পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশে কম, নাকি বেশি

বেতন বৃদ্ধির দাবিতে মিরপুরে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা—ছবি : আগামীর সময়
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। তার পরের অবস্থানটিই ভিয়েতনামের। রপ্তানির পরিমাণে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের ব্যবধান বড় নয়। তবে যদি হিসাবটি হয় শ্রমিকদের মজুরিতে, তবে বাংলাদেশ এখানে পিছিয়ে, আর ব্যবধানটিও বেশ বড়।
বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন মজুরির বিষয়টি আবার সামনে এনেছে। শ্রমিকরা দাবি তুলেছেন, ন্যূনতম মজুরি হতে হবে ৩০ হাজার টাকা। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ডিসেম্বরে চূড়ান্ত হতে পারে নতুন মজুরি কাঠামো, এমন আভাস দেওয়া হচ্ছে।
তবে মজুরি দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা দাবি করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে পোশাক শিল্প মালিকদের। অন্যদিকে শ্রমিকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি ও বর্তমান জীবনমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গেলে এই পরিমাণই বাড়াতে হবে।
তৈরি পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপে এই খাতের শ্রমিকের সংখ্যা ৪৩ লাখ বলা হয়েছিল, যার ৫৫ শতাংশই নারী। এই শ্রমিকদের মজুরি সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছিল ২০২৩ সালে। ন্যূনতম মজুরি হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তার আগে তা ছিল ৮ হাজার টাকা।
২০২৫ সালে বিভিন্ন দেশের পোশাক শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ অ্যালায়েন্স (এএফডব্লিউএ)।
সেখানে বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি ১০১ ডলার (১২ হাজার ৫০০ টাকা) দেখানো হয়। ভিয়েতনামের পোশাক শ্রমিকরা ন্যূনতম ১৭১ ডলার পাচ্ছিলেন। (মুদ্রার বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী)।
বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে চীন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের রপ্তানির ব্যবধান বিশাল। চীনের মজুরির বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি এএফডব্লিউএ প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশ বছরে রপ্তানি করে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক, তৃতীয় স্থানে থাকা ভিয়েতনামের রপ্তানি সেখানে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানির তালিকায় এর পরের স্থানগুলোতে রয়েছে যথাক্রমে তুরস্ক, ভারত, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র্। বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারও পোশাক রপ্তানি করে, তবে তাদের অবস্থান বেশ পেছনে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর শ্রমিকদের মজুরির তুলনা করলে দেখা যায়, ভারতে ন্যূনতম মজুরি কম হলেও পাকিস্তানে বেশি। এএফডব্লিউএর তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে ভারতের শ্রমিকরা পেতেন ন্যূনতম প্রায় ৯৫ ডলার। পাকিস্তানে এই অঙ্ক ১৩৪ ডলার। শ্রীলংকায় ন্যূনতম মজুরি ছিল প্রায় ৮১ ডলার, মিয়ানমারের ৯৩ মার্কিন ডলার।
পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী কম্বোডিয়ায় ন্যূনতম মজুরি ২০৪ ডলার। অর্থাৎ তা বাংলাদেশের দ্বিগুণ। ইন্দোনেশিয়ার শ্রমিকরাও ন্যূনতম ১৮৩ ডলার পান।
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের বেতন সম্প্রতি বাড়ানো হয়েছে। এরপরই পোশাক শ্রমিকরা নামে আন্দোলনে। তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবির যৌক্তিকতা অস্বীকার করছেন না তৈরি পোশাক শিল্প মালিকরা।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলছেন, বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় মজুরি কিছুটা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তবে গত কয়েক বছর ধরে কারখানাগুলো মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের জন্য ৯ শতাংশ হারে বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি করে আসছে বলেও জানান তিনি।
তাই মজুরি এক ধাপে অতিরিক্ত বৃদ্ধি বড় চাপ হয়ে আসবে বলে দাবি করছেন শিল্প মালিকরা।
গত এক যুগে মজুরি বৃদ্ধির ওপর চোখ রাখলে দেখা যায়, ২০১৩ সালে ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে তা বাড়িয়ে করা হয় ৮ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে বেড়ে হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
তিন বছর পর ১৮ হাজার টাকা বাড়ানোর দাবি কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্নে শ্রমিকরা বলছেন, এই পরিমাণ অর্থ না হলে নিত্যপণ্যের চড়া দাম, ঘর ভাড়া বৃদ্ধিসহ জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলানো যাচ্ছে না।
গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশন ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় কোনোমতো টিকে থাকার জন্য একটি পরিবারের প্রতি মাসে কমপক্ষে ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা প্রয়োজন হয়। আর সম্মানজনকভাবে বসবাসের জন্য প্রতিটি পরিবারের প্রয়োজন ৪৮ হাজার ২২ টাকা।
সেই অর্থে পোশাক শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে সাজুয্য রয়েছে মজুরি নিয়ে কাজ করা বেসরকারি এই বৈশ্বিক সংগঠনটির প্রতিবেদনে। তবে দেশের পোশাক শিল্প মালিকদের যুক্তি, বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তারা এমনিতেই চাপে আছেন, এখন মজুরি অতিরিক্ত বাড়ানো হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।






