৩০ বছরেও মেলেনি বিচার
দেশে ৯ ব্রিটিশ-বাংলাদেশি খুন, ৫ জনের রহস্যজনক মৃত্যু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাটির টানে দেশে ফেরা ৯ ব্রিটিশ-বাংলাদেশির শেষ পরিণতি হয়েছিল ‘নির্মম হত্যাকাণ্ড’। পাঁচটি তাজা প্রাণ হারিয়ে গেছে অন্ধকারের রহস্যাবৃত গোলকধাঁধায়। গত তিন দশকের ঘটনা। একটি দীর্ঘ সময়। স্বজনদের চোখের জলও শুকিয়ে গেছে এতদিনে। কিন্তু বিচারের বাণী আজও নিভৃতে কেঁদে মরে। আজও সেই নৃশংসতার জবাব খোঁজে প্রবাসীদের রক্তে ভেজা স্বদেশের মাটি।
১৯৯৬ থেকে ২০২৬ সাল। এই ৩০ বছরে বাংলাদেশে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছেন নয়জন ব্রিটিশ বাংলাদেশি। আর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে আরও পাঁচজনের। অথচ এ দীর্ঘ সময়ে বিচার হয়েছে মাত্র একটি। বিচার প্রক্রিয়া চলছে তিনটি হত্যাকাণ্ডের। আর বাকি পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ও পাঁচটি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা চাপা পড়েছে আদালতের ধুলোজমা ফাইলের স্তূপের নিচে!
ব্রিটেনে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে যারা আছেন তাদের মধ্যে সুরত মিয়ার কথা ভোলার নয়। ১৯৯৬ সালের ৯ মে বাংলাদেশ এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি জোনের ভেতরে কাস্টমস কর্মকর্তারা মিলে হত্যা করেন এই ব্রিটিশ বাংলাদেশিকে।
সেই ১৯৯৬ সালে সুরত মিয়ার হত্যার পর থেকে ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বোরহান হত্যা পর্যন্ত গত ৩০ বছরে ৯ ব্রিটেনপ্রবাসী হত্যা আর পাঁচজনের রহস্যজনক মৃত্যুর মধ্যে একটি ঘটনা ছাড়া বাকি কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি।
সে সময় সুরত মিয়া হত্যার বিচার আন্দোলনে সক্রিয় থাকা কমিউনিটি নেতা কে এম আবু তাহের চৌধুরী বললেন, ১৯৯৬ সালের ৯ মে নিউক্যাসলের ৩৫ বছর বয়সী রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সুরত মিয়া কেএলএমের ফ্লাইটে নামেন ঢাকার বিমানবন্দরে। তরুণ রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সৈয়দ সিরাজ ওরফে সুরত মিয়া ঢাকায় নামার পর তার কাছে থাকা ক্যাশ ৪ হাজার পাউন্ডের দিকে নজর যায় এক মহিলা কাস্টমস কর্মকর্তার। সেই মহিলা সুরত মিয়ার কাছে ঘুষ দাবি করেন। তখন সুরত মিয়া চ্যালেঞ্জ করেন। সেখানে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে কাস্টমসের কর্মকর্তারা মিলে হামলা চালান সুরত মিয়ার ওপর। তাকে কাঠের টুকরা দিয়ে আঘাত করা হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সুরত মিয়া। তারপর কাস্টমসের কর্মকর্তারা মিলে প্রথমে চিন্তা করেন বডি বাইরে ফেলে দিতে। তবে তা সম্ভব হয়নি। তারা সুরত মিয়াকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেলে, সেখানে মৃত ঘোষণা করা হয় তাকে।
কে এম আবু তাহের জানালেন, সুরত মিয়ার হত্যার পর কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষ নামেন আন্দোলনে। সেই আন্দোলন একসময় মাটিচাপা পড়ে যায়। তখন ব্রিটেনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আন্দোলনে নামেন। বাংলাদেশে সরকারের পরিবর্তন হলে বিচারের আশ্বাসে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকের পরামর্শে প্রবাসীরা আন্দোলন থেকে সরে আসেন। পরে বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে বিচার চাওয়া হয়। এখান থেকে প্রতিনিধিদল পাঠানো হয় বাংলাদেশে। চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য এনে উপস্থাপন করে সেই দল। দুঃখের বিষয় হলো, কাজে লাগেনি কোনো কিছুই। চারজন কাস্টমস কর্মকর্তাকে দায়ী করে চার্জশিট দেওয়া হয়। কিন্তু প্রমাণের ঘাটতি দেখিয়ে রেহাই পেয়ে যান সবাই। সেই বিচার আর হয়নি। সুরত মিয়ার পরিবার এখনো নিউক্যাসলে থাকে। বাবা হত্যার বিচার না পাওয়ার বেদনা এখনো কুরে কুরে খায় সন্তানদের।
কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট আহাদ চৌধুরী বাবু জানালেন, সুরত মিয়ার হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেক প্রবাসী হত্যার ঘটনা। তিনি বললেন, ২০০১ সালের জুন মাসে বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়ে হত্যার শিকার হন ব্রিটিশ বাংলাদেশি মুঘল কুরাইশি। সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী এ যুবক। তিনি ইস্ট লন্ডনের স্ট্রাটফোর্ডে থাকতেন। সিলেট থেকে বিমানের ফ্লাইটে উঠে ঢাকায় বিমানের নির্ধারিত ট্রানজিট হোটেল থেকে সকালে কিডন্যাপ হন তিনি। তাকে ছাড়াই বিমান ছাড়ে লন্ডনের উদ্দেশে। দুদিন পর ঢাকা বিমানবন্দর থেকে ১০ মাইল দূরে উদ্ধার করা হয় তার লাশ। পুলিশি তদন্তে বলা হয়, পাসপোর্ট ছিনিয়ে নিতে হত্যা করা হয় এ যুবককে। মুঘল কুরাইশি হত্যার পর বিমান অফিস ঘেরাও করে বিরাট আন্দোলন করা হয়। কিন্তু সেই বিচার হয়নি আজও।
