বিশ্বস্ত কাউকে চায় বিএনপি

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন
বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে বসাতে চায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এক্ষেত্রে দলটি আমলা অথবা শিক্ষকের বদলে বেছে নিতে পারে দলের অভিজ্ঞ কোনো রাজনীতিককেই। ক্ষমতাসীন দলটির নেতাদের পর্যবেক্ষণ— রাজনৈতিক সংকটময় মুহূর্তে চাপ নিতে পারেন, এমন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির বাইরে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করে অতীতে তারা পড়েছিলেন সংকটের মুখে। দলের নেতারা উদাহরণ টানলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের। তারা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে বিএনপির নিয়োগ করা রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন বিদায় নিয়েছিলেন চাপের মুখে। এতে করে পথ প্রশস্ত হয়েছিল ওয়ান ইলেভেনের। যার ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ এক রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে যায় বিএনপি। অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এবার অত্যন্ত সতর্ক বিএনপি।
দলটির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব পর্যায়ে অভিমত, যিনি দলের প্রতি বিশ্বস্ত, দলের নীতি-আদর্শ-দর্শন ধারণ করেন, রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সংকটে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম— রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন ব্যক্তিকেই বেছে নেওয়া উচিত। তারা বলছেন, সবকিছু বিচার-বিবেচনা করে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই সে সিদ্ধান্ত নেবেন।
পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গতকাল শুক্রবার পদত্যাগ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির এই হঠাৎ পদত্যাগের ক্ষেত্রে জানা গেছে, সরকারের কাছ থেকে ‘সবুজসংকেত’ পেয়েই তিনি পদত্যাগ করেছেন। সরকার চাইছিল যে তিনি পদত্যাগ করুক। কেননা, গত কয়েক মাস রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের সম্পর্কে এক ধরনের শিথিলতা তৈরি হয়, যেটা দৃশ্যমানও হয়।
সাধারণত প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে তার সফরের বিষয়ে অবহিতের রেওয়াজ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। দেশে ফিরে ২৭ জুন তিনি জাতীয় সংসদে সফরের অর্জন নিয়ে কথা বলেন। তবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বা অন্য কোনোভাবে সফরের ফল তাকে অবহিত করেছেন— এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি। তাই অনেকেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথা বলছিলেন।
বিএনপির ভেতর থেকে কেউ কেউ বলছেন, গত মে মাসে রাষ্ট্রপতি (সদ্য সাবেক) মো. সাহাবুদ্দিন যখন চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান, তখন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ফোনালাপ হয়। এরপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মারফতে ওই ফোনালাপের বিষয়টি সরকারের কাছে চলে আসে, যেটাকে গুরুত্বসহকারে আমলে নেয় সরকার। এরপরই মূলত সরকার থেকে তাকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়। বিএনপি নেতাদের ধারণা, সেই সূত্র ধরেই মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও মো. সাহাবুদ্দিন ওই ফোনালাপের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করে এটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলেছেন।
অনেকের ধারণা, ওই ফোনালাপই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের অন্যতম কারণ। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করেছেন যে মো. সাহাবুদ্দিনের ওপর তাদের যে আস্থা ছিল, ওই ফোনালাপের মধ্য দিয়ে চিড় ধরেছে তাতে। তবে এটাও ঠিক, মো. সাহাবুদ্দিন নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ। পদত্যাগপত্রে সেটি তিনি উল্লেখও করেছেন।
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। বিএনপি নেতারা বলছেন, সংসদের আগামী অধিবেশনে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবে। জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বরে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন বসতে পারে। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলটি মনে করছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য তাদের হাতে যথেষ্ট সময় রয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ চার নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা হলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। তবে কেউ কেউ বলছেন, তাদের বাইরে থেকেও চমক আসতে পারে। সেটি একান্তই নির্ভর করছে তারেক রহমানের ওপর।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. নূরুল ইসলাম মনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। সংসদের আগামী অধিবেশনে সেটি হতে পারে।’
এক প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বললেন, ‘সংসদের একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন বসতে হয়। সে হিসেবে সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখের মধ্যে অধিবেশন বসতে হবে। এতে করে হাতে এখনো যথেষ্ট সময় আছে।’
‘রাষ্ট্রপতি পদে দল কাকে মনোনয়ন দেবে, সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরিই বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে তিনি দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে হয়তো কথা বলবেন’— যোগ করেন নূরুল ইসলাম মনি।




