গ্রেপ্তার ২
সমকামী সেজে ভুয়া আশ্রয় আবেদন, বাংলাদেশিদের ঘিরে যুক্তরাজ্যে অপরাধী চক্র

ফাইল/রয়টার্স
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদন করতে সমকামী পরিচয় ব্যবহার। আর এই ভুয়া আশ্রয় আবেদন করাতে অভিবাসীদের কাছ থেকে হাজার হাজার পাউন্ড নেওয়ার অভিযোগে একটি সন্দেহভাজন অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। মঙ্গলবার লন্ডনে অভিযানে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর। চক্রটি মূলত বাংলাদেশি পুরুষদের জন্য সাজানো ছবি, ভুয়া নথি ও মিথ্যা সহায়ক চিঠিসহ আশ্রয় আবেদনের ‘প্রমাণ’ তৈরি করে দিত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ চক্রের সঙ্গে যুক্ত শতাধিক আশ্রয় আবেদন এখন পর্যালোচনা করছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর।
অভিবাসীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে।
ধারণা করা হচ্ছে, তারা বাংলাদেশি কয়েক ডজন পুরুষের আশ্রয় আবেদনে সহায়তা করেছেন। এসব আবেদনকারী দাবি করেছিলেন, দেশে ফিরলে তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে।
লন্ডনের দুটি ঠিকানায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মোবাইল ফোন, গয়না ও হাজার হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ জব্দ করেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থানের সন্দেহে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে বিবিসির একটি অনুসন্ধানের পর হলো এ অভিযান। ওই অনুসন্ধানে উঠে আসে, আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করা অভিবাসীদের সমকামী সেজে থাকতে সহায়তা করছিল কিছু আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শদাতা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপরাধ তদন্তবিষয়ক আঞ্চলিক প্রধান ক্রিস ফস্টার বলেন, মঙ্গলবারের গ্রেপ্তারগুলো বাংলাদেশি এলজিবিটি কমিউনিটি সংগঠন ‘আপনজন’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলাদা কিছু ভুয়া আশ্রয় আবেদনের ঘটনায় করা হয়েছে। সংগঠনটির কার্যালয় পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে।
তিনি বলেন, আশ্রয় আবেদনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা প্রথমে একই ধরনের সন্দেহজনক কিছু আবেদন দেখতে পান। এতে সংগঠনটিকে নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এরপর অভিবাসন কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে বিষয়টি তদন্ত করছিলেন।
ফস্টার বললেন, ‘আমাদের কাছে এমন কিছু তথ্য রয়েছে যে তারা ভুয়া চিঠি ও নথি সরবরাহ করতে পারে এবং এর জন্য ১ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত নিতে পারে।’
তার ভাষ্য, ‘এগুলো আপনজনের পক্ষ থেকে দেওয়া সমর্থনপত্র হতে পারে, সাজানো ছবি হতে পারে—যাতে ওই ব্যক্তিরা সমকামী বলে মনে হয়। এমন চিঠিও হতে পারে, যেখানে কেউ দাবি করছে যে আবেদনকারীর সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ বা যৌন সম্পর্ক রয়েছে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই অপরাধী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০০টির বেশি আশ্রয় আবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফস্টার বলেছেন, এসব ভুয়া আবেদনের কিছু ‘নিঃসন্দেহে’ অনুমোদন পেয়েছিল।
এর আগে অভিবাসনবিষয়ক বিচারকেরা আপনজনের দেওয়া প্রমাণকে অবিশ্বস্ত বা বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে সমালোচনা করেছেন। এক মামলায় এক আবেদনকারী দাবি করেছিলেন, তিনি সংগঠনটির অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু বিচারকেরা দেখতে পান, তিনি সাজানো ছবি জমা দিয়েছিলেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংগঠনটি প্রায়ই এমন পুরুষদের পক্ষে সাক্ষ্য দিত, যারা সমকামী হওয়ার ভিত্তিতে আশ্রয় আবেদন করতেন, কিন্তু এর আগে রাজনৈতিক কারণে তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। একটি ঘটনায় এক ব্যক্তি তার প্রথম আশ্রয় আবেদনের ৯ বছর পর নিজের যৌন পরিচয়ের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
চলতি বছরের শুরুতে বিবিসির অনুসন্ধানে যেসব পরামর্শদাতার কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে এসেছিল, এই সংগঠনও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ওই অনুসন্ধানের প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আশ্রয় আবেদনগুলো পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। ওই অনুসন্ধানের পর মে মাসে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এপ্রিল মাসে প্রকাশিত বিবিসির ওই প্রতিবেদনে তানিসা খান নামের এক পরামর্শদাতা এক প্রতিবেদককে বলেছিলেন, তিনি ‘সম্পূর্ণ একটি প্যাকেজ’ দিতে পারেন। এর মধ্যে সমকামীদের ক্লাবে তোলা ছবি ও অন্যান্য সহায়ক প্রমাণও থাকবে। তার এই মন্তব্য গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল।
তার সঙ্গে ‘ওরসেস্টার এলজিবিটি’ নামে একটি কমিউনিটি সংগঠনের সম্পর্ক ছিল। প্রতিবেদককে তিনি ওই সংগঠনে যোগ দিতে বলেছিলেন, যাতে তার ভুয়া আশ্রয় আবেদনের পক্ষে আরও প্রমাণ তৈরি করা যায়।
পূর্ব লন্ডনের বেকটনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংগঠনটির একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন পুরুষ দাবি করেছিলেন, তারা আসলে সমকামী নন। তাদের একজন বলেছিলেন, ‘এখানে কেউই সমকামী নয়। একজনও নয়। ১ শতাংশও নয়। এমনকি শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশও নয়।’
ওই অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, ভুয়া আশ্রয় আবেদনকে শক্তিশালী করতে মিথ্যা চিকিৎসাজনিত অসুস্থতা এবং ভুয়া সংবাদ ওয়েবসাইটও ব্যবহার করা হচ্ছিল।
ওরসেস্টার এলজিবিটি পরে বন্ধ হয়ে যায়। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আগে বলেছিলেন, আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে সংগঠনটি কোনো সাজানো প্রমাণ তৈরি বা সমর্থন করত না। কোনো ব্যক্তি সত্যিই সমকামী কি না, তা নির্ধারণ করাও সংগঠনটির কাজ ছিল না।
তানিসা খান যোগাযোগের সমস্যাকে ‘ভুল বোঝাবুঝির’ জন্য দায়ী করেন। তিনি ওই প্রতিবেদককে মিথ্যা দাবি করতে পরামর্শ দেওয়ার বা সাজানো প্রমাণ তৈরির প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, ‘যারা নিপীড়নের ভান করে, তারা ঘৃণারও অধম এবং তারা প্রকৃত ভুক্তভোগীদের উপহাস করে, যাদের সুরক্ষা প্রয়োজন।’
তার ভাষ্য, ‘এই লজ্জাজনক প্রতারণা থেকে যারা অর্থ উপার্জন করছে, তাদের উদ্দেশে বলছি: তোমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ কেড়ে নেওয়া হবে এবং তোমাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেওয়া হবে। আর যারা ব্যবস্থাকে ঠকাচ্ছে, তাদের আবেদন বাতিল করা হবে এবং তাদের এই দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।’
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি




