ফুয়েল পাসে ফুয়েল নেই
- শুক্রবার চালু হওয়া পদ্ধতিটি শনিবারই বন্ধ করে দেয় বিআরটিএ
- বিআরটিএ দিয়েছে নিরাপত্তার অজুহাত
- রবিবার থেকে ৭ ফিলিং স্টেশনে তেল মিলবে না ফুয়েল পাস ছাড়া
- অ্যাপটি নিয়ে প্রচার না থাকার অভিযোগ গ্রাহকদের
- স্মার্টফোন না থাকলেও ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে পাওয়া যাবে কিউআরকোড

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
জ্বালানির ‘জ্বলুনি’ থেকে গ্রাহকদের রক্ষা করতে ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শুরু করেছে ‘ফুয়েল পাস’ নামের একটি অ্যাপের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। তবে এক দিনের মাথায়ই ধাক্কা খেয়েছে ভোগান্তি কমানোর ডিজিটাল প্রচেষ্টাটি। ‘নিরাপত্তার স্বার্থে’ শুক্রবার চালু হওয়া পদ্ধতিটি শনিবারই বন্ধ করে দেয় বিআরটিএ। ফলে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে মোটরসাইকেল চালকসহ পেট্রোলপাম্পের কর্মীদের। বিষয়টি নিয়ে হয় আলোচনা-সমালোচনা। ‘ফুয়েল পাসে ফুয়েল নেই’— এমন কথাও বলেছেন কেউ কেউ। অবশ্য বিআরটিএ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আশ্বাস, খুব শিগগিরই হবে সমস্যার সমাধান।
ফুয়েল পাস নিয়ে শুরুতেই ভোগান্তির আরেকটি কারণ, বিষয়টি নিয়ে ছিল না তেমন কোনো প্রচার। অ্যাপভিত্তিক তেল সরবরাহ করছে এমন একটি পাম্প আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন। সেখানকার নিয়মিত একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, অ্যাপের বিষয়ে অবগত নন তারা। কারও ভাষ্য, অ্যাপের বিষয়ে তারা শুনলেও ঠিক কবে সেটি চালু হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাননি তারা।
জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে শৃঙ্খলা আনতে গত বৃহস্পতিবার ডিজিটাল পদ্ধতিটির ঘোষণা দিয়েছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। শুক্রবার প্রাথমিকভাবে ঢাকার তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ও আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে অ্যাপের মাধ্যমে শুরু হয় জ্বালানি তেল সরবরাহ। শনিবার আরও ৫টি ফিলিং স্টেশন যুক্ত হয় ওই তালিকায়। আজ রবিবার থেকে ওই ৭ ফিলিং স্টেশনে শুধু ফুয়েল পাস অ্যাপের মাধ্যমেই সরবরাহ হওয়ার কথা জ্বালানি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উদ্যোগে তৈরি এ ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে কিউআর কোড স্ক্যান করে নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি তেল নেওয়ার সুযোগ। এ অ্যাপ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সার্ভারে যুক্ত। ফলে নিবন্ধিত যানবাহনের সঠিক তথ্য যাচাই করে দেওয়া যাবে জ্বালানি। যাদের স্মার্টফোন নেই, তারাও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে প্রিন্ট নিতে পারবেন কিউআর কোডটি। চালক তার কিউআর কোড স্ক্যান করে নিতে পারবেন বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি। পাশাপাশি দেখে নিতে পারবেন ব্যালেন্স। ফিলিং স্টেশন মালিকরাও তাদের বরাদ্দ ‘এন্ট্রি’ দিয়ে করতে পারবেন জ্বালানি বিতরণ।
সারাদেশে প্রতিদিন কী পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণ হচ্ছে, তাও রিয়েলটাইমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে।
তেল নেওয়ার জন্য সকাল থেকেই অনলাইনে নিবন্ধন করার চেষ্টা করছি কিন্তু কোনোভাবেই করা যাচ্ছে না, হয়তো সার্ভার জটিলতা
শনিবার সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অ্যাপধারীদের জন্য আলাদা লাইন করা হয়েছে, যেখানে একজন মোটরসাইকেল চালক সুযোগ পাচ্ছেন ১ হাজার টাকা পর্যন্ত তেল নেওয়ার। আর যারা পাসের জন্য নিবন্ধন করেননি তাদের দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার তেল।
চালকদের সহায়তার জন্য সেখানে রয়েছেন আল্টারিওর ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক। অনলাইনে নিবন্ধন করতে না পেরে অনেকেই সহায়তা চাইছিলেন তাদের। কিন্তু তারা দিতে পারছেন না তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান। শুধু দিচ্ছিলেন অপেক্ষা করার পরামর্শ।
সোনার বাংলা পাম্পে কথা হয় কল্যাণপুরের বাসিন্দা আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি অনেক চেষ্টা করেও করতে পারেননি নিবন্ধন। তার আক্ষেপ, ‘তেল নেওয়ার জন্য সকাল থেকেই অনলাইনে নিবন্ধন করার চেষ্টা করছি কিন্তু কোনোভাবেই করা যাচ্ছে না, হয়তো সার্ভার জটিলতা।’
