এবার বাড়ছে বিদ্যুতের দাম

প্রতীকী ছবি
সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছিল এপ্রিলে। যার জেরে বাড়ানো হয়েছিল পরিবহন ভাড়া। জুনের প্রথম দিন আরেক দফায় বাড়ে ডিজেল ছাড়া অন্যসব তেলের দাম। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই জানা গেল, এবার বাড়তে যাচ্ছে বিদ্যুতের দামও, যা চলতি মাস থেকেই কার্যকর হতে পারে। এত দামবৃদ্ধি, স্বাভাবিকভাবেই বাড়াবে জীবনযাত্রার ব্যয়, যা নিয়ে এরই মধ্যে শঙ্কায় সাধারণ মানুষ।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা উঠলেও সরকারের পরিকল্পনায় তা ছিল না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে উঠলে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে সরকার।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, এমন দাবি করা হয়েছে সরকারের তরফে। আর বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ, উচ্চমূল্যের জ্বালানি আমদানিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং পাহাড়সম ভর্তুকির চাপ সামলানো। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
অবশ্য বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ খাতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, অসম চুক্তি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অব্যবস্থাপনাকে দায় দেন খাতসংশ্লিষ্ট অনেকে। তাদের মতে, এই পদক্ষেপে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমলেও বাড়বে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে, পাল্লা দিয়ে বাড়বে উৎপাদন খরচও। প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে নিত্যপণ্যের ওপর। ফলে মূল্যস্ফীতির এই বাজারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে পড়তে পারে আরও কঠিন।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলছিলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম ঘাটতি। এই ঘাটতি ভিত্তি করে মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। আগে বের করতে হবে ঘাটতির প্রকৃত কারণ, ঠিক করতে হবে বৈধতা। বাদ দিতে হবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়। এরপর যদি বাস্তবেই থাকে ঘাটতি, তবেই আসতে পারে বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি।’
গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছিলেন, মে মাসে দাম বাড়েনি। জুনে বৈশ্বিক বাজারের বাস্তবতা ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে এলে দেশের বাজারেও দ্রুত মূল্য সমন্বয় করে সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
বাড়ছে বিদ্যুতের দাম: পাইকারি ও গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি হয়েছে। এখন তা পর্যালোচনার কাজ করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গতকাল বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘কমিশনের কাজ প্রায় শেষের দিকে। আশা করছি, দ্রুত বিদ্যুতের নতুন দর ঘোষণা করা হবে।’
কী পরিমাণ দাম বাড়তে পারে এবং কবে নাগাদ ঘোষণা আসবে, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কমিশন চেয়ারম্যান।
একাধিক কর্মকর্তা আভাস দিয়েছেন, পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৯ থেকে ২০ শতাংশের মতো, আর গ্রাহকপর্যায়ে ৮ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। চলতি সপ্তাহেই ঘোষণা হতে পারে নতুন দর।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা (২১ থেকে ২৯ শতাংশ) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। পিডিবি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ পড়বে ১২ টাকা ৯১ পয়সা। কিন্তু বর্তমান পাইকারি দরে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা।
পিডিবি বলছে, ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা দাম বাড়ানো হলে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। আর ১ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ালে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এতে করে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা (১৭ শতাংশ) বৃদ্ধি হলে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৩২৯ কোটি, আর ১ টাকা ৫০ পয়সা (২১ শতাংশ) হারে দাম বাড়লে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
লোকসানের যুক্তি তুলে ধরে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোও মূল্যবৃদ্ধির আলাদা প্রস্তাব দিয়েছে।
উৎপাদন খরচ ও ভর্তুকি বাড়ছেই: পিডিবির তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল ২ দশমিক ১৩ টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ১৬ টাকা হয়। এরপর ২০২২ সালে হয় সাড়ে ৮ টাকার মতো। বর্তমানে সেই খরচ বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৩ টাকা। প্রতি ইউনিটে ঘাটতি ৬ টাকার কাছাকাছি।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের ভর্তুকি বেড়েই চলেছে। সেই চাপ সামলাতে আওয়ামী লীগ সরকারও বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে দফায় দফায় বাড়িয়েছে বিদ্যুতের দাম।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে মোট বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে ৩২ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। হাতে রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। এর বাইরে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে ১৫ হাজার ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা হতে পারে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর মধ্যে সম্প্রতি তরল জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিজনিত অতিরিক্ত ঘাটতি ধরা হয়েছে ১১ হাজার ২৬৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
ভোক্তাদের বিরোধিতা: গত ২০ ও ২১ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক নেতা, ভোক্তা অধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, ভুল পরিকল্পনা ও অপচয়ের বোঝা এখন সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপানো হচ্ছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, শিল্প ও রপ্তানি খাত এমনিতেই নানা চাপে রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ালে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়লে মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। রাজধানীর মিরপুর-১ নাম্বারের বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলছিলেন, ‘যেভাবে সবকিছুর দাম বাড়ছে, সে অনুযায়ী বেতন তো বাড়ছে না। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চলবে কীভাবে!’
‘মানলাম সরকার না হয় বাধ্য হয়ে দাম বাড়াচ্ছে। কিন্তু যাদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এই ব্যয় বাড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সব দায় কি সাধারণ মানুষের? খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।




