সোকচন লেকে বসন্ত বরণ : আড়াই কিলোমিটারের চেরি সুড়ঙ্গ

বসন্তের এ সময়ে কোরিয়া সেজেছে এক মায়াবী সাজে । ছবি : লেখক
আজ ৪ এপ্রিল, ২০২৬। মেঘমুক্ত সিউলের আকাশ আর বাতাসে অদ্ভুত মাদকতা। দক্ষিণ কোরিয়ায় আমার সাত মাসের প্রবাস জীবনে আজকের দিনটি এক বিশেষ প্রাপ্তি। বসন্তের এ সময়ে কোরিয়া সেজেছে এক মায়াবী সাজে। আজ গিয়েছিলাম সিউলের অন্যতম জনপ্রিয় চেরি ব্লসম উৎসব কেন্দ্র সোকচন লেকে।
লেকের চারপাশ ঘিরে প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কয়েক হাজার চেরি গাছ এখন ফুলে ফুলে সাদা হয়ে আছে। ১২৩ তলা বিশিষ্ট বিখ্যাত ‘লোটে ওয়ার্ল্ড টাওয়ারের’ ছায়া লেকের স্বচ্ছ স্থির পানিতে। টাওয়ারের ছায়া ঘিরে ধবধবে সাদা ফুলের মেলা যেন শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস।
এবারের সোকচন লেকের উৎসব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাণবন্ত। ফেস্টিভ্যাল শুরু হয়েছে গত ২৯ মার্চ (শনিবার) থেকে। চলবে ৬ এপ্রিল (রবিবার) পর্যন্ত। সিউলের জামশিল-ডং এলাকায় অবস্থিত লেকটি সবার জন্য উন্মুক্ত। নেই কোনো প্রবেশ মূল্য। আর সবচেয়ে সুবিধা হলো সাবওয়েতে চড়ে খুব সহজেই এখানে আসা যায়।
জামশিল স্টেশনে নেমে ২ থেকে ৩ মিনিট হাঁটলেই দেখা মেলে স্বপ্নের চেরি বাগানের। স্থির পানির ওপর চেরি ফুলের প্রতিফলনই লেকটির বিশেষত্ব। সিউলের আধুনিক স্কাইলাইনের পাশেই লোটে ওয়ার্ল্ডের মতো বিশাল বিনোদন কেন্দ্রের এক অপূর্ব সমন্বয়।
বাতাস বয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি ছিল আজকের সবচেয়ে চমৎকার। বাতাসের ঝাপটায় ঝড়তে থাকা চেরি ফুলের পাপড়িগুলো যেন বসন্তের স্নিগ্ধ কোমল তুষারপাত। যার বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না। চারপাশে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। এ ‘ফ্লাওয়ার রেইন’ বা পুষ্পবৃষ্টির কাছে সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল।
প্রবাসে একা ঘুরতে এলেও মনটা পড়ে ছিল দেশে। পকেট থেকে ফোন বের করে ধারণ করা ভিডিও চিত্রগুলো পাঠাচ্ছিলাম স্ত্রীকে। এরপর ভিডিও কল দিলাম। ফোনের ওপাশে আমার ছোট্ট মেয়ে আরিয়া। ওকে যখন চেরি ফুলের এই শুভ্রতা দেখানো মাত্র বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলে উঠল, ‘বাবা, অনেক তুন্দল (সুন্দর)!’
ওর আধো আধো বোল আর চেরি ফুলের এই সৌন্দর্য মিলেমিশে এক অদ্ভুত ভালো লাগায় মনটা ভরে গেল। মা ও বোনের সঙ্গেও ভিডিও কলে কথা হলো। যদিও কেউ কাছে নেই, তবুও প্রযুক্তির কল্যাণে এই আনন্দটুকু সবার সঙ্গে ভাগ করতে পেরে প্রবাসের একাকীত্ব কিছুটা হলেও ঘুচল।
লেকের পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখা পেলাম মিয়ানমারি দম্পতির। চেহারায় কিছুটা বয়সের ভার লক্ষ্য করা গেলেও চোখেমুখে ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। আন্দাজ মতো তাদের বয়স পঞ্চান্নর বেশি হবে। সোকচন লেকের উৎসব দেখতেই কোরিয়া আসা তাদের। সুন্দর এই মুহূর্তটা ফ্রেমবন্দি করতে আমাকে অনুরোধ জানালেন। বেশ যত্ন নিয়ে তাদের কয়েকটি ছবি তুলে দিলাম। বিনিময়ে পেয়েছি তাদের হাসিমুখ। কৃতজ্ঞতা জানাতে বারবার ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন। অপরিচিত মানুষদের এমন হাসিমুখই প্রবাসে বেঁচে থাকার রসদ।
হাঁটতে হাঁটতে লেকের এক কোণে চোখে পড়ল চিরচেনা এক দৃশ্য। বাসা থেকে রান্না করে আনা দুপুরের খাবার খাচ্ছে দুটি বাংলাদেশি পরিবার একসঙ্গে। চেরি ফুলের বাগানে বসে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার দৃশ্যটি আমাকে মুহূর্তের জন্য চড়ুইভাতির কথা মনে করিয়ে দিল। সিউলের যান্ত্রিকতায় এক টুকরো স্বদেশ খুঁজে পেলাম যেন।
ব্যস্ত প্রবাস জীবনে কাজের ফাঁকে আজকের এই কয়েক ঘণ্টা সময় আমাকে নতুন শক্তি দিয়েছে। চেরি ফুলের এই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য মনে করিয়ে দেয় উপভোগ করতে জানলে জীবন সুন্দর। সিউলের এ বসন্ত আমার স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে।



