৭২ হাজার লিটার তেল চুরি করে ফিরছেন চেয়ারে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জ্বালানি তেল বিপণনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় দীর্ঘদিন ধরেই হয় তেল চুরি। তবে রহস্যময় কারণে সেসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয় না কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ফলে একই ধরনের ঘটনা ঘটে বারবার। এবারও পদ্মা অয়েল পিএলসির প্রায় ১ কোটি টাকার তেল চুরির প্রমাণ মিললেও দায়সারাভাবে কয়েকজনকে বদলি আর সাময়িক বরখাস্ত ছাড়া নেওয়া হয়নি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। উল্টো অভিযুক্তরা যাতে আবার স্বপদে ফিরতে পারেন, সেই ‘অপচেষ্টা’ চলছে বলেও অভিযোগ।
পদ্মা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, দেশে তীব্র জ্বালানি সংকটের সময় গত ১১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে উড়োজাহাজের জ্বালানি তেল (জেট এ-১) লোড করে চারটি ট্যাংক লরি রওনা হয় ঢাকার কুর্মিটোলা অ্যাভিয়েশন ডিপোর (কেএডি) উদ্দেশে। লরিগুলোতে ছিল প্রায় ৮১ লাখ টাকা দামের ৭২ হাজার ১৩২ লিটার জেট ফুয়েল। অভিযোগ ওঠে, ওই তেল কেএডিতে না নিয়ে বিক্রি করা হয়েছে বাইরে। চুরি হওয়া জ্বালানি উচ্চমূল্যের পণ্য হওয়া সত্ত্বেও তা সাধারণ কেরোসিন কিংবা পেট্রল, অকটেনের সঙ্গে বাজারে বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন পদ্মা অয়েলের কয়েকজন কর্মকর্তা।
ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে বিপিসি। তদন্তে প্রমাণিতও হয় তেল চুরির বিষয়টি। গত ১৫ এপ্রিল পদ্মা অয়েলের অ্যাভিয়েশন ডিপোর ইনচার্জ ও সাবেক ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হক, চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা ছামির উদ্দিন, চেকার আকতার কামাল এবং সিকিউরিটি বিভাগের নায়েক শওকত কাজীকে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়। পাশাপাশি বদলি করা হয় কয়েকজনকে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বদলি, সাময়িক বরখাস্ত এগুলো তেমন কোনো শাস্তির মধ্যে পড়ে না। এগুলো অনেকটা সতর্ক করা বা ধমক দেওয়ার মতো। কঠোর শাস্তি হয় না বলেই ঘটনাগুলো বারবার ঘটে।
এদিকে, তেল চুরির হোতা হিসেবে চিহ্নিত সাইদুল হক পুরো ঘটনা অস্বীকার করার পাশাপাশি তদন্ত কমিটিকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্যাংক লরিগুলো কেএডিতে প্রবেশ করেছে বলে কমিটিকে মিথ্যা তথ্য দেন সাইদুল হক। তবে সিসিটিভি ফুটেজে ট্যাংক লরিগুলো কেএডিতে প্রবেশ না করার সত্যতা মেলে। চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে সেখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী মানিক চন্দ্র রায় এবং সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. শওকত হোসেন কাজীকে গেট এন্ট্রি রেজিস্টারের তথ্য জালিয়াতির নির্দেশ দেন তিনি।
গত ১২ এপ্রিল জমা দেওয়া তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সাইদুল হকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলে তিন দিন পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কারণ দর্শানোর নোটিসের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে একাধিক চিঠি। গত ৮ জুন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অভিযোগপত্রে সাইদুল হককে তেল চুরির মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে তেল চুরির দায়ে তাকে অভিযুক্ত করে তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দণ্ডের কথা বলা হয়। এগুলো হলো— নিম্ন পদে বা নিম্ন বেতন স্কেলে অবনমিতকরণ, আর্থিক ক্ষতির অংশবিশেষ বা সম্পূর্ণ আদায় করা, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অপসারণ এবং বরখাস্ত।
এর যেকোনো একটি দণ্ড কেন প্রয়োগ করা হবে না, তা সাইদুল হকের কাছে জানতে চেয়ে ১০ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। গত ১৬ জুন কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাবে সাইদুল হক তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি তদন্ত কমিটিকে ‘কথিত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
একই সঙ্গে স্বপদে ফিরতে গত ২৬ জুলাই উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। আদালত তার বরখাস্ত ও বদলি আদেশ স্থগিত করেছেন উল্লেখ করে বিপিসি এবং পদ্মা অয়েলকে চিঠিও দিয়েছেন তিনি। তবে পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ ওই রিটের বিপক্ষে কোনো আপিল করেনি।
সাইদুল হক এখন চট্টগ্রামে সংযুক্ত আছেন। ব্যবস্থাপক পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর তাকে এর চেয়ে ওপরের পদ উপ-মহাব্যবস্থাপকের কক্ষ ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাইদুলের পাশাপাশি জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে।
জানতে চাইলে পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাইদুল হককে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি দুদকেও চিঠি পাঠােনা হয়েছে। আরেকটি তদন্ত চলছে। নিয়ম মেনে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে পদ্মা অয়েলের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, তেল চুরির ওই ঘটনা তদন্তে কিছুটা গড়িমসির পাশাপাশি সাময়িক বরখাস্ত করতেও কর্তৃপক্ষ কালক্ষেপণ করে। পরে বিপিসি চেয়ারম্যানের নির্দেশে তা করা হয়।
এর আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ইস্টার্ন ব্যাংকে ‘স্যালারি সার্টিফিকেট’ জাল করার অভিযোগে সাইদুলকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় পদ্মা অয়েল।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে সাইদুল হক আগামীর সময়ের কাছে দাবি করেছেন, তিনি কোনোভাবেই তেল চুরির সঙ্গে জড়িত নন, ষড়যন্ত্রের শিকার। সঠিক তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। তার দাবি, ‘ঘটনার সময় আমি অফিসে ছিলাম না। তখন দায়িত্বরত দুজন কর্মকর্তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। তারাই আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। তদন্ত কমিটি নিয়েও আপত্তি আছে। তারা তেল চুরির তথ্য যাচাইয়ের সময় আমাকে কিংবা অন্য কোনো স্টাফকে সঙ্গে রাখেননি।’
প্রকৃতপক্ষে যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি দাবি করে সাইদুল হক জানালেন, দুজনকে দায়সারা বদলি করা হলেও তারা এখনো আগের স্থানেই রয়েছেন।





