প্রধানমন্ত্রীর নিউ ইয়র্ক সফর
বিশ্বমঞ্চে নতুন পরিচয়, চ্যালেঞ্জ সম্পর্ক ধরে রাখার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগদান শেষে নিউ ইয়র্ক থেকে গতকাল রবিবার সকালে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর এ সফর ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। চার দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে প্রধানমন্ত্রী একাধিক দেশের নেতা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দিয়েছেন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ভাষণ। সফরটি ছিল ব্যস্ত। কর্মসূচিও ছিল ঘনবিন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ। এর বাইরে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সভা ও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন তিনি।
এ সফরের অন্যতম ইতিবাচক দিক ছিল ছোট বহর। অল্পসংখ্যক সফরসঙ্গী নিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ে অনেক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় সফরের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিকল্পিত ও সীমিত আয়োজন আন্তর্জাতিক মহলেও ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে। এতে সম্পদের সাশ্রয় এবং কাজের প্রতি মনোযোগের বিষয়টি সামনে আসে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, ‘এ সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রধানমন্ত্রীর নতুন পরিচিতি তৈরি হওয়া।’ তার মতে, বড় একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে নতুন পরিচয়ে বিশ্বে তুলে ধরার প্রাথমিক কাজটি এ সফরের মাধ্যমে হয়েছে।
এ মূল্যায়নের সঙ্গে সফরের কর্মসূচিরও মিল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শুধু জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দেননি। তিনি বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গেও বলেছেন কথা। ফলে সফরটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কোম্পানির প্রধানদের সঙ্গে বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন মুন্সী ফয়েজ আহমেদ। তার মতে, ‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিতে হতে পারে। এখন যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, সেটি ভবিষ্যতে কাজে লাগানো সম্ভব। তবে এর জন্য দেশের অভ্যন্তরে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে এসব সুযোগ বাস্তব কাজে রূপ দেওয়া যায়।’
বড় অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রধানমন্ত্রীর নতুন পরিচিতি -মুন্সী ফয়েজ আহমেদ
রোহিঙ্গা ইস্যুতে গুরুত্ব: সফরের বড় দিক ছিল রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এ সংকটের বোঝা বহন করছে। তাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণেও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংকটের উৎস মিয়ানমারে। তাই সমাধানও মিয়ানমারকেই করতে হবে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা চেয়েছেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলীও রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, ‘প্রথমবারের ভাষণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ভালো করেছেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনি শক্তিশালী বক্তব্য দিয়েছেন।’
সাকিব আলীর মতে, ‘আগামী দিনে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে। ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়মিতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।’
এ সফরে বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানও হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু সাধারণ পরিষদের ভাষণে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সামনে বাংলাদেশের উদ্বেগ তুলে ধরার আরও একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভাষণে কী বার্তা: প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাংলা ভাষার ব্যবহার। তিনি সম্পূর্ণ বাংলায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন। এতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষায় বিশ্বনেতাদের সামনে দেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, বিশ্বশান্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয় উঠে এসেছে। দেশ পুনর্গঠনে সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশলের কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। বিশ্বশান্তির ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী সংলাপ ও কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায়, পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের সুরক্ষার কথা বলেছেন। এগুলো বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বিশেষ করে যুদ্ধ, সংঘাত ও বিভক্তির সময়ে শান্তি ও মানবিকতার কথা বলার রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী মনে করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যে মানবিক বিশ্বের কথা বলেছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বের বাস্তবতায় তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের নেতা মানবিক বিশ্বের কথা বলছেন— এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।’
সম্পর্ক বাংলাদেশের পুনর্গঠনে কাজে লাগাতে হবে -সাকিব আলী
আরও চমকপ্রদ হতে পারত কি: তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ নিয়ে একটি প্রশ্ন কেউ কেউ তুলেছেন। বৈশ্বিক মঞ্চে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর পাশাপাশি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা যেত কি না। ভাষণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনীতি, রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ুর মতো বিষয় এসেছে। কিন্তু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে একটি দেশ তার জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তর সংকট নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরতে পারে। বিশ্ব জুড়ে বাড়ছে যুদ্ধ ও সংঘাত। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সৃষ্টি হচ্ছে বিভাজন। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে রয়েছে বৈষম্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির সুবিধা নিয়েও বৈশ্বিক বৈষম্যের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ের কয়েকটি উল্লেখ করেছেন। তবে সুযোগ ছিল ভাষণকে আরও বৈশ্বিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান থেকে বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও স্পষ্ট কিছু প্রস্তাব দেওয়া গেলে ভাষণটি আরও আলাদা মাত্রা পেতে পারত বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। বিশেষ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধ বন্ধ, জলবায়ু ন্যায়বিচার, প্রযুক্তির সমান সুযোগ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ ও অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার— এসব বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব ছিল।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে ধারাবাহিকতা: প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের আগের অবস্থান বজায় রাখা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায়ও বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট রাখা হয়েছে।
মুন্সী ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, ‘আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করাও সফরের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এর মধ্যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নে বাংলাদেশের আগের অবস্থান ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের অবস্থান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা তুলে ধরে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট করে।’
সফরের আসল পরীক্ষা এখন: নিউ ইয়র্ক সফরে হয়েছে বৈঠক। তৈরি হয়েছে নতুন সম্পর্ক। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে হয়েছে আলোচনা। বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে হয়েছে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এসব অর্জনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে এখন।
মুন্সী ফয়েজ আহমেদও বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সফরে প্রধানমন্ত্রী যে সুযোগ তৈরি করেছেন, তা বাংলাদেশের পুনর্গঠনে কাজে লাগাতে হবে। অর্থাৎ সফরের পরবর্তী পদক্ষেপই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
একই কথা প্রযোজ্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক থেকে যদি বাস্তব বিনিয়োগ আসে, তাহলে সফরের অর্থনৈতিক ফল পাওয়া যাবে। জনশক্তি রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হলে তার সুফল পাওয়া যাবে। জ্বালানি নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়লে তা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। শুধু আন্তর্জাতিক সমর্থন নয়, প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
সাকিব আলী মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীকে শুধু জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়া বা বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করলে সফরের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। তিনি সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সেই প্রতিনিধিত্ব থেকে বাংলাদেশের জন্য কী অর্জন হলো, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নিউ ইয়র্ক সফরকে বাংলাদেশের জন্য একটি সূচনাপর্ব বলা যায়। এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।



