একাশি ছুঁতেন মোনাজাতউদ্দিন

চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন
আজ ২৭ জুন ২০২৬। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসের কিংবদন্তি পুরুষ মোনাজাতউদ্দিনের ৮১তম জন্মদিন। সাংবাদিকতাকে যিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এমন বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিককে খুঁজে পেতে বাংলাদেশকে আরও অনেকটা কাল অপেক্ষা করতে হতেও পারে, অথবা তাঁর মতো আর কখনোই আসবেন না। মা-মাটি-মানুষ, বিশেষ করে বঞ্চিত তথা অতি সাধারণ মানুষের জন্য যার মন সবসময়ই কাঁদত।
কাগজে-কলমে তাঁর জন্ম ১৮ জানুয়ারি। সম্প্রতি তাঁর সহধর্মিণী নাসিমা মোনাজাত ইতির সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তাঁর শাশুড়ি বলে গেছেন, মোনাজাতউদ্দিনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৭ জুন পুরাতন রংপুরখ্যাত মাহিগঞ্জে। আর এই দিনটিকেই মোনাজাত পরিবার এবং স্বজনেরা, বিশেষ করে রংপুরের সাতমাথায় গড়ে তোলা মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পাঠাগারে উদযাপন করবেন।
সাংবাদিকতাকে তিনি কোনো কালে পেশা হিসেবে নেননি, নিয়েছিলেন ব্রত হিসেবে। আর তাই তো বারবার আরাম-আয়েশ ছেড়ে ছুটে যেতেন গ্রামের পথে পথে। প্রতি বৃহস্পতিবার মৌনতা অবলম্বন করতেন। কেউ কিছু বললে লিখে উত্তর দিতেন।
ঝোলার মতো একটি ব্যাগ আর কিছু কাপড়চোপড় সবসময়ই সঙ্গে রাখতেন। কোনো খবর কানে এলেই কালবিলম্ব না করে পায়ে হেঁটে, রিকশা বা সাইকেলে চড়ে, কখনো বাসে বা ট্রেনে, নৌকায়, এমনকি স্টিমার-ফেরিতেও ছুটতেন সংবাদের পেছনে। তাঁর কলামগুলো ছিল শোষিত মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জোগাতে এবং হানাদার বাহিনীর নির্মমতার খবর বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও সচল ছিল তাঁর কলম। জনবান্ধব এই সাংবাদিক খবরের পেছনের খবর খোঁজার চেষ্টায় গভীর থেকে গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করতেন।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে নিজেই রোগী সেজে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে একবার ধরাও পড়ে গিয়েছিলেন
একবার তো রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার ওপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে নিজেই রোগী সেজে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে একবার ধরাও পড়ে গিয়েছিলেন। ফিল্ম চাইলে আসলটি রেখে ফাঁকা একটি রোল বেশ কৌশলে দিয়ে দিয়েছিলেন।
খুব কম গণমাধ্যমই তাদের বস্তুনিষ্ঠতা তথা মানুষের আস্থার জায়গাটি ধরে রাখতে পেরেছে। স্মার্টফোন থাকলেই আজকাল অনেককে বলতে শোনা যায়, মোজা (মোবাইল জার্নালিস্ট) সাংবাদিক। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের কোনো বালাই নেই, সম্পাদনার প্রশ্নই আসে না। সোজা ছেড়ে দিচ্ছেন অন্তর্জালে। আর তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা, কখন ভিউ হাজার ছাড়াবে। তারপর 'ভাইরাল' হওয়ার ইচ্ছা তো মনে মনে থেকেই যায়।
