নিজের থেকেও দূরে কবি হেলাল হাফিজ

ছবি: আগামীর সময়
দূরেই ছিলেন কবি হেলাল হাফিজ। ভৌগালিক অবস্থানে, মানসিক দূরত্বে নিজের আত্মার সঙ্গেই নিঃশব্দে ব্যবধান তৈরি করে আলগোছে এক সমান্তরাল জীবনের মধ্যে বেঁচে ছিলেন। কবিতার ভিতরে সেই সমান্তরাল জীবন কবিদের হাতছানি দেয় চিরকাল। রাত্রির শাখা-প্রশাখা থেকে, পথ থেকে, ঘুম থেকে জীবনযাপনের একটি সম্পূর্ণ পদ্ধতির পাশাপাশি অন্য এক জীবনের গল্প তার কবিতায় জন্ম নিয়েছিল। রাজনৈতিক-সামাজিক নানা ঘটনায় আলোড়িত বাংলা কবিতার উত্তেজনাময় ষাট থেকে আশির দশকের প্রেক্ষাপটে হেলাল হাফিজ নিজ হাতে, নিজস্ব ভাষায় নির্মাণ করেছেন সেই সমান্তরাল জীবনের ছবি।
প্রেসক্লাব, সেগুনবাগিচা, পল্টন; রাজধানী ঢাকার জীবনপ্রবাহ অথবা ফেলে আসা জন্মের ঘর নেত্রকোনায় বসবাসের ধারাবাহিক ছবির বাইরে তার কবিতায় তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক ব্যক্তিগত হাহাকারের চালচিত্র। সেই ক্ষতচিহ্নগুলো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো প্লাবিত করেছে তার কবিতার পাঠকদের অভিজ্ঞতাকে।
একদা বসবাসের ঠিকানা পুরানা পল্টন জুড়ে কবিতা লিখেছেন হেলাল হাফিজ। প্রেসক্লাবের কার্ডরুমে জুয়াড়ির সতর্কতায় তার কবিতার শব্দ শিকার করেছে প্রতিপক্ষ পাঠককে। হেঁটে যেতে যেতে বায়তুল মোকাররমের ফুটপাতের ভিড়, স্টেডিয়ামের উত্তেজনাময় গ্যালারি, রিকশায় নিঃসঙ্গ ভ্রমণ, প্রেম আর নিজেকে সমান্তরাল অন্য জীবন থেকে সরিয়ে রেখে সাবধানে ঝুঁকে থাকা ঘড়ি সারাইয়ের দোকানীর মতো কবিতা লিখেছেন তিনি। চোখে আলাদা লেন্স লাগিয়ে সময়ের ভ্রমণকে নিরীক্ষণ করেছেন, শব্দ খুঁজেছেন।
সম্ভবত নিজেকে খুলে দেখানোর তাগাদা থেকেই ‘তোমাকেই চাই’ কবিতায় লিখেছেন,
আমি এখন অন্য মানুষ ভিন্ন ভাবে কথা বলি
কথার ভেতর অশথিত অনেক কথা জড়িয়ে ফেলি
এবং চলি পথ-বেপথে যখন-তখন।
আমি এখন অন্য মানুষ ভিন্ন ভাবে চোখ তুলে চাই
খুব আলাদা ভাবে তাকাই
অন্য এক মানুষ কবি হেলাল হাফিজকে ধারণ করেছিল তার যাপিত একটি জীবন। কবিতায় তার ভিন্ন ভাবে কথা বলার ভাষা তাকে করে তুলেছিল একা এবং অভিমানে পূর্ণ এক কলসে। ভিড়ের ভিতরে থেকেও অনেকটা দূরে এক ঘর বেঁধেছিলেন তিনি। ‘ক্যাকটাস’ কবিতায় তাই উ”চারণ করেছেন সেই অমোঘ লাইন,
দারুণ আলাদা একা অভিমানী এই ক্যাকটাস।
যেন কোনো বোবা রমণীর সখী ছিল দীর্ঘকাল
কিংবা আজন্ম দেখেছে আকাল
এরকম ভাবভঙ্গি তার
ধ্রুপদী আঙিনা ব্যাপী
কন্টকিত হাহাকার আর অবহেলা,
যেন সে উদ্ভিদ নয়,
তাকালেই মনে হয় বিরান কারবালা।
