পছন্দের তালিকায় প্রথমে ‘যমুনা’
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের খোঁজে...
- স্থান নির্বাচনে ৯ সদস্যের কমিটি
- নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রাধান্য
- আলোচনায় আগারগাঁও, যমুনা ও সুগন্ধা

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা
প্রধানমন্ত্রী পদে শপথের পাঁচ মাস পরও সরকারি বাসভবনে উঠতে পারেননি তারেক রহমান। অবশ্য দেশে এই মুহূর্তে সরকারপ্রধানের নেই কোনো সরকারি বাসভবনও। বিষয়টি এত দিন আলোচনায়ও ছিল না। গত রবিবার হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের জায়গা খুঁজতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যের কমিটি করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। বাসভবনের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করে কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি স্থায়ী বাসস্থানের জন্য পছন্দের প্রথমেই রয়েছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’।
বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে রাজি হননি সরকারের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা। তবে নাম প্রকাশে অনাগ্রহী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পদস্থ এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, ‘এই মুহূর্তে সরকারের প্রথম পছন্দ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা। সবকিছু মিলে যমুনার আশপাশে আর সুরক্ষিতভাবে কীভাবে সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করা যায়, সেটি নিয়েই কমিটি কাজ করবে। যমুনাকে আরও যুগোপযোগী ও ভূমিকম্প-প্রতিরোধী করে নির্মাণ করা হতে পারে। এ কারণেই কমিটিতে টেকনিক্যাল পারসনদের (কারিগরি দক্ষ ব্যক্তি) প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।’
গত রবিবার জারি করা অফিস আদেশে বলা হয়— প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন নির্মাণের লক্ষ্যে আনুষঙ্গিক সুবিধাসহ স্থান নির্বাচনের জন্য কমিটি গঠন করা হলো। এই কমিটির সদস্যরা হলেন— স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি, বুয়েটের পুরকৌশল ও স্থাপত্য বিভাগের একজন করে অধ্যাপক, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম-পিএনডি জোন) আলমগীর খান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা-২), এসএসএফ এবং ডিএমপির প্রতিনিধি। সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (গণপূর্ত ডিজাইন জোন) রফিকুল ইসলাম।
কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, ‘কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের জন্য নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করবে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের প্রয়োজনীয় সুবিধা নির্ধারণ করবে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন উপযোগী করা সম্ভব কি না— সে বিষয়ে মতামত দেবে এবং কমিটি ৭ (সাত) কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করবে। এ ছাড়া কমিটি প্রয়োজনে অভিজ্ঞ সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে।’
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর স্থায়ী সরকারি বাসভবন নির্মাণে গৃহায়ন ও পূর্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের কমিটি রাজধানীর তিনটি জায়গা প্রস্তাব করেছিল। সেগুলো হলো— ক. আগারগাঁওয়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কম্পাউন্ডসহ তৎসংলগ্ন এলাকার প্রায় ১৬ একর জমি। খ. রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’সহ তৎসংলগ্ন এলাকার ১৯ দশমিক ২৯ একর জমি এবং গ. ফরেন সার্ভিস ইনস্টিটিউটের কাছের ‘সুগন্ধা’, ৩৫ হেয়ার রোড এবং তৎসংলগ্ন এলাকার সাড়ে ১৪ একর জমি। জায়গাগুলোর সুবিধা-অসুবিধা উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কোথায় হবে— সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা জানালেন, প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে রূপান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। তবে যমুনা শহরের মধ্যবর্তী জায়গায়। এখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর চলাচল নগরবাসীর জন্য দুর্ভোগ ডেকে আনবে। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দূরত্বও বেশ। যাতায়াতে যানজট তীব্র আকার নিতে পারে। এ ছাড়া মিন্টো রোডে বাংলো আছে। দুটি প্লট একত্র করেও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে যানজটের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। তাই দ্বিতীয় বিকল্প শেরেবাংলা নগরের কোথাও করাই সবচেয়ে উপযোগী। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্পিকারের বাসভবন গণভবনের কাছাকাছি। এখান থেকে প্রধানমন্ত্রী চলাচল করলে রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় তার খুব একটা প্রভাব পড়বে না। পরে বিষয়টি উপদেষ্টা পরিষদের সভা পর্যন্ত গড়ায়। সেখানে নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কোথায় হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর আবাসনের বিষয়ে যা রয়েছে আইনে: প্রধানমন্ত্রীর আবাসনসংক্রান্ত বিধানে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি সরকারি বাসভবন থাকবে, যা সরকারি ব্যয়ে সজ্জিত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। যদি প্রধানমন্ত্রী নিজের বাড়িতে বা সরকারি বাসভবন ছাড়া অন্য কোনো বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তিনি প্রতি মাসে এক লাখ টাকা বাড়িভাড়া পাবেন। সেই বাড়িটি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের মর্যাদার উপযোগী করে সজ্জিত করা হবে এবং এর ব্যয় বহন করবে সরকার। সেখানেও বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন ইত্যাদি সরবরাহের সব ব্যয় সরকার বহন করবে।
প্রধানমন্ত্রী যদি নিজের বাড়ি বা সরকারি বাসভবন ছাড়া অন্য কোনো বাড়িতে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তিনি প্রতি বছর ওই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাড়িভাড়া ভাতার তিন মাসের সমপরিমাণ অর্থ পাবেন। যদি প্রধানমন্ত্রী নিজের বাড়িতে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই বাড়িতে গার্ডদের থাকার জন্য নির্ধারিত কোনো শেড না থাকে, তবে সরকার সেখানে একটি অস্থায়ী গার্ড শেড নির্মাণ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তার পদত্যাগের পর পরবর্তী এক মাস পর্যন্ত সরকারি বাসভবনে বাস করতে পারবেন। এ সময়ও তার ওপর কোনো ব্যয় চাপানো হবে না।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছিল গণভবন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। সেদিন বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এর এক মাস পর ৫ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার সিদ্ধান্ত হয়। পিলখানা হত্যাকাণ্ড, গুম-খুন-আয়নাঘর, ভোট ডাকাতিসহ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলের সব ঘটনাই ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে এই জাদুঘরে উপস্থাপন করা হবে বলে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে নির্মাণ করা হয় গণভবন। তবে তিনি সেখানে বসবাস করেননি। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে গণভবনকে সংস্কার করে এটিকে ‘করতোয়া’ নাম দিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন করা হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ার পর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। তখন তিনি গণভবন নাম পুনর্বহাল করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে সেখানে বসবাস করেন। তবে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কখনো গণভবনে থাকেননি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর ফের সংস্কার করা হয় গণভবন। ২০১০ সালের মার্চে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার সেখানে ওঠেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের দুপুর পর্যন্ত তিনি ছিলেন এ ভবনেই।




