বিশুদ্ধ বাতাসের গ্রামেই ফুসফুসের রোগে মৃত্যু বেশি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রচলিত ধারণা বলছে, শহরের তুলনায় গ্রামে বায়ুর মান অনেক বেশি বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর। অথচ দেশে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে শ্বাসতন্ত্রের রোগে মৃত্যুর হার প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩ অনুযায়ী, গ্রামে প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে শূন্য দশমিক ৬৩ জন শ্বাসতন্ত্র রোগে মারা গেছেন। শহরে এই হার শূন্য দশমিক ৩৫।
অ্যাজমা ও নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা। গ্রামে অ্যাজমায় মৃত্যুহার হাজারে শূন্য দশমিক ৩১, শহরে শূন্য দশমিক ১৩। নিউমোনিয়ায় যথাক্রমে শূন্য দশমিক ২৪ ও শূন্য দশমিক ১৫। পরিসংখ্যান থেকে গ্রামে মৃত্যুহার বেশি— এ তথ্য পাওয়া গেলেও কেন বেশি, সেটি উল্লেখ নেই। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মৃত্যুর শীর্ষ কারণগুলোর প্রথম পঁাচটির মধ্যে দুটিই ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ধূমপানের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপানও ফুসফুসের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশুদ্ধ বাতাস থাকলেও গ্রামে বাড়তি ঝুঁকির পেছনে কাজ করতে পারে একাধিক কারণ। এর মধ্যে রয়েছে কাঠ, খড়, গোবরসহ কঠিন জ্বালানি পোড়ানোর ধোঁয়া, ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণ, ধূমপান ও তামাক ব্যবহার, কৃষি এবং অন্য পেশায় ধুলা-ধোঁয়ার সংস্পর্শ এবং রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় দেরি।
এমন প্রেক্ষাপটের মধ্যে অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ফুসফুস দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘এ লাইফটাইম অব লাং হেলথ’। ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রসংক্রান্ত অসুস্থতা বিশ্বব্যাপী অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। তামাক ও নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার ফুসফুসের ক্যানসার, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), যক্ষ্মা, অ্যাজমাসহ বিভিন্ন গুরুতর ফুসফুস রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
দেশের গ্রামীণ পরিবারের একটি বড় অংশ এখনো রান্নায় ব্যবহার করে বায়োমাস বা কঠিন জ্বালানি। কাঠ, খড়, ফসলের অবশিষ্টাংশ, শুকনো পাতা ও গোবর পোড়ানোর সময় সৃষ্টি হয় প্রচুর ধোঁয়া এবং ক্ষতিকর কণা। এর মধ্যে খুব ছোট আকারের ধূলিকণা, কার্বন মনোক্সাইড ও কালো ধোঁয়ার কণা থাকে, যা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে যায়। ফলে প্রতিদিন রান্নার কাজে থাকা নারী ও শিশুরা বেশি সময় ধরে এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসে গুরুতর বায়ুদূষণের শিকার হন।
গণস্বাস্থ্য কমিউনিটি বেইজড ক্যানসার হাসপাতাল ও রিসার্চ সেন্টারের প্রকল্প সমন্বয়কারী এবং স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার বলছিলেন, দীর্ঘদিন এসব ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসে প্রদাহ, দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এর পাশাপাশি হাঁপানি ও দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুস রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। শেষ পরিণতি হতে পারে মৃত্যু।
২০২২ সালে প্রকাশিত ‘গ্রামীণ বাংলাদেশে মানুষের ঘরে বায়ুদূষণের সংস্পর্শ ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা’ শীর্ষক জনসংখ্যাভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের বায়ুদূষণ ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় ধূমপান না করা গ্রামীণ নারী-পুরুষের শরীরে পিএম ২ দশমিক ৫ ও কালো কার্বনের সংস্পর্শ মাপা হয় এবং ফুসফুসের পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, এসব দূষকের সংস্পর্শ যত বেশি, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা তত কম।
সাধারণত রান্নার দায়িত্ব নারীদের ওপর থাকায় তারা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা রান্নাঘরের ধোঁয়ার মধ্যে থাকেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর করা জাতীয় পর্যায়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের ভেতরের রান্নাঘর ব্যবহারকারী নারীদের দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ (সিওপিডি) হওয়ার সম্ভাবনা বাইরের রান্নাঘর ব্যবহারকারীদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি ছিল। গ্রামীণ শ্বাসতন্ত্রের রোগের আরেকটি বড় সমস্যা রোগ শনাক্ত না হওয়া বা দেরিতে হওয়া। আবার সচেতনতার অভাবে দীর্ঘদিনের কাশি বা শ্বাসকষ্টকে অনেক সময় সাধারণ কাশি হিসেবে ধরা হয়। রোগী চিকিৎসকের কাছে আসেন তখন, যখন ফুসফুসের ক্ষতি অনেকটাই এগিয়ে গেছে।
গ্রামাঞ্চলে তামাক ব্যবহারের হারও শহরের তুলনায় বেশি। ২০১৭ সালের গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে অনুযায়ী, গ্রামে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের তামাক ব্যবহার করতেন। শহরে এ হার ছিল ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ। ধূমপানের পাশাপাশি জর্দা, গুল, সাদাপাতা ও অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাকও গ্রামে বেশি ব্যবহৃত হয়। ফলে রান্নার ধোঁয়া ও ঘরের বায়ুদূষণের পাশাপাশি তামাকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শও গ্রামীণ মানুষের শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এর পাশাপাশি গ্রামের মানুষের বড় একটি অংশ কৃষি, নির্মাণ, ইটভাটা, মাটি কাটা, পরিবহন ও বিভিন্ন শ্রমঘন কাজে যুক্ত। এসব কাজে ধুলা, ধোঁয়া ও রাসায়নিকের সংস্পর্শ দীর্ঘ মেয়াদে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
শ্বাসতন্ত্রের রোগ কমাতে শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন। আগামীর সময়কে বললেন, ‘শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগে বয়স্কদের পাশাপাশি শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। গ্রামে শ্বাসতন্ত্রের রোগ কমাতে শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে প্রতিরোধে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।’
দেশে তামাক ব্যবহারজনিত বিভিন্ন রোগে বছরে মারা যায় প্রায় দুই লাখ মানুষ। প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশই ব্যবহার করে তামাক। ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন প্রজন্মের পণ্য আইনের বাইরে থাকায় কিশোর ও তরুণ সমাজের মধ্যে এগুলোর ব্যবহার আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে।
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বললেন, ‘ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রচলিত তামাকপণ্যসহ ই-সিগারেট, ভেপিং এবং অন্যান্য নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার ও বিস্তার রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’





