এবার কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে বাংলাদেশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য দেশে ঢোকে— এটি নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে চলছে। সীমান্তবর্তী মানুষের কাছে এটি স্বাভাবিক ঘটনা। এর প্রবেশপথ অনেকটাই নির্বিঘ্ন। কোথাও বেড়া নেই। একেবারেই অরক্ষিত। মাঝেমধ্যে বিজিবির অভিযানে জব্দ করা হয় নানা পণ্য। সে তালিকা দেখে ‘কপালে ভাঁজ’ পড়বে যে কারোরই। কারণ সেখানে আছে অত্যাধুনিক অস্ত্র, রকেট লঞ্চার, গোলাবারুদ, কেজি কেজি স্বর্ণের বার এবং বিভিন্ন ধরনের মাদক। শুধু চোরাকারবারি নয়, সম্প্রতি শুরু হয়েছে ভারত থেকে দেশের অভ্যন্তরে ‘পুশইন’। পাশাপাশি থেমে থেমে চলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। সব মিলিয়ে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থার স্বার্থে অপরাধ শূন্যে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সীমান্ত জুড়ে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়াসহ একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমার সীমান্ত সড়কের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আর ভারত সীমান্তে বেড়া দিতে শুরু হয়েছে প্রাথমিক প্রক্রিয়া। এর আগে সীমান্তবর্তী দুই দেশ— ভারত ও মিয়ানমার বিভিন্ন পয়েন্টে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। বাকি অংশের কাজও চলমান। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানাচ্ছে, দুর্গম ও স্পর্শকাতর সীমান্তে নির্মাণ হয়েছে বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) ও ট্যাকটিক্যাল অপারেটিং বেস (টিওবি)। স্থাপন করা হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে চোরাচালান ঠেকাতে ‘স্মার্ট বর্ডার সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম’। যার মধ্যে রয়েছে ড্রোন ও থার্মাল ইমেজার। হাই রিস্ক জোন চিহ্নিত করে জোরেশোরে চলছে বাড়তি নজরদারি ও রাতের টহল। এ ছাড়া সমতল এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে ‘বর্ডার কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ’, যাতে সীমান্তের যেকোনো ঘটনায় বিজিবির সঙ্গে এলাকাবাসী এগিয়ে আসতে পারেন।
গত ১৭ জুন জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই ধরনের বেড়া ভারত সীমান্তে নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। দেশের জাতীয় স্বার্থরক্ষা এবং সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের অপরাধ ‘শূন্যের কোঠায়’ নামিয়ে আনতেই এ ধরনের পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সড়কের কাজ শেষ হলেই কাঁটাতারের বেড়া বসানো হবে উল্লেখ করে বিজিবির রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশের কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। সড়কের কাজ প্রায় শেষ, এখন কাঁটাতারের বেড়া দিলে এই সীমান্তবর্তী এলাকার অপরাধ কর্মকাণ্ড কমে যাবে। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ফেনসিডিলসহ সব ধরনের মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রবেশ বন্ধে বিজিবি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে— যোগ করলেন তিনি।
যে নিয়মে বেড়া: বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, আন্তর্জাতিকভাবে সীমান্তে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে সর্বজনীন কোনো আইন নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে যেকোনো সার্বভৌম দেশের নিজ সীমান্তে স্থাপনা নির্মাণের স্বাধীনতা রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমেও সীমান্তে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে সমঝোতা করা হয়। তবে শূন্যরেখা থেকে দেড়শ গজের মধ্যে কোনো পক্ষই প্রতিরক্ষা সামর্থ্য থাকা স্থাপনা গড়তে পারবে না। এ ছাড়া উন্নয়নমূলক স্থাপনা তৈরি করতে হলেও অন্যপক্ষের কাছ থেকে সম্মতি নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা যা বললেন: রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক চাপ আসতে পারে— এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলওয়ার হোসেন। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, নিরাপত্তার স্বার্থে নিজ সীমান্তে বেড়া দেওয়া রাষ্ট্রের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। সেক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের দিক থেকে কোনো ধরনের বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ আসতে পারে।
ড. দেলওয়ারের আরও অভিমত— ভারত থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশইনের ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু তৈরি হয়েছে। ফলে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক এবং নৈতিক। এতে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করা না হলেও তা আন্তর্জাতিক চর্চার বিপরীতমুখী অবস্থান। ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের মধ্য থেকেই করা সম্ভব।
