গ্যাস চাই গ্যাস নাই
চুরি-আমদানি বাড়ছে, উৎপাদন কমছে

সংগৃহীত ছবি
দেশে এক দশক আগে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৭৫ কোটি ঘনফুট। এখন তা নেমেছে ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। নতুন গ্যাসক্ষেত্রের অনুসন্ধান ও পুরনোগুলোর সংস্কারে দীর্ঘদিনের অবহেলায় ক্রমেই কমছে উৎপাদন। বিপরীতে বাড়ছে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি। এতে ভর্তুকির পাশাপাশি বাড়ছে গ্যাসের দাম। কিন্তু সংকট নিয়েছে আরও প্রকট আকার। এর মধ্যেও থেমে নেই গ্যাস চুরি আর অপচয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মূলত কমিশন বাণিজ্যের লোভে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঝোঁক ছিল এলএনজি আমদানিতে। গ্যাস অনুসন্ধানে নজর না দিয়ে আমদানিতে জোর দেওয়ায় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হলেও নিশ্চিত হয়নি জ্বালানি নিরাপত্তা। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের ভেতরে সাগর, স্থলভাগ ও পাহাড়ে বিস্তৃত পরিসরে অনুসন্ধানে গুরুত্বের পাশাপাশি পুরনো কূপগুলো সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
চলমান গ্যাসসংকট চাইলেই রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয় জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার কূপ খনন করেনি, উৎপাদন বাড়ায়নি। তারা সমুদ্র জয়ের দাবি করলেও সেখানকার জ্বালানি সম্পদ আহরণে বলার মতো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলো এরই মধ্যে উপকূলীয় ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে।
জ্বালানি মন্ত্রীর দাবি, বিগত সরকারের অবহেলার কারণেই বেড়েছে গ্যাস সংকট। এখন চাইলেই উৎপাদন বাড়ানো যাবে না; সময় দিতে হবে।
চাহিদা, উৎপাদন ও মজুদ: দেশে গ্যাসের দৈনিক প্রকৃত চাহিদা অন্তত ৫৫০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সংযোগ অনুযায়ী চাহিদা বিবেচনা করা হয় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ হয় গড়ে ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে কমবেশি ১০০ কোটি ঘনফুট আসে আমদানির এলএনজি থেকে। বিদ্যমান ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি থেকে উৎপাদন হচ্ছে নিয়মিত। নতুন আবিষ্কৃত চারটি ক্ষেত্র থেকে এখনো শুরু হয়নি উৎপাদন। বাকি পাঁচটি ক্ষেত্র পরিত্যক্ত দীর্ঘদিন ধরে।
বর্তমানে গ্যাসের মজুদ ৬ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)। বছরে গড়ে প্রায় ৬৯৫ বিসিএফ উত্তোলন হলে তা দিয়ে চলবে আট বছর। তবে গ্যাসক্ষেত্রে শেষ পর্যায়ে চাপ কমে যাওয়াসহ নানান কারণে অনেক সময় মজুদের পুরোটা করা যায় না উত্তোলন। পরিত্যক্ত পাঁচটি ক্ষেত্র ফেনী, সাঙ্গু, ছাতক, কামতা ও রূপগঞ্জে গ্যাস রয়েছে প্রায় ৬৬১ বিসিএফ। ভোলার দুটি ক্ষেত্রে প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাসের মজুদ থাকলেও পাইপলাইনের অভাবে তা আনা সম্ভব হচ্ছে না মূল ভূখণ্ডে। অন্যদিকে, কুতুবদিয়া ও জকিগঞ্জে নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার হলেও পাইপলাইন ও অবকাঠামোর অভাবে উৎপাদন শুরু হয়নি এখনো।
সংকটের শুরু যেভাবে: গ্যাস সংকটের আভাস পেয়ে ২০১০ সাল থেকে বাসাবাড়িতে নতুন সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত এখনো কার্যকর। শিল্পেও গ্যাস সরবরাহ এবং সংযোগ করা হয় সংকুচিত। অন্যদিকে অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ২০১৬ সাল থেকে গ্যাস উৎপাদন ক্রমেই কমতে থাকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট উৎপাদন ছিল ৯৭২ বিলিয়ন ঘনফুট। এর পর থেকে উৎপাদন কমতে কমতে এখন ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমেছে।



