সরকারের ১০০ দিন
আশা-হতাশার মিশ্রণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পর নতুন প্রত্যাশার জন্ম হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও অনিশ্চয়তার পর জনগণের নতুন সরকারের কাছে মূলত পরিবর্তনের বার্তা, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্বস্তির প্রত্যাশা ছিল । প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমানও ‘জনবান্ধব শাসন’ ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি সামনে রেখে পথচলা শুরু করেন। তবে সরকার গঠনের ১০০ দিন পূর্তিতে অর্জন ও কিছু সীমাবদ্ধতার বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে— যেখানে আশার পাশাপাশি হতাশার ছায়াও রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে প্রশাসন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং কৃষি সহায়তা কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ ঈদ উদযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের উদ্যোগও সরকারের সাফল্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমীন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলনের পর নতুন সরকার একটি গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের কেবিনেট সিদ্ধান্তের উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কল্যাণে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কিন্তু সরকারের এই অর্জনের বিবরণের পাশাপাশি বাস্তবতার আরেকটি দিকও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— যেখানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, অসন্তোষ ও উদ্বেগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি।
সরকার গঠনের কিছুদিনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। তেল সরবরাহে ঘাটতি, পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং বাজারে অনিশ্চয়তা জনমনে চাপ তৈরি করে। এর প্রভাব পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
এর মধ্যেই নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে আসে হামের প্রাদুর্ভাব। মার্চ থেকে দেশ জুড়ে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্য খাতে চাপে পড়ে সরকার। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হওয়ার খবর এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় জনমনে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। সরকার জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে সময় লাগবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক পরিস্থিতিও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় উদ্ভূত বিভিন্ন শক্তি এখনো সক্রিয়। বিশেষ করে সরকারের সংস্কার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে চাপ অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক নানা বাস্তবতা সরকারকে প্রতিনিয়ত হিসাব কষে চলতে বাধ্য করছে।
সবচেয়ে বেশি সমালোচনা শোনা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। চুরি, ছিনতাই, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ছে বলে জনমনে আলোচনা রয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তন এখনো ততটা স্পষ্ট নয়— এমন ধারণা সমাজের বিভিন্ন স্তরে তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বৈদেশিক ঋণের চাপ, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সরকারকে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নীতিগত অগ্রগতি থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তির প্রতিফলন এখনো সীমিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
১০০ দিনের হিসাব তাই একপক্ষীয় নয়। একদিকে পরিবর্তনের বার্তা, কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ এবং প্রশাসনিক সক্রিয়তা— অন্যদিকে জনদুর্ভোগ, রাজনৈতিক চাপ, স্বাস্থ্য সংকট ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ। জনগণের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত পরিবর্তনের; কিন্তু বাস্তবতা বলছে, দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে ওঠা সময়সাপেক্ষ।






