তত্ত্বাবধায়কের গ্রহণযোগ্য রূপরেখা চায় সরকার

বিরোধী দলসহ সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই সংবিধান সংশোধন করতে চায় সরকার। এজন্য তাদের সংবিধান সংশোধন কমিটির কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। আর জুলাই জাতীয় সনদে দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর বিষয়ে যদি বিরোধী দল পরিবর্তন আনতে চায়, সেটি নিয়েও আলোচনা করতে প্রস্তুত। বিষয়টি জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দিতে চায় সরকার। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে গঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এজন্য চাওয়া হয়েছে ‘গ্রহণযোগ্য রূপরেখার’ উন্মুক্ত প্রস্তাব।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের এসব তথ্য জানায় সরকারপক্ষ। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক, টিভি ও অনলাইন মিডিয়ার প্রতিনিধি এবং টকশো-ব্যক্তিত্বরা অংশ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে দেন মতামত। জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে বিরোধী দলকে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনে জোর দিয়েছেন তারা।
প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠন প্রক্রিয়া, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করাসহ নানা পরামর্শ দেন সাংবাদিকরা। কেউ কেউ প্রস্তাবিত দ্বিকক্ষের পার্লামেন্টের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাবও দেন অনেকে। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত রাখার বিষয়গুলোও প্রাধান্য পায় আলোচনায়।
বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমাদের আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত। আমরা আহ্বান জানাই, তারা যেন সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেন, অন্তর্ভুক্ত হন এবং আলোচনায় আসেন। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করে অংশগ্রহণমূলক বা ইনক্লুসিভ একটা সংশোধনী আনতে চাই।’
বিশেষ কমিটির সভাপতি বললেন, ‘বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ, বিচারক, সাবেক বিচারক, নারী নেত্রী, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিত্ব, যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবার এবং ১৭ বছরে যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবারের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে আমরা বসব।’
সংবাদ সম্মেলনে দ্বিকক্ষের পার্লামেন্টের প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উত্থাপিত পর্যালোচনার কথা তুলে ধরা হয়। সালাহউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, ‘বাংলাদেশে দ্বিকক্ষের সংসদের প্রয়োজন আছে কি না— এমন প্রস্তাব এসেছে। যেহেতু এটি একটি একক রাষ্ট্র এবং আমাদের সংবিধানে বলা আছে এখানে অঙ্গরাজ্যের ব্যবস্থা নেই, সেই বিবেচনায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যায় কি না— সে প্রস্তাবও এসেছে।’
‘আমরা যেহেতু জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষের সংসদ গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছি, সে হিসেবেই আমরা এগোতে চাই। তবে তারা (সাংবাদিকরা) যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সংসদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সেটি বিবেচনা করলে তখন বিষয়টি দেখা যাবে’— যোগ করলেন তিনি।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে আরও আলোচনা এবং প্রস্তাব প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বললেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ও রূপ সম্পর্কে আমাদের ওপেন ডিসকাশন এবং প্রস্তাব দরকার। যেটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে, সেটিই গ্রহণ করব। আমরা এখনো এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি যে— কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হবে। তাই এ বিষয়ে সবার কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে, যা উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে পার্লামেন্ট বিবেচনা করে চূড়ান্ত করবে।’
সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, কমিটির সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, কমিটির সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল।



