই হয়েছেন স্বাবলম্বী। বাড়িতে দুটি ঘর, চারটি তাঁত, পুকুরে মাছ, পাটপণ্যের একটি শোরুম। সাতটি গ্রামের ছয় শ নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। মোনাজাতউদ্দিনের এক প্রতিবেদনই বদলে দিয়েছিল এক নারীর জীবন।
এই প্রতিবেদন শুধু খবর ছিল না, ছিল কৃষকের হয়ে মোনাজাতউদ্দিনের নিজের আর্তি। যাঁর ক্ষমতা নেই উচ্চপদে সমস্যার কথা বলার, মোনাজাতউদ্দিন তাঁর হয়ে কথা বলেছেন
নাচোলের জমি জালিয়াতি নিয়ে লেখা সরেজমিন প্রতিবেদনে তিনি লিখেছিলেন, ‘জমি জালিয়াতির ঘটনা চলছে নাচোলে। ধনী ও প্রভাবশালীরা বিভিন্ন পন্থায় বাগিয়ে নিচ্ছে সরকারি খাসজমি ও পুকুর। বেহাত হয়ে যাচ্ছে ঘোষিত “শত্রু সম্পত্তি”।... উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেবের ফাইলে জমা হয়ে আছে এ সংক্রান্ত শতাধিক অভিযোগপত্র... ফাইলবন্দি হয়ে আছে বহু কৃষকের ফরিয়াদ।’ এই প্রতিবেদন শুধু খবর ছিল না, ছিল কৃষকের হয়ে মোনাজাতউদ্দিনের নিজের আর্তি। যাঁর ক্ষমতা নেই উচ্চপদে সমস্যার কথা বলার, মোনাজাতউদ্দিন তাঁর হয়ে কথা বলেছেন।
মোনাজাতউদ্দিন ছিলেন নির্লোভ, আপোসহীন, নির্ভীক। মন্ত্রীর সঙ্গে একই টেবিলে বসে খেয়েও সেই আয়োজনের বিরুদ্ধে সংবাদ করতে দ্বিধা করেননি। শিরোনামে লিখেছেন, ‘আসাম থেকে বন্যা, ঢাকা থেকে বাবুর্চি, বগুড়া থেকে দৈ’। তাঁর অজস্র প্রতিবেদন স্বজন, পরিজন, এমনকি নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধেও গেছে। কিন্তু তিনি কখনো আপোস করেননি। দুর্নীতি আর আপোসকামিতার ছায়াও তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে তিনি গিয়েছিলেন বিদেশে। চিরচেনা সেই সাধারণ শার্ট, নিজের কোনো স্যুট নেই— পরে নিয়েছিলেন ধার করা স্যুট। অথচ সেই মানুষটিই তাঁর লেখনীর জোরে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন দেশের প্রশাসনকে, জাগিয়ে তুলেছিলেন সমাজের বিবেককে।
মোনাজাতউদ্দিনের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তাঁর আত্মসমালোচনার ক্ষমতা। এক প্রতিবেদনে তিনি লিখেছিলেন, ‘ভুলে যাই দীর্ঘদিন বেকার বৃদ্ধ মজুর ভাদুর কথা, বিস্মৃত হই কাঁচকলা সেদ্ধ খাওয়া সেই বৃদ্ধা। যে গ্রামে ক্ষুধা আজও আছে, যেখানে অনাহারজনিত অপুষ্টিতে মারা গেছে নর-নারী-শিশু। তারা কোথায়? তারা থাকুক কি মরুক, আধ সের চালের ভাত ৭ জনে ভাগ করে খাক কিংবা কেউ খাক কাঁচকলা সেদ্ধ, আমার যেন কিছু যায় আসে না!’ আসলে কি তাঁর কিছু যায় আসত না? এই বাক্যগুলোই তো বলে দেয়, কতটা ভেতর থেকে নাড়া দিত তাকে এই মানুষগুলোর কথা। তিনি তো নিজেই লিখেছেন, ‘আমি শ্রমিক, লিখে যাই। কর্তৃপক্ষ কিছু টাকার বিনিময়ে আমার শ্রম কেনেন।’ কিন্তু এই শ্রম ছিল নিছক পণ্য নয়, ছিল এক নিবিড় প্রেম— মানুষের প্রতি, সমাজের প্রতি, সত্যের প্রতি।
মোনাজাতউদ্দিনের প্রতিবেদনগুলো পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে, যা আজও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের কাছে অমূল্য সম্পদ। ‘পথ থেকে পথে’ (১৯৯১), ‘কানসোনার মুখ ও সংবাদ নেপথ্যে’ (১৯৯২), ‘পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ’ (১৯৯৩) তাঁর প্রধান গ্রন্থ। এছাড়া ‘নিজস্ব রিপোর্ট’, ‘কাগজের মানুষেরা’, ‘শাহ আলম ও মজিবরের কাহিনী’ (১৯৭৫), ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন গ্রামীণ পর্যায় থেকে’, ‘চিলমারীর একযুগ’, ‘লক্ষ্মীটারী’, ‘ছোট ছোট গল্প’— প্রতিটি বইতেই তিনি সংবাদকে সাহিত্যে উত্তীর্ণ করেছেন। তাঁর কলমে সাধারণ খবর হয়ে উঠেছে সংবাদসাহিত্যের অনন্য নমুনা।