স্বেচ্ছাসেবকদের একজন স্বীকারও করলেন বিষয়টি। জানালেন, অ্যাপটি বিআরটিএ সার্ভারে যুক্ত। সংস্থাটির সার্ভারে রয়েছে জটিলতা। ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে সেবা।
অবশ্য শুক্রবার রাত পর্যন্ত ৫১ হাজার মোটরসাইকেল চালক নিবন্ধন করেছেন বলে জানালেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপসচিব আছমা আরা বেগম। তার ভাষায়, হঠাৎ চাপ বেড়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে কিছু জটিলতা। পাশাপাশি পরীক্ষামূলক এ পদ্ধতির আরও যাচাই-বাছাইয়ের কথাও উল্লেখ করলেন তিনি।
প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেল চালকরা এই সুবিধা পাবেন। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও পদ্ধতিটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
‘মূলত কী কী সমস্যা হতে পারে সেজন্যই পরীক্ষামূলকভাবে এই সেবা চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেল চালকরা এই সুবিধা পাবেন। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও পদ্ধতিটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে’ যোগ করলেন তিনি।
তবে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমরের দাবি, ‘এখানে আমাদের সার্ভার বা সাইটের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। মূলত এটি চালুর পর এই সিস্টেমের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি। তারা এটা পরীক্ষা করার পর ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার পরই আবার সেবাটি উন্মুক্ত হবে। আশা করছি, আজ রবিবার থেকেই নিবন্ধন করতে পারবেন গ্রাহকরা।’
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ডিজিটাল এই পদ্ধতির মাধ্যমে দিনে একাধিকবার তেল নেওয়া যাবে না। ফলে বন্ধ হবে ইচ্ছেমতো তেল নিয়ে মজুদ করার সুযোগ।
তবে সব পাম্পে এ সিস্টেম চালু না হওয়ায় এক পাম্প থেকে ফুয়েল পাস দিয়ে তেল নেওয়া ওই ব্যক্তি দাঁড়িয়ে পড়তে পারেন অন্য পাম্পের লাইনে, করা হচ্ছে এমন আশঙ্কাও।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন উদ্যোগটি ভালো। তার মতে, এতে সংকট পুরোপুরি না কাটলেও জ্বালানি তেল সরবরাহে আসবে শৃঙ্খলা, কমবে গ্রাহকের দুর্ভোগ। অবশ্য সেজন্য তিনি শর্ত দিলেন নিয়মিত তদারকির।
এতে সংকট পুরোপুরি না কাটলেও জ্বালানি তেল সরবরাহে আসবে শৃঙ্খলা, কমবে গ্রাহকের দুর্ভোগ। অবশ্য সেজন্য তিনি শর্ত দিলেন নিয়মিত তদারকির
বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তেল বিতরণের কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি, এমনটাই মনে করছে জ্বালানি বিভাগ। তাদের পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও একই ব্যক্তি বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করায় দেখা দেয় কৃত্রিম সংকট। ডিজিটাল পদ্ধটি চালু হলে বিতরণ প্রক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ অটোমেশন, আসবে রিয়েলটাইম মনিটরিংয়ের আওতায়। কর্মকর্তাদের আশা, উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে অনিয়ম ও অপচয় কমবে জ্বালানি সরবরাহে।
কীভাবে পাওয়া যাবে অ্যাপ
এ সুবিধা পেতে প্রথমে গুগল প্লে স্টোর থেকে মোবাইল ফোনে ইনস্টল করতে হবে ফুয়েল পাস নামের অ্যাপটি। অ্যাপে প্রবেশ করে ভেরিফাই করতে হবে ফোন নম্বর দিয়ে। আরও দিতে হবে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র, গাড়ির ব্লুবুক বা স্মাট কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, সচল ফোন নম্বর এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
যেসব পাম্পে অ্যাপে মিলবে জ্বালানি
শনিবার ঢাকার আরও ৫টি পাম্প আগের তালিকায় যুক্ত করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ফলে আগের দুটিসহ ৭টি পাম্পে অ্যাপে মিলবে জ্বালানি তেল। নতুন ৫টি পাম্প হলো- মহাখালীর গুলশান সার্ভিস স্টেশন, শাহবাগের মেঘনা মডেল পাম্প, নিকুঞ্জ এলাকায় নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টার, কল্যাণপুরের খালেক সার্ভিস স্টেশন এবং আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন।
আজ রবিবার থেকে এসব পাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের শুধু ফুয়েল পাস অ্যাপের মাধ্যমেই পাওয়ার কথা পেট্রোল-অকটেন।

