এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা কেন করছেন বিশেষজ্ঞরা?

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হাম পরিস্থিতির উন্নতি হতে না হতেই হাসপাতালগুলোয় বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। সরকারি হিসাবে, এ জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা এরই মধ্যে ছয় হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যাদের মধ্যে অর্ধেকই আক্রান্ত হয়েছে গত এক মাসে।
ওই সময়ের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যাও আগের কয়েক মাসের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সামনের কয়েক মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও নিহতের সংখ্যা বেড়ে পরিস্থিতি ‘মারাত্মক রূপ’ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
‘বিশেষ করে, চলতি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। ওই সময় আক্রান্ত এবং মৃত্যু— উভয়ই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে,’ বলছিলেন মশা গবেষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামনে যে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, সরকার নিজেও সেটি স্বীকার করছে। সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
‘দুই মাস ধরে জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত আমরা পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে আসছি। এ ছাড়া, মশার লার্ভা মারার জন্য একটা বিশেষ ট্যাবলেট পাওয়া যায়। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেগুলো আমরা জোগাড় করতেছি লার্ভা মারার জন্য,’ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
সেইসঙ্গে, ডেঙ্গুতে মৃত্যু ঠেকাতে সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষ ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখাসহ চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
হাসপাতালের পরিস্থিতি কেমন?
ঢাকার বাসাবো এলাকার একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাইয়াজ আহমেদ রাতুল। তিন দিন আগে হঠাৎ করেই তার শরীরে তীব্র জ্বর দেখা দেয়। ওষুধ খাওয়ানোর পরও তাপ কমার লক্ষণ না দেখে পরদিনই রাতুলকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় পরিবার।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন, শিশুটি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত।
‘এটা শোনার পর আর বাসায় যাইনি। ছেলের সঙ্গে দুই দিন হাসপাতালে আছি,’ বলছিলেন রাতুলের মা রেবেকা খাতুন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি বছর আড়াইশর বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে।
তাদের বেশিরভাগই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও প্রাণে বাঁচানো যায়নি অন্তত দুজনকে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ডজনখানেক ডেঙ্গুরোগী ভর্তি রয়েছেন, যাদের প্রায় সবাই এসেছেন চলতি সপ্তাহে।
ঢাকার অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোয় বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা।
বিশেষ করে এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই ডেঙ্গু ওয়ার্ড নতুন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, বলছিলেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজারই আক্রান্ত হয়েছে গত জুন মাসে। ওই এক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা ৫ থেকে বেড়ে ১৯ জন হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ঢাকার পাশাপাশি বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ এবং রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
এর মধ্যে ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহ বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অন্তত পাঁচজন মারা গেছে।
বেড়েছে লার্ভা
বাংলাদেশে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়। সেজন্য বর্ষার আগেই এডিস মশার প্রজনন ও ঘনত্বের ওপর জরিপ চালিয়ে ডেঙ্গুর পূর্বাভাস দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ ধরনের জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এর বাইরে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে আরেকটি জরিপ হয়েছে।
এই তিন জরিপেই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় অন্য বছরের চেয়ে বেশি মাত্রায় এডিস মশার লার্ভা বা শূককীটের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
‘অন্য বছর যেখানে ব্রুটো ইনডেক্স থাকে ১০ বা ১২, এ বছর সেটা দ্বিগুণ-তিনগুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে,’ বলছিলেন মশা গবেষক অধ্যাপক বাশার।
ব্রুটো ইনডেক্স বা বিআই দিয়ে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয়। এ ক্ষেত্রে মশার প্রজনন উৎস, অর্থাৎ যেসব জায়গায় মশা ডিম পাড়তে পারে, সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা হয়।
অতীতের জরিপগুলোয় প্রতি ১০০ প্রজনন উৎসের মধ্যে সাধারণত দশ বা এর কাছাকাছি সংখ্যায় মশার লার্ভা পেয়েছেন গবেষকরা। কিন্তু এ বছর সেটি কয়েক গুণ বেড়েছে।
এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জরিপে নর্দমা, নালা, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোল, বাড়ির বেজমেন্টসহ এডিস মশার অন্যান্য প্রজননস্থলে লার্ভার বিআই গড়ে ৪০-এর ওপরে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই ব্রুটো ইনডেক্স ছিল ২০ এর ওপর।
অন্যদিকে, অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর ও কক্সবাজার জেলায় মশার লার্ভার পরীক্ষা হয়।
এর মধ্যে কক্সবাজারে ৪৩, বরিশালে ৩৪ এবং পিরোজপুরে প্রায় ৪৩ বিআই পাওয়া গেছে।
‘এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ধ্বংস করা না হলে এসব লার্ভা থেকে এডিস মশা জন্ম নিয়ে আগামী দুই মাসের মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বেশ খারাপ পর্যায়ে চলে যেতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি,’ বলেছেন অধ্যাপক বাশার।
এডিস মশা বাড়ছে কেন?
ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যে এডিস মশার বংশবিস্তার যে ক্রমেই বাড়ছে, সেটার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর একটি হচ্ছে এডিস মশার জন্য অনুকূল আবহাওয়া, বলেছেন অধ্যাপক বাশার।
এই গবেষক বলছেন, উচ্চ তাপমাত্রা এবং ঘন ঘর বৃষ্টিপাত এডিসের বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে।
‘ঘন ঘন বৃষ্টির ফলে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। তখন এডিস মশা সেখানে ডিম পাড়ে এবং সহজে বংশবিস্তার করে,’ যোগ করেন অধ্যাপক বাশার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার বংশবিস্তারের এই প্রক্রিয়া নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত চিন্তার কিছু থাকে না, যতক্ষণ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে লার্ভাগুলো ধ্বংস করা যায়। কিন্তু যখন সেগুলো নষ্ট করা যায় না, তখনই আসলে বিপদ দেখা দেয়।
‘আমাদের এখানে সেটাই বেশি হচ্ছে,’ বলেছেন কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই গবেষক বলেছেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে স্থানীয় সরকার ভেঙে পড়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে সিটি করপোরেশন বা উপজেলায় জনপ্রতিনিধিরা নেই। ফলে মশা নিধনের কাজ সেভাবে হয়নি না। সেজন্য মশা বেড়ে গেছে।’
বর্তমানে সারা দেশে এডিস মশার যেসব লার্ভা রয়েছে, সেগুলো ধ্বংস করা সম্ভব না হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন অধ্যাপক বাশার।
কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে যেভাবে বেগ পেতে হচ্ছে, এর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।
‘আর বিপর্যয় নেমে আসা মানেই বহু মানুষের নিশ্চিত মৃত্যু। এগুলো ভালোমতো মোকাবিলা করার প্রস্তুতি ও দক্ষতা সরকারের নেই। সেজন্য বিপর্যয় ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত,’ বলছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বর যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য মশা নিধনের বিষয়ে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছি। এটিকে একটি জরুরি নাগরিক সেবা ও জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি,’ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম।
এক্ষেত্রে জরিপের ফল আমলে নিয়ে ঢাকা দক্ষিণে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ২৭টি ওয়ার্ডে গত মাসে পাঁচ দিনব্যাপী ‘মশক নিধন ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
একই সঙ্গে, মাঝারি ও সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতেও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং মশা ও লার্ভা মারার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে বলে জানানো হয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, মশা নিধনের পাশাপাশি ডেঙ্গুর চিকিৎসায় তারা হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করছেন।
বিভিন্ন হাসপাতালে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জ্বর কমে গেলেও সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীকে ছাড়পত্র না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্লাজমা লিকেজ হয়ে রোগীর মৃত্যু ঠেকানো যাবে, বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।