ক্যাকটাসের নৈঃসঙ্গ তাকে টেনেছিল। সেগুনবাগিচায় এখন লুপ্ত দৈনিক দেশ পত্রিকা অফিসের উঠানে একা হাহাকারের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বড় ক্যাকটাস গাছটিকে অবলোকন করতে করতেই আশির দশকে লেখা হয়ে গিয়েছিল কবিতাটি। সেই নৈঃসঙ্গ ছড়িয়ে ছিল তার দৈনন্দিন জীবনযাপনের রোজনামচায়। পল্টনের চিলেকোঠার নিঃসঙ্গতায় অথবা বেইলিরোডের ভাইয়ের সরকারী আবাসের ছোট ঘরটিতে পরিপাটি যে জীবনের ভিতরে যে হেলাল হাফিজকে বসবাস করতে একদা দেখা যেত তার পাশাপাশি কবিতায় অন্য এক কবির জীবন বয়ে গিয়েছিল। সেখানে তিনি এক অদৃশ্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ‘বেদনা বোনের মতো’ কবিতার প্রথমেই লিখেছেন,
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম
শুধু আমাকেই দেখা যায়,
আলোর প্রতিফলন-প্রতিসরণের নিয়ম না জানা আমি
সেই থেকে আর কোনোদিন আয়না দেখি না।
কবিতায় ভিন্ন স্বরের অভিযাত্রায় এক ভিন্ন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার পরিবর্তে পাঠককে দেখাতে চেয়েছেন ভিন্ন এক মানুষকে। কবিতায় একটি লাগসই শব্দের অনুসন্ধানে ক্ষুধিত বাঘের মতো নিঃশব্দ পায়ে বৃত্তাকারে ঘুরেছেন। কবিতায় সম্পূর্ণ বোধকে শিকার করতে গিয়ে অপেক্ষা করেছেন অসংখ্য দিনরাত্রি। কি সেই কোমল অথচ নিপুণ ভ্রমণের দিনগুলিতে তার কবিতার পাঠক অনুমানও করতে পারেননি কবির রক্তক্ষরণকে।
কখন তাসের খেলায় দুইটি জোকার নষ্টের বেদনা তাকে তুমুল আলোড়িত করেছিল জীবনের নিরাময়হীন যন্ত্রণার মতো, কখন তার নিজের কাছে নিজের জীবনকেই মনে হয়েছিল বেদনার অন্য নাম হেলাল হাফিজ তা নির্ণয় করা কবিতার পাঠকের জন্য বরাবরই ছিল কঠিন কাজ। কবিতার সামগ্রিক পাঠ পাঠককে আন্দোলিত করে। চেতনার প্রবাহে নিজস্ব জীবনের চেনা অনুভ‚তি অন্য পোশাকে হাজির হয় সামনে। তার মনোভূমি আলোড়িত হয়। তখন কবির সেই একা এবং নিঃসঙ্গ ছায়া সরে যায় পর্দার আড়ালে।
নিষ্পেষণ সহ্য করে নিতে হয় কবিকে। যন্ত্রণার ছুরি বুকে বিদ্ধ হলেও তার সাধনা আত্মসমাহিত হওয়া। সেই সাধনাই করেছিলেন কবি হেলাল হাফিজ। কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘শব্দই জানে কেমন করে সে নিঃশব্দ পায়, ঐশ সূত্র না ছিঁড়েও। লিখেছিলেন, ‘আছি, আমি আছি এই ধ্বনি যখন শোনা যায় প্রশ্বাসের আবর্তে কেবল তখনই দলবাঁধা সব শব্দ ধাবিত হয়ে চলে যেতে চায় শেষহীন নীরবের দিকে।’
এই শেষহীন নীরবের পথ ধরে কবিতায় হেলাল হাফিজের পরিভ্রমণ। তার কবিতা পাঠকের কাছে আজও রেখে গেছে সেই ভ্রমণের গল্প। হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর। আজ তার জন্মদিনে নিজের থেকেও দূরে থাকা কবির প্রতি ভালোবাসা রইল।