২০০৩ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে হত্যার শিকার হন লন্ডনপ্রবাসী দুলা মিয়া। এই একটির বিচার হতেই সময় লেগেছিল ১৯ বছর! ২০২২ সালে এই একটি হত্যার বিচার হলেও পূর্ণাঙ্গ বিচার হয়নি।
২০১১ সালের ২৬ জুন রচডেল এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা হাজি তাহির আলীর মৃত্যু হয় মুখোশধারীদের আক্রমণে। বাংলাদেশে সিলেটের বিশ্বনাথে যাওয়ার পর। ধারণা করা হয়, জমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে এ হত্যা। ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ঘটনারও বিচার হয়নি।
৫৭ বছর ধরে ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক জনমতের সাবেক সম্পাদক নবাব উদ্দিন শোনালেন আরেকটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের গল্প। তিনি জানালেন, রেহানা বেগম থাকতেন স্টেপনি গ্রিন এলাকায়। শখের গার্ডেনার ছিলেন। কাজ করতেন স্থানীয় হেলথ সেন্টারে। ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই স্বামী ও ১২ বছরের সন্তান নিয়ে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুরে পাটলি গ্রামে যান। ২ আগস্ট ১২ বছরের সন্তানের সামনে ১৮ বার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় তাকে। নিজ আত্মীয়দের মধ্যে চারজন সোনা আর টাকার জন্য হত্যা করে এ নারীকে। আজ পর্যন্ত এর বিচার হয়নি।
২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে শ্রীমঙ্গলের একটি রিহ্যাব সেন্টার থেকে উদ্ধার করা হয় জালাল উদ্দিন নামের আরেক ব্রিটিশ বাংলাদেশি তরুণের লাশ। চিকিৎসার জন্য সেখানে ভর্তি করেছিল তার পরিবার। কিন্তু পেয়েছিল শরীরে অসংখ্য আঘাতে জর্জরিত লাশ। বিচার হয়নি সেই হত্যাকাণ্ডেরও।
২০২২ সালের জুলাই মাসে কার্ডিফ নিবাসী রফিকুল ও তার স্ত্রীসহ পাঁচজন রহস্যজনকভাবে মারা যান সিলেটের ওসমানীনগরে নিজ বাসায়। ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যাওয়া এ পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, এখনো জানা যায়নি। পুলিশের তাড়াহুড়ো তদন্তে এটিকে কার্বন মনোক্সাইডের কারণে ঘুমের মধ্যে মৃত্যু বললেও এই ঘটনার আর কোনো বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি।
২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট সিলেটের বিয়ানীবাজারের মুড়িয়া ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামে আপন ভাইয়ের হাতে হত্যার শিকার হন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী জালাল উদ্দিন (৫৫)। জমিসংক্রান্ত বিরোধ থেকে ঘটনার দিন আপন ভাইসহ অন্যান্য স্বজন মিলে পিটিয়ে হত্যা করেন জালাল উদ্দিনকে। পরে মৃত্যুকে হার্ট অ্যাটাক বলে দ্রুত কবর দেওয়া হয়। হত্যার দুই মাস পর যুক্তরাজ্যের নিহতের পরিবার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আদালতে গেলে লাশ তুলে ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই তদন্তে জানা যায়, তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় প্রধান আসামি সুনাম উদ্দিনকে আটক করা হলেও সেই মামলা এখনো ঝুলন্ত অবস্থায় আছে। মামলার বাদী নিহত জালাল উদ্দিনের মেয়ে জুবায়দা জালাল জানালেন, এখনো এই হত্যার মামলার কোনো অগ্রগতি নেই, অনেক আসামি এখনো আটক হয়নি।
২০২৪ সালের ৭ মার্চ আরেকটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আব্দুল কাইয়ূম (৪৫)। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবেশী চাচার সঙ্গে প্রবাসী আব্দুল কাইয়ূমের দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে এলাকায় বেশ কয়েকবার সালিশ বসে। এর জেরে ২০২৪ সালের ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার থানার রুস্তমপুর তলপাড়া এলাকায় নিজ বাসার উঠানে ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার সময় বসতবাড়ির দরজা বাইরে থেকে তালা দিয়ে আটকে ফেলা হয়, যাতে তাকে রক্ষা করার জন্য কেউ আসতে না পারে। এ হত্যার পর নিহত আব্দুল কাইয়ূমের স্ত্রী মামলা করলেও সেই মামলারও কোনো অগ্রগতি নেই।
সর্বশেষ চলতি বছর ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে গিয়ে তিন দিনের মাথায় ৩০ জানুয়ারি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বোরহান উদ্দিন শফি নিখোঁজ হন, তারপর আরও তিন দিন পর জকিগঞ্জে তার মরদেহ পাওয়া যায় পোড়ানো অবস্থায়। এ ঘটনার পর মূল আসামি আটক হলেও বিচার এখনো চলছে। আদালতের ধীরগতিতে নিহতের পরিবার এখন হতাশ! আদৌ কি ন্যায়বিচারের সূর্য উঠবে তাদের স্বজন হারানো শোকের আকাশে?