১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর। মোনাজাতউদ্দিন গিয়েছিলেন গাইবান্ধার ফুলছড়ির যমুনা নদীতে, কালাসোনার ড্রেজিং পয়েন্টে। প্রতিবেদনের জন্য ছবি তুলতে গিয়ে ফেরির ওপর থেকে পা পিছলে পড়ে যান নদীর জলে। যে যমুনা নদীকে তিনি সাংবাদিকতার জীবনে বারবার কেন্দ্র করে লিখেছেন, যে নদীর ভাঙন আর রোষের গল্প তিনি মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন, সেই নদীই শেষ পর্যন্ত তাঁকে কোলে তুলে নিল। আদ্যান্ত সংবাদের খোঁজে ছুটে বেড়ানো মানুষটি নিজেই হয়ে গেলেন সংবাদ। এ এক করুণ, একই সঙ্গে প্রতীকী পরিণতি।
মোনাজাতউদ্দিন মারা গেছেন প্রায় তিন দশক হলো। কিন্তু তাঁর সাংবাদিকতা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। যখন সাংবাদিকতা ক্রমশ শহরকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, যখন বিনোদন আর ক্রীড়ার খবরই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন মোনাজাতউদ্দিনের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— সাংবাদিকতার আসল কাজ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রান্তিক মানুষের গল্প কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, রাজধানীর বাইরে থেকেও জাতীয় সম্পাদকীয় নীতিতে প্রভাব ফেলা যায়। যাঁরা আজ ভাবেন, ভালো সাংবাদিক হতে গেলে ঢাকায় থাকতেই হবে, তাঁদের জন্য মোনাজাতউদ্দিন এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ।
তাঁর সাংবাদিকতা শুধু তথ্যের ভাণ্ডার নয়, তা আমাদের শেখায় কীভাবে খবরকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে মানুষকে ভালোবাসতে হয়। আর যখন সেই ভালোবাসা এতটা গভীরে পৌঁছে যায়, তখন লেখকের আর নদীভাঙন ও আত্মবিসর্জনের মধ্যে কোনো ফারাক থাকে না। তিনি হয়ে ওঠেন নদীর অংশ, নদীর মতোই বহমান, নদীর মতোই চিরন্তন।
জন্মদিনে মোনাজাতউদ্দিনকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন মানুষকে স্মরণ করা নয়, বরং এক আদর্শকে স্মরণ করা। সাংবাদিকতা যে কতটা মহৎ, কতটা মানবিক হতে পারে, তিনি তার প্রমাণ রেখে গেছেন নিজের জীবন দিয়ে। তাঁর রেখে যাওয়া বইগুলো আজও বলে যায় সেই চারণ সাংবাদিকের কথা, যিনি লিখেছিলেন, ‘আমি শ্রমিক, লিখে যাই।’ কিন্তু এই শ্রমিকের কলমই আমাদের দিয়ে গেছে এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা কোনো টাকায় কেনা যায় না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যদি প্রশ্ন করি— সাংবাদিকতা কী? তার উত্তর মোনাজাতউদ্দিনের জীবন। সাংবাদিকতা মানে পথ থেকে পথে ছোটা, সংবাদের পেছনে ছোটা, মানুষের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার পেছনে ছোটা। আর এই ছুটে চলা জীবনের সাংবাদিকদের জন্য তাই এক অনস্বীকার্য প্রেরণার নাম মোনাজাতউদ্দিন।
লেখক, সাহিত্য সম্পাদক ও হেড অফ ক্রিয়েটিভ, রিসার্চ এন্ড ইভেন্টস, আগামীর সময়





