বালুর ফ্রেমে ইতিহাস : হিউন্দে সৈকতে চোখ ধাঁধানো দিন

বালু দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বুসান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি- লেখকের সৌজন্যে
দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত হিউন্দে সমুদ্রসৈকত এখন রূপ নিয়েছে এক সুবিশাল, উন্মুক্ত সোনালি গ্যালারিতে। কোরিয়ায় আমার প্রবাসজীবনের ডায়েরিতে মে মাসের এই দিনগুলো এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। সাক্ষী হয়েছি দেশটির একমাত্র পরিবেশবান্ধব বালু উৎসব— ‘হিউন্দে স্যান্ড ফেস্টিভ্যাল ২০২৬’-এর।
এবারের উৎসবের মূল থিম ‘বালুর ফ্রেমে বুসানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’। ৪ দিনের মূল উৎসবের জমকালো আয়োজন শেষ হয়েছে ১৮ মে। তবে বুসান সিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সৈকতের এই চোখ ধাঁধানো প্রদর্শনী আগামী ১৪ জুন পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
পাঁচ দেশের ১১ মাস্টারমাইন্ড
হিউন্দের এই সুবিশাল বালুকাবেলায় সমবেত হয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা, চীন, ফ্রান্স এবং তাইওয়ানের বিশ্বখ্যাত ১১ বালুশিল্পী। পুরো আয়োজনের সৃজনশীল নেতৃত্বে ছিলেন কোরিয়ার তিন প্রধান শিল্পী। কাঠামো ও মূল কেন্দ্রের মাস্টারমাইন্ড জি দে-ইয়ং, নিখুঁত অবয়ব ও গল্প বলায় ওস্তাদ চোই জি-হুন এবং বিশাল স্কেলের প্রবীণ কারিগর কিম গিল-ম্যান।
মহাসমুদ্রের তীব্র বাতাস ও ঝড়-বৃষ্টির মাঝেও এই সূক্ষ্ম শিল্পকর্মগুলো মাসব্যাপী টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ পরিবেশবান্ধব বাইন্ডিং প্রযুক্তি। বালুর ক্যানভাসে ১৭টি মহাকাব্য পুরো সৈকতজুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ১৭টি বিশালাকার ভাস্কর্য। যা মূলত দুটি ভাগে বুসানের ইতিহাস ও আধুনিক সংস্কৃতিকে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছে। সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে মেগা-প্যানোরামিক ভাস্কর্যটি। বালু দিয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে বুসানের আইকনিক ‘গোয়াঙ্গান ব্রিজ’ এবং ডালমাজি হিল।
এছাড়া শতবর্ষ আগে কোরিয়া থেকে জাপানে যাওয়া কূটনৈতিক জাহাজ ‘জোসেন তোংসিনসা’, কোরিয়ান যুদ্ধের সময় বুসানের অস্থায়ী রাজধানী হওয়ার ইতিহাস এবং বুসান পোর্টের ১৫০ বছর পূর্তিতে কিংবদন্তি গায়ক চো ইয়ং-পিলের গানের থিমে তৈরি বিশাল ভাস্কর্যগুলো যেন চোখ জুড়িয়ে দেয়।
আধুনিক সংস্কৃতি ও সমুদ্রের টান
একপাশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বুসানের ঐতিহ্যবাহী ‘হেনিও’ (সমুদ্রের তলদেশে অক্সিজেন ছাড়া ডুবুরি নারী) এবং জাগালচি বাজারের মাছ বিক্রেতা নানি-দাদিদের আবেগঘন মুখচ্ছবি। অন্যপাশে সা জিক স্টেডিয়ামের লোট্টে জায়ান্টস বেসবল দলের পাগলু ভক্তদের আনন্দ এবং বিখ্যাত বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সিনেমাটিক ভাস্কর্যগুলো কোরিয়ার আধুনিক সংস্কৃতির জানান দিচ্ছিল।
এবারের বিশেষ চমক
উড়ন্ত স্কাইওয়াক ও লেজার শো এবারের আয়োজনে পর্যটকদের জন্য ছিল দারুণ এক সারপ্রাইজ। ভাস্কর্যগুলোর ঠিক ওপর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি ৭ মিটার (প্রায় ২৩ ফুট) উঁচু কাঠের তৈরি ফ্লাইওভার বা অবজারভেটরি। এই স্কাইওয়াকে হেঁটে ওপর থেকে পুরো বালুর শহর এবং পেছনের নীল সমুদ্রের প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। এক কথায় অবিশ্বাস্য!
দুপুরের তপ্ত রোদে এই ভাস্কর্যগুলো দেখতে এক রকম লাগে। সূর্য ডোবার পর সম্পূর্ণ বদলে যায় এর রূপ। রাতের বালুর ক্যানভাসে হাই-টেক প্রযুক্তির রঙিন লেজার লাইটের ছোঁয়ায় যেন জীবন্ত হয়ে উঠে বুসানের ইতিহাসের চরিত্রগুলো।
উৎসবের দিনলিপি
প্রদর্শনী দেখতে আসা শিশুদের উচ্ছ্বাস আর মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে অন্যরকম প্রাণবন্ত পরিবেশ। সবচেয়ে বেশি আনন্দমুখর ছিল শিশুদের জন্য তৈরি বিশালাকার কৃত্রিম বালুর পাহাড়। মাথায় হেলমেট পরে, প্লাস্টিকের স্লেজে চড়ে তীব্র গতিতে বালুর পাহাড় বেয়ে নিচে পিছলে পড়ছে তারা। এই বাঁধভাঙা হাসি আর হুল্লোড়ে মুখরিত সৈকত।
প্রবাস জীবনের যান্ত্রিকতা আর পড়াশোনার ক্লান্তি ভুলে হিউন্দে সৈকতের এই দিনটি ছিল বিশেষ ভালোলাগার। মানুষের সৃজনশীলতা যে কত উঁচুতে পৌঁছাতে পারে, বুসানের এই বালু উৎসব না দেখলে তা অজানাই থেকে যেত।যেভাবে যাবেন উৎসবে
বুসান স্টেশন থেকে সাবওয়ে লাইন-১ ধরে সোমিয়ন স্টেশনে নেমে লাইন-২-তে ট্রান্সফার করতে হবে। এরপর হিউন্দে স্টেশনের ৩ বা ৫ নম্বর এক্সিট দিয়ে সোজা ৫ মিনিট হাঁটলেই সৈকত। সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই এই উৎসব উপভোগ করতে পারবেন দর্শনার্থীরা।