খবরটি সত্যিই বক্স আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। আজাদের বার্তা সম্পাদক ধন্যবাদপত্রও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বাধ সাধল দৈনিক ইত্তেফাক। তারা কেন এমন খবর জানতে পারল না? ইত্তেফাকের নিজস্ব প্রতিনিধিকে তলব করে সচিত্র প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি সরেজমিনে গিয়ে এমন কোনো ঘটনার অস্তিত্ব না পেয়ে খবরটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া বলে ঢাকায় অবহিত করেন। এরপর শুরু হয় মোনাজাতউদ্দিনের চাকরি নিয়ে টানাপোড়েন। পরে অবশ্য নতুন বলে ক্ষমা পেয়ে যান। ক্যারিয়ারের শুরুতেই করা এমন একটি মহাভুল থেকে তিনি পরবর্তীকালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সরেজমিনে না গিয়ে আর কোনো দিন টেবিলমেড খবর বা ফিচার লিখবেন না। এই ঘটনাটিই মোনাজাতউদ্দিনকে অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সে সময়টায় ডিজিটাল মাধ্যম ছিল না। তথ্য সংগ্রহ করে নিউজপ্রিন্টের পাতায় বলপয়েন্ট কলমে সংবাদ লিখে সেটি আবার ঢাকায় পাঠাতে হতো। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। ওই সময়ে সংবাদ পাঠানোর পদ্ধতিও ছিল অভিনব। ঢাকাগামী বাস বা ট্রেনের কোনো যাত্রীর হাতে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, ছবিসহ একটি প্যাকেটে তুলে দিতেন। সঙ্গে রিকশাভাড়াসহ দৈনিক সংবাদ অফিসে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কিছু টাকাও দিতেন। ছাপা পত্রিকা আসত পরদিন বিকেল বা সন্ধ্যার পর।
কষ্টকে জয় করেছিলেন বলেই নিজ যোগ্যতায় একজন মোনাজাতউদ্দিন হয়ে উঠেছিলেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছিলেন সে সময়ের মফস্বল শহর রংপুরে বসেই ঐতিহ্যবাহী দৈনিক সংবাদ-এর উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধির দায়িত্ব। সমগ্র সংবাদপত্র জগতে এই পদে মাত্র একজন মানুষই ছিলেন, যার নাম মোনাজাতউদ্দিন।
সৃজনশীল এই মানুষটির শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় ছিল দীপ্ত পদচারণা। হাতের লেখা ছিল ভীষণ শৈল্পিক। রংপুর মহানগরীর অনেক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের লেখা ও নকশা তাঁর করা। নাটক, ছোটগল্প ও ছড়া লেখাতেও ছিলেন দারুণ পারদর্শী। তিনি শুধু লিখতেনই না, কখনো কখনো তাঁর লেখা প্রতিবেদন পাঠকদের বিস্মিত করত।
মোনাজাতউদ্দিনের সহযাত্রী এবং তাঁর কাজ নিয়ে এখনও গবেষণা করছেন ছড়াকার আশাফা সেলিম। সেলিমের লেখায় জানা যায়, ১৯৯৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে তিনি লিখেছিলেন একটি বিখ্যাত কলাম, ‘বোস্টন থেকে বামনডাঙা : রহিমা বেগম জানেন না ম্যারাডোনা কে’।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক, সাদা মনের মানুষ রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরিদের হালচাল তিনিই প্রথম সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরেছিলেন। তাঁর লেখা ‘পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ’ বইটি পাঠ করলে অনেক অজানা বিষয় জানা যায়।
ঈদ উৎসবের কোনো এক আনন্দের দিনে, যখন সবাই পায়েস, সেমাই, খিচুড়ি কিংবা পোলাও-মাংস খেতে ব্যস্ত, তখন তিনি ছুটে গিয়েছিলেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারীতে একটি এক্সক্লুসিভ সংবাদের সন্ধানে। সেখানে গিয়ে দেখেছিলেন, এক দরিদ্র পরিবারে খাবারের জন্য কচু সিদ্ধ করার প্রস্তুতি চলছে
তিনি যে বইগুলো লিখে গেছেন, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘পথ থেকে পথে’, ‘সংবাদ নেপথ্যে’, ‘কানসোনার মুখ’, ‘লক্ষ্মীটারী’, ‘কাগজের মানুষেরা’, ‘নিজস্ব রিপোর্ট’, ‘শাহ আলম ও মজিবরের কাহিনী’, ‘চিলমারীর এক যুগ’ এবং ‘ছোট ছোট গল্প’।