তবে মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক সামরিক অ্যাটাশে এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) শহীদুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, এখানে চাপের কিছু নেই। বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিলে অনেক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমে যাবে। মিয়ানমারে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। শূন্যরেখার ১৫০ গজ বাদ দিয়ে বাংলাদেশেও কাঁটাতারের বেড়া হওয়া প্রয়োজন। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেও মনে করেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, কাঁটাতারের বেড়া হলে চোরাচালানসহ অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাবে। মানবিক সংকটকে কেন্দ্র করে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিয়মে যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হয়, সেটিও এড়িয়ে যাওয়া যাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কাঁটাতারের বেড়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর চেয়ে বেশি জরুরি নজরদারির সক্ষমতা বাড়ানো। সর্বোপরি, কাঁটাতারের বেড়ায় সীমান্তকেন্দ্রিক যেমন অপরাধ কমবে, তেমনি অবৈধ যাতায়াতকেও রুখে দেওয়া যাবে।
সীমান্তবাসীর স্বস্তি: সরকারের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু হলে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা-সংকট অনেকটাই কাটবে। নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ২৭১ নম্বর তুমব্রু মৌজার হেডম্যান খাইংচাপ্রু তঞ্চঙ্গ্যা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সীমান্তসংলগ্ন জমির মালিকদের প্রয়োজনীয় খতিয়ান ও মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, জমির প্রকৃত মালিক যাচাই-বাছাই শেষে অধিগ্রহণের টাকা দিয়ে পর্যায়ক্রমে বেড়া নির্মাণকাজ শুরু হবে। উখিয়া উপজেলার বাসিন্দা আলিফ ইমতিয়াজ নুর নিশান বলেছেন, দুর্গম পাহাড়ি ও নদীপথে বিজিবি এবং কোস্ট গার্ড নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করলেও ভৌগোলিক বাস্তবতায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মিত হলে সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধের প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে আসতে পারে বলে তার আশা।
তুমব্রু বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান সোহাগ বলেছেন, সীমান্তে বসবাসকারী মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ হলে সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়বে, অবৈধ অনুপ্রবেশ কমবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে।
ড্রোন, থার্মাল ইমেজার ও হাই রিস্ক জোন নজরদারি: বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত হত্যা, পুশইন, মাদক ও চোরাচালান ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকাকে হাই রিস্ক জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিজিবির প্রতিটি বিওপির অধীনে থাকা পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার এলাকায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রাখা হচ্ছে। সীমান্তের কৌশলগত স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ পোস্ট বসিয়ে রাতের টহল বাড়ানো হয়েছে। ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের নদী ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাত ও ঘন কুয়াশার সুযোগে অনুপ্রবেশ, পুশইন এবং মাদক চোরাচালান ঠেকাতে থার্মাল ইমেজার, নাইট ভিশন ডিভাইস ও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শূন্যরেখা ও কাঁটাতারসংলগ্ন স্পর্শকাতর এলাকায় ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত অপরাধের চেষ্টা নস্যাৎ করা হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে ‘বর্ডার কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ’ গঠন করা হয়েছে। মাইকিং ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সীমান্তবাসীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে।
দুদেশের সঙ্গে সীমান্ত: বিজিবি সূত্র জানাচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পাঁচটি রাজ্যের স্থলসীমান্ত ৪ হাজার ৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার, ত্রিপুরার সঙ্গে ৮৫৬, মেঘালয়ে ৪৪৩, মিজোরামে ৩১৮ ও আসামের সঙ্গে ২৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের। আর মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত ২৭১ কিলোমিটার। বান্দরবান ও কক্সবাজার— এ দুই জেলার সঙ্গে শুধু মিয়ানমারের সীমান্ত। বিশেষ করে, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা, থানচি, উখিয়া, শাহপরীর দ্বীপ ও টেকনাফ উপজেলার সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে। আর দেশটির রাখাইন রাজ্য ও চীন রাজ্য বাংলাদেশ সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত।




