তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দেশের দেড় কোটি মানুষ

বাংলাদেশের দেড় কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে এ পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা। এ সময় তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখের বেশি হতে পারে। এর মধ্যে জরুরি অবস্থার মধ্যে পড়বেন ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ।
বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশনের (আইপিসি) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বিশ্লেষণ-২০২৬’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে আইপিসি বলছে, ২০২৫ সালেও খাদ্য পরিস্থিতি প্রায় একই রকম ছিল। ওই সময় মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত উচ্চমাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ।
বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) পৃষ্ঠপোষকতায় এ প্রতিবেদন তৈরিতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিসহ (ডব্লিউএফপি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। এ ব্যাপারে আজ ঢাকায় একটি উচ্চপর্যায়ের প্রচারমূলক কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার বর্তমান পরিস্থিতি: প্রতিবেদনে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার পাঁচটি পর্যায় বা ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে খাদ্য নিরাপত্তা স্বাভাবিক, দ্বিতীয় ধাপে চাপে থাকা, তৃতীয় ধাপে সংকট, চতুর্থ ধাপে জরুরি অবস্থা ও পঞ্চম ধাপে দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করা হয়। এ বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়কে বর্তমান পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীন উচ্চমাত্রার (আইপিসি পর্যায় ৩ বা তার বেশি) সম্মুখীন হচ্ছে। যার মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ আইপিসি-৪ ধাপে (জরুরি অবস্থা) রয়েছে। তাদের জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন— মন্তব্য করা হয় প্রতিবেদনে।
এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘কাল (আজ) খাদ্যমন্ত্রী ও খাদ্য সচিব আইপিসি প্রতিবেদনের ওপর আনুষ্ঠানিক কথা বলবেন। তারা এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেবেন।’
সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখ হওয়ার আশঙ্কা, জরুরি অবস্থার মধ্যে পড়বেন ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ
আইপিসি দেশের ৩৬ জেলা ও চারটি বিশেষ এলাকাসহ মোট ৪০টি ইউনিটের ৯ কোটি ৯২ লাখের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। চারটি বিশেষ এলাকার মধ্যে রয়েছে— কক্সবাজার ও ভাসানচরে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক এবং কক্সবাজারে স্থানীয় ও অস্থানীয় বাসিন্দা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে (মে-আগস্ট) খাদ্য নিরাপত্তার স্বাভাবিক (ধাপ-১) অবস্থায় আছেন ৪৯ শতাংশ মানুষ। চাপে আছেন ৩৬ শতাংশ, যা সংখ্যার হিসাবে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ। উচ্চমাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় (জরুরি অবস্থাসহ) আছেন ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি মানুষ। তবে এ বছর কোনো জেলায় ধাপ-৫ অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ দেখা যায়নি, দেখা যাওয়ার আশঙ্কাও নেই।
১৪ জেলার মানুষ খাদ্যসংকটে, শীর্ষে বান্দরবান: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্বত্য জেলা বান্দরবানে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সর্বোচ্চ মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যার জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ আইপিসি ধাপ-৩ বা তার বেশি এবং ৫ শতাংশ আইপিসিপি ধাপ-৪ অর্থাৎ জরুরি পর্যায়ে রয়েছে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও সুনামগঞ্জের ৩০ শতাংশ মানুষ উচ্চমাত্রার (ধাপ-৩ বা তার বেশি) খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। একই অবস্থা কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীরও। বরগুনা, ভোলা, কুড়িগ্রাম ও কক্সবাজারের স্থানীয় ও অস্থানীয় ২৫ শতাংশ জনসংখ্যা আইপিসি ধাপ-৩ বা তার চেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা রয়েছে।
এই এলাকাগুলো ঘন ঘন জলবায়ুজনিত দুর্যোগের পাশাপাশি দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, পানির নিরাপত্তাহীনতা, দুর্বল সামাজিক অবকাঠামো, জুমচাষ থেকে কম কৃষি উৎপাদন এবং উচ্চ দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে— এমন মন্তব্য করে আইপিসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য ভোগের ঘাটতি পূরণ এবং জীবিকা রক্ষায় তাদের জরুরি মানবিক সহায়তা এবং কৃষি ও অকৃষি উভয় ধরনের জীবিকা সহায়তা প্রয়োজন।
সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বরে আরও খারাপের আশঙ্কা: আগামী সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বরে দেশের খাদ্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আইপিসি। এ সময়ে উচ্চমাত্রার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাবে। যার মধ্যে জরুরি অবস্থার (ধাপ-৪) মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৭ লাখ ৮৭ হাজার হতে পারে। আইপিসি ধাপ-৩-এ থাকা এলাকার সংখ্যা বাড়তে পারে। বাগেরহাট, বরিশাল, ঝালকাঠি ও নোয়াখালী ধাপ-২ থেকে সংকট (ধাপ-৩) অবস্থায় অবনতি হতে পারে।
সংকটের কারণ: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্ব হাওর এলাকার গত এপ্রিলের বন্যায় আগাম ফসল কাটতে হয়েছে। এতে বোরো ধানের ১১ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি ক্রমবর্ধমান চাপ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে ত্বরান্বিত করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া, প্রবাসী আয় হ্রাসের সম্ভাবনা এবং ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংকট। এসব সংকট খাদ্যপ্রাপ্তি সীমিত করেছে। এ ছাড়া জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এখনো আংশিকভাবে কার্যকর রয়েছে। সরকার স্থানীয় পর্যায়ের শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি সেবা দেওয়া, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবিকা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে।
সমাধানের ৭ সুপারিশ: পরিস্থিতি উত্তরণে সাতটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— আইপিসি পর্যায়-৩ বা তার বেশি অবস্থানে থাকা জনসংখ্যার ওপর নজর রেখে মানবিক খাদ্যসহায়তা (নগদ বা পণ্য হিসেবে) বাড়াতে হবে। এ ছাড়া জীবিকা পুনরুদ্ধার ও সক্ষমতা বাড়ানো, কৃষি ও গবাদি পশুর সহায়তা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও পুষ্টিসেবা বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞ অভিমত: অর্থনীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেছেন, আইপিসির প্রতিবেদনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এটি খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা দেয়।
বর্তমান খাদ্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়— এমন মন্তব্য করে সেলিম রায়হান বললেন, দেশে মোট খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা এবং জলবায়ুর ঝুঁকি আগামী মাসগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তার সংকট আরও গভীর করতে পারে। শুধু খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি নয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ও কার্যকারিতা বাড়ানো এবং বাজারে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে— যোগ করলেন তিনি।




