দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী হাজারো মানুষের কান্না

গতকাল রাতে বাসায় গিয়ে রামিসার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেন প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু রামিসা আক্তারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে বাসায় গিয়ে তিনি শিশুটির বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেন। পাশাপাশি শিশুটির বড় বোন রাইসা আক্তারের লেখাপড়াসহ সব দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাসও দেন।
এ তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং। অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বললেন, সরকারপ্রধানকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শোকে কাতর রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। তাকে সান্ত্বনা দেন তারেক রহমান। রামিসার বাবা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘আমরা এখানে নোংরা পরিবেশে আছি বলে মেয়েকে হারাতে হয়েছে। আমরা একটা ভালো পরিবেশে বড় মেয়েটাকে নিয়ে বাস করতে চাই।’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ঠিক আছে। আপনাদের একটা ভালো পরিবেশে থাকার বিষয়টি আমি দেখব।’
রামিসার বাবাকে সরকারপ্রধান অর্থ সহায়তা দিয়েছেন উল্লেখ করে অতিরিক্ত প্রেস সচিব জানালেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তারা দ্রুত এ মামলার চার্জশিট দেবেন এবং যাতে দ্রুত বিচার হয়, সেজন্য আদালতকে সহযোগিতা করবেন।
এই সংক্ষিপ্ত সফরে সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এ কে এম শামসুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল আলম খান মিল্টন প্রমুখ।
এদিকে গতকাল দুপুর ১টা। পল্লবীর বি-ব্লকের ৭ নম্বর লাইনের ৩৯ নম্বর বাড়ির সামনে শত শত মানুষ। নিষ্পাপ একটি ফুলের জন্য শোকের মাতম ছিল এলাকা জুড়ে। কেউ তাকিয়ে ছিলেন নিস্তব্ধ অবুঝ চোখে ভবনের দিকে, আবার কেউ রামিসার স্মৃতিগুলো নিয়ে কথা বলেছেন গণমাধ্যমের সঙ্গে।
বাসার পাশে পপুলার মডেল হাইস্কুলেও ছিল শোকের ছায়া। রামিসার স্মরণে একগুচ্ছ ফুল রাখা হয়েছিল তারই বসার বেঞ্চে। সহপাঠীদের চোখে ছিল প্রিয়জন হারানোর অশ্রু; যেন একটি ফুলের জন্য হাজার ফুলের কান্না।
রামিসার নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশ জুড়ে হয়েছে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ। অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে।
দ্বিতীয় শ্রেণির ফার্স্ট গার্ল ছিল রামিসা। গত সোমবার স্কুলের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার রেজাল্টে প্রথম হয়েছিল সে। পরদিন মঙ্গলবার সহপাঠী-বন্ধুদের চকলেট ও মিষ্টি খাওয়ানোর কথাও ছিল। কিন্তু স্কুলে আর ফেরা হয়নি তার।
রামিসার মৃত্যুতে গতকাল দুপুরে স্কুল প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। ‘পপুলার মডেল হাইস্কুলের শিক্ষার্থী রামিসা হত্যার বিচার চাই, হত্যাকারীর জনসম্মুখে ফাঁসি চাই’— এমন ব্যানার নিয়ে তারা অংশ নেন কর্মসূচিতে। সেখানে রামিসার জন্য করা হয় দোয়া।
মানববন্ধনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুনে লেখা ছিল ‘খুনি সোহেল রানা ও স্বপ্না বেগমের ফাঁসি চাই’, ‘রামিসা আক্তার, শ্রেণি: দ্বিতীয়, রোল: ০১’, ‘রামিসা হত্যার বিচার চাই’সহ বেশ কিছু দাবি।
এ সময় স্কুল প্রাঙ্গণ ভারী হয়ে ওঠে শোক ও ক্ষোভে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেছেন, ‘কখনো প্রথম, কখনো দ্বিতীয় হয়েছে সে। তার পুরস্কারগুলো এখনো আমাদের এখানে রয়েছে। আমরা রামিসা হত্যার বিচার চাই।’
রামিসার বাসার সামনে খেলার সাথী মিম ও অঙ্কিতার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারাও বান্ধবীর মৃত্যুর বিচার চায়।
রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে পল্লবী এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালের (বিইউপি) শিক্ষার্থীরাও। একই দাবি জানিয়েছে ৭১টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্ম সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি। এছাড়া ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আজিমপুর ক্যাম্পাস গেটের সামনে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী নেটওয়ার্কের উদ্যোগে হয় মানববন্ধন।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা না গেলে সমাজে খারাপ বার্তা যাবে। এক সপ্তাহের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।