উৎসব আমাদের ঐক্যের ডাক দেয়। ঈদ উৎসবের কোনো এক আনন্দের দিনে, যখন সবাই পায়েস, সেমাই, খিচুড়ি কিংবা পোলাও-মাংস খেতে ব্যস্ত, তখন তিনি ছুটে গিয়েছিলেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারীতে একটি এক্সক্লুসিভ সংবাদের সন্ধানে। সেখানে গিয়ে দেখেছিলেন, এক দরিদ্র পরিবারে খাবারের জন্য কচু সিদ্ধ করার প্রস্তুতি চলছে। অথচ তাদের ঘরে একমুঠো চালও ছিল না। সেই ছবিসহ সংবাদটি ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসে পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত হলে পাঠকেরা হতভম্ব হয়ে যান। এমনই ছিল মোনাজাতউদ্দিনের প্রতিবেদন।
রংপুরে জন্ম নেওয়া, একুশে পদকপ্রাপ্ত এই ক্ষণজন্মা সাংবাদিক ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় দৈনিক জনকণ্ঠ-এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত হচ্ছিল ট্যাংক লরির তেল চুরির ঘটনা নিয়ে তাঁর লেখা দুঃসাহসিক ধারাবাহিক প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গাইবান্ধার ফুলছড়িঘাট এলাকায় যমুনা নদীর কালাসোনা চরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘শেরে বাংলা’ ফেরির ছাদ থেকে নদীতে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। অত্যন্ত সাবধানী এই মানুষটির মৃত্যু আজও অনেকের কাছে রহস্যময়।
মোনাজাতউদ্দিন এবং আমার বাবা, ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও কারমাইকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম, ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রায়ই ক্যামেরা হাতে হুট করে ছুটে আসতেন রংপুরের পায়রা চত্বর, সেন্ট্রাল রোডে আমাদের দাদার বাসায়। বাবার সঙ্গে ছবির ক্যাপশন নিয়ে আলোচনা করতেন। আমিও এক ফাঁকে অগোচরে তাঁর ক্যামেরাটি নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতাম।
কখনো কখনো বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলতেন, “ভাবী, ঘরে যা আছে এক্ষুনি নিয়ে আসেন।” আন্তরিকতার দিক থেকে তিনি ছিলেন ভীষণ খোলামেলা, যেন আমাদেরই একজন। আমার বাবা-মায়ের বিয়ের পরের অনেক ছবি, বিশেষ করে আমাদের দুই ভাইয়ের ছোটবেলার ছবিগুলো, তাঁরই ক্যামেরায় তোলা।
আজও ক্যামেরা হাতে যখন কোথাও ছবি তুলতে বেরিয়ে পড়ি, তখন মোনাজাতউদ্দিনের কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু তিনি এ পৃথিবীতে বেঁচে নেই, তা বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়। মনে হয়, রংপুর প্রেসক্লাবে গেলেই তাঁর দেখা পাব।
গভীর ঘুমে তিনি শায়িত আছেন রংপুরের মুন্সিপাড়া কবরস্থানে। চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের কথা যখনই মনে পড়ে, তখনই তাঁর কবরের এপিটাফে উৎকীর্ণ বাংলাদেশের প্রধানতম কবি শামসুর রাহমানের লেখা চরণগুলো সামনে ভেসে আসে:
যাইনি পায়রাবন্দে, তবুও বেগম রোকেয়ার
কবেকার শোকগ্রস্ত বাড়ির কংকাল, ভিটেমাটি
এবং সেখানকার ধূলিকণা, লতা-গুল্ম আর
লাউয়ের মাচান, ধানক্ষেত, কুয়োতলা, ছেঁড়াপাটি,
বর্গাচাষী, বাল্যবিয়ে-পড়ানো মৌলভী, ছমিরণ,
দিনভর খাটুনির ধকল-পোহানো কিশোরীর
খড়ের ওপর ঘুম, ইত্যাদি দেখেছি মোনাজাত,
তোমারই সৌজন্যে; সেই ঋণ স্বীকারে অকুণ্ঠ আমি।
লেখক- লেখক ও গবেষক





