জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি
দুই বছর পরও প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির খতিয়ান
- গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার এখনো অপেক্ষায় চূড়ান্ত বিচারের
- সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন বহু আহত
- দুর্নীতি দমন ও অর্থনৈতিক স্বস্তি এখনো নাগালের বাইরে সাধারণ মানুষের
- রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে রয়ে গেছে ঘাটতি
- ১ জুলাই-৫ আগস্ট জামায়াত, এনসিপি, ছাত্রদলের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির নানা কর্মসূচি

ফাইল ছবি
ক্যালেন্ডারের পাতায় আবারও ফিরে এসেছে জুলাই। আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের কথা। রাজপথে তখন স্লোগানের গর্জন। দেয়ালে দেয়ালে মুক্তির আকুতি। নিত্যই বুলেট ছুটে যাওয়ার তীক্ষ্ন শিসের বা সাউন্ড গ্রেনেডের কানে তালা লাগানো বিকট শব্দ। আর বাতাসে ভাসছিল তাজা রক্তের গন্ধ। দেশের জন্য বুক পেতে দিয়েছিল শত তরুণ প্রাণ। স্মৃতির পাতায় এখনো তাজা রক্তঝরা সেই দিনগুলো। দেখতে দেখতে কেটে গেল দুটি বছর। আজ বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির আনুষ্ঠানিক স্মরণ।
২০২৪ সালের ১ জুলাই যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা আজ ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। দীর্ঘ ৩৬ দিনের সেই রক্তঝরা লড়াই দেশের রাজনীতিতে জন্ম দিয়েছিল এক নতুন অধ্যায়ের। যদিও দুই বছর পরও কান্না থামেনি স্বজনহারা মানুষের। এখনো মুছেনি আহতদের ক্ষতচিহ্ন। পাশাপাশি বড় বেশি করে সামনে আসছে রূড় এক বাস্তবতা—যে স্বপ্নের জন্য অকাতরে প্রাণ দিল তরুণরা, তার কতটুকু হলো পূরণ? প্রাপ্তির আনন্দ আর অপূর্ণতার বেদনা নিয়ে দেশ আজ হিসাব কষছে—যে স্বপ্নের জন্য রাজপথ রক্তে লাল হয়েছিল, তার কতটুকু সত্য হলো আজ?
২০২৪ সালের ১ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের লড়াই। চাকরিতে বৈষম্য দূরের সেই দাবি অল্প সময়ের মধ্যেই রূপ নেয় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’। তিন দিনের সাধারণ কর্মসূচি দিয়ে শুরু হয়েছিল যা, তা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেমে আসেন রাজপথে।
ধীরে ধীরে এটি শুধু কোটার দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও পেশাজীবীরা যুক্ত হওয়ায় পরিণত হয় এক সর্বজনীন গণঅভ্যুত্থানে। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজপথ। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, শত শত প্রাণহানি, বিপুল ক্ষয়ক্ষতি আর সহিংসতার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। চূড়ান্ত পরিণতিতে পরের মাসের পাঁচ তারিখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এনেছে বড় এক পরিবর্তন। শুরু হয়েছিল রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও প্রশাসনের খোলনলচে বদলে ফেলার আলোচনা। তরুণ প্রজন্মের এই রাজনৈতিক সচেতনতা ও নাগরিক অধিকারের লড়াইকে বিশ্লেষকরা দেখেছেন পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রতীক হিসেবে।
তবে অর্জনের পাশাপাশি অপূর্ণ প্রত্যাশার হিসাবও কম নয়। সাধারণ মানুষের মনে এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে বেশকিছু মৌলিক প্রশ্ন। সেগুলো হলো- আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞের প্রকৃত বিচার কি সুনিশ্চিত হয়েছে? দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটুকু? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা কি ফিরে এসেছে পুরোপুরি?
বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হলেও জনগণের মূল প্রত্যাশাগুলো এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন, রাজনৈতিক সহনশীলতা, কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এমন প্রেক্ষাপটে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে শহীদদের স্মরণ, আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্দোলনের মূল চেতনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার উচ্চারিত হচ্ছে নতুন করে।
বিভিন্ন কর্মসূচি: দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। শহীদদের স্মরণ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক মঞ্চগুলো এক হয়েছে। আয়োজন করা হয়েছে আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, পদযাত্রা ও দোয়া মাহফিলের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণ।
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল পৃথকভাবে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ১ জুলাই থেকে শুরু হয়ে এসব কর্মসূচি চলবে ৫ আগস্ট পর্যন্ত। এর মধ্যে রয়েছে- শহীদ ও আহত পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময়, কবর জিয়ারত, আলোচনা সভা, দোয়া, পদযাত্রা, গণমিছিল, সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি। ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে বড় পরিসরের সমাবেশ ও মিছিলেরও দেওয়া হয়েছে ঘোষণা।




