৬ ঘণ্টায় ঢাকায় ঝরল ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি, চলবে আরও দুইদিন

শনিবার রাত ও রবিবার সকালে টানা বৃষ্টির কারণে রাজধানীর অলি-গলি ডুবে যায়। ফলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে নগরবাসীকে। ছবিটি রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া এলাকা থেকে তুলেছেন শামীম-উস-সালেহীন
টানা ভারী বর্ষণে কার্যত পানির নিচে চলে গেছে রাজধানী ঢাকা। গতকাল শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি আজ রবিবার দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। ফলে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই চরম দুর্ভোগে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় প্রায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুধু রবিবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৮২ মিলিমিটার। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টাও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
রাজধানীর মিরপুর, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, মালিবাগ, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া ডেমরা, পুরান ঢাকা, শান্তিনগর, গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন ও কাকরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুপানি জমে যায়। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতেও পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সকালে অফিসে যাওয়ার পথে চরম ভোগান্তির কথা জানিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আশরাফুল আলম বলেছেন, সকাল আটটার দিকে বাসা থেকে বের হয়েছি। কিন্তু রাস্তায় হাঁটুপানি থাকায় ঠিকমতো কোনো যানবাহন পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও বাস না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভিজেই অফিসের উদ্দেশে রওনা দিতে হয়েছে।
শনিরআখড়া থেকে মতিঝিলগামী আরেক চাকরিজীবী নুসরাত জাহান বলেছেন, বৃষ্টি হলে ঢাকায় জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে পানি জমে যায়, তখন অফিসে সময়মতো পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। আজও রিকশা ও সিএনজির ভাড়া স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এ ছাড়া অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে প্রধান সড়কে এসেছি।
এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।
প্রতি বর্ষায় একই চিত্র দেখা গেলেও কার্যকর পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ যেন ক্রমেই বাড়ছে। নগর পরিকল্পনার দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার কারণে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই অচল হয়ে পড়ছে দেশের রাজধানী।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাজধানীতে বারবার জলাবদ্ধতার পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও দায়ী।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, ঢাকার প্রাকৃতিক খাল, জলাধার ও নিচু এলাকাগুলো ক্রমাগত ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যাওয়ার সুযোগ কমে গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।
এ পরিকল্পনাবিদের মতে, শুধু ড্রেন বা পাম্প বসিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানীকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, খাল পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দেশ জুড়ে আগামী পাঁচ দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে বিভিন্ন বিভাগে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। তাই অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে।
আজ রবিবার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।






