দেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না : রাষ্ট্রপতি

সংগৃহীত ছবি
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না।
আজ রবিবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা দেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।’
‘প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের তা সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, এই দেশে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। এই দেশে ফ্যাসিবাদের সেই অন্ধকার অধ্যায় আমরা চিরতরে বন্ধ করব’, যোগ করেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি বললেন, ‘রাষ্ট্রের আরেকটি পবিত্র দায়িত্ব গুমের শিকার এই পরিবারগুলোর আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়ানো। আমি বিশ্বাস করি, সরকার ইতিমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, আরও করবে।’
‘আসুন, আমরা সম্মিলিতভাবে এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করি, যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও মর্যাদা হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি। সুশাসন হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি। জবাবদিহিতা ও বাকস্বাধীনতা হবে গণতন্ত্রের শক্তি এবং ইনসাফ হবে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাক, সত্য-ন্যায় ও মানবাধিকার-মানবিকতায় আমাদের সকলকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার তৌফিক দান করুন।’
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এই অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানে গুম হয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যরা তাদের আর্তি তুলে ধরেন এবং গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি জানান।
‘গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা’
রাষ্ট্রপতি বললেন, ‘আমি তীব্র বেদনা নিয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সকল মানুষকে, স্মরণ করছি সেইসব মা-বাবা ও ভাই-বোনদের, যারা তাদের দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন এই বুঝি তাদের সন্তান, তাদের স্বজন ফিরে এলো?’
‘স্মরণ করছি সেই স্ত্রীকে, যিনি প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। স্মরণ করছি সেই সন্তানকে, যারা শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় কিন্তু বাবা তাকে করে তুলে নিতে ফিরে আসেননি। গুমের নির্মম শিকার সকল ব্যক্তি, পরিবার, স্বজন ও সহযোগিতার প্রতি জানাই আমার গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা। গুম-খুনের শিকার সকল মানুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। আমি তাদের রুহের চিরশান্তি ও মাগফিরাত কামনা করছি।’
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বস্তি। এটা জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তির স্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-খুনের মাধ্যমে কার্যত সেই অধিকারগুলোর সব কটিকে একসঙ্গে ভূলুণ্ঠিত করা হয়।’
‘গুমের দুঃসহ থাবা’
রাষ্ট্রপতি বললেন, দেড় দশকে ফ্যাসিবাদ সরকার আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালা আয়নাঘর, দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্ন মত পোষণ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখন আন্দোলন করেছেন তখনই তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, গোপনে খুন করা হয়েছে।
‘অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবাহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে। আমরা ভুলে যাইনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলামসহ অগণিত মানুষকে। যাদের পরিবারের প্রতিটি রাত কাটছে বুক ভরা বেদনা, অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষা নিয়ে। অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল আযমীসহ বিভিন্ন মতালম্বী কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার, স্যাঁতসেঁঁতে আলো, বাতাসহীন আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল, সেখানে প্রতিমুহূর্ত ছিল তাদের মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।’
তিনি বললেন, ‘মঞ্চে উপবিষ্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করে ভিন দেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ সৌভাগ্যক্রমে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। এদেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন যারা আজ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি।’
‘আমি অবশ্যই উল্লেখ করতে চাই যে আমাদের একটি মেয়ে সাহসিকতার সঙ্গে, নির্বিকতার সঙ্গে সেদিন এই গুম হওয়া পরিবারগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছিল। সে হচ্ছে আমাদের বর্তমান সংসদ সদস্য সানজীদা ইসলাম তুলি। সে নিজে একা লড়ে গেছে। এমনকি সে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনে পর্যন্ত গিয়েছে। সেজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই, অভিবাদন জানাই।’
‘গুম-খুনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল’
রাষ্ট্রপতি বললেন, ‘যে গণতন্ত্র সাম্যবাদ স্বাধীনতা মানবিক ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে একটা ভয়ানক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক অপমানজনক অধ্যায়।’
‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই সময় পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, যিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই গুম-খুন ও অত্যাচার-নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বিএনপি, জামায়াত ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদীবিরোধী সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীলসমাজ ও সর্বস্তরের জনগণকে, যাদের অনেকে গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ বংশবদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে।’
‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে’
রাষ্ট্রপতি বললেন, ‘এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃত আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
‘আমি বিশ্বাস করি, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট, মানসিক যন্ত্রণা বহন করেছে, তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে, গ্রহণ করতে হবে।’







