বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠক
গণভোটে সংবিধানের মৌলিক সংশোধন, ফিরছে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’
- জানুয়ারিতে সংশোধন বিল
- প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য চান সাংবাদিকরা, ঐকমত্যে সংবিধান সংশোধনের আহ্বান

সংগৃহীত ছবি
বিদ্যমান সংবিধানে মৌলিক কোনো সংশোধন আনা হলে তা গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ বেশ কিছু অনুচ্ছেদে আসবে পরিবর্তন। আর আগামী বছরের জানুয়ারির অধিবেশনেই (বছরের প্রথম অধিবেশন) সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করা হতে পারে জাতীয় সংসদে। এ লক্ষ্যে সব অংশীজনের মতামত নিয়ে বিলটি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে বিশেষ কমিটি।
আজ রবিবার জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠকে কমিটির পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারীদের এ কথা জানানো হয়েছে। বৈঠকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা অংশ নিয়ে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে মতামত দেন। দুপুর আড়াইটায় শুরু হয়ে বৈঠক চলে বিকাল সোয়া ৫টা পর্যন্ত। প্রসঙ্গত, জুলাই জাতীয় সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত।
বৈঠক শেষে দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সংবিধান সংশোধনের পর আবারও গণভোট আয়োজনের কথা জানিয়েছে বিশেষ কমিটি। কমিটির প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানেও বলা আছে— মৌলিক পরিবর্তন করতে হলে গণভোটে যেতে হয়। এবার যেহেতু মৌলিক পরিবর্তন হবে, তাই আবারও গণভোট দিতে হবে। এটি হবে সাংবিধানিক গণভোট।
বৈঠকে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে সর্বোচ্চ আস্থায় নিয়ে কমিটির বৈঠকে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
মুস্তাফিজ শফি বলেন, সাংবাদিকদের এ আহ্বানের জবাবে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে বিরোধী দলকে উপস্থিত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। তবে তারা বৈঠকে উপস্থিত হয়ে মতামত না দিলেও সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল নিয়ে আলোচনায় অংশ নেবে বলে আশা করছে বিশেষ কমিটি।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। কমিটিতে বিরোধী দল থেকে পাঁচ প্রতিনিধি চাওয়া হলেও তারা নাম দেয়নি। ওই কমিটিও প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী দল।
মুস্তাফিজ শফি জানান, বৈঠকে প্রায় ৫০ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। শুরুতে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য দেন। তিনি সাংবাদিকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে এসব মতামত যাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সে জন্যই তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানান।
দেশ রূপান্তর সম্পাদক বলেন, সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সবাই বলেছেন, সংবিধান সংশোধন জাতীয় ঐকমত্যের বিষয়। বিরোধী দল এই কমিটিতে নেই এবং তাদের মতামতও পাওয়া যায়নি। এ কারণে বিরোধী দলকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনার বিষয়েও মতামত দেওয়া হয়েছে বলে জানান মুস্তাফিজ শফি। তিনি বলেন, সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে যে বিশাল ও একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা রাষ্ট্র ও জাতির জন্য ভালো হয়নি বলে মত দিয়েছেন সাংবাদিকরা। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসতে সংবিধান সংশোধনে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে সংবিধানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও বিশেষ কমিটির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানান এই সম্পাদক।
এ ছাড়া নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনোভাবে এ ব্যবস্থা বাতিল করার সুযোগ না থাকে, সেজন্য সংবিধানে কঠোর ব্যবস্থা রাখার আহ্বান জানানো হয় বৈঠকে।
বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় সংসদের গণমাধ্যম সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন হতে পারে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ বেশ কিছু অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আসবে। এসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণভোটের প্রয়োজন হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, বিভিন্ন জার্নালিস্ট ফোরামের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে তফসিল এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। অনেকেই লিখিত প্রস্তাব দেবেন। এসব প্রস্তাব ও আলোচনা রিপোর্ট ও পুস্তিকা আকারে প্রণয়ন করা হবে।
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্পাদকদের অনেকেই বিরোধী দলের সদস্যদের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরাও এর সঙ্গে একমত। আমরা তাদের বারবার আহ্বান জানিয়েছি এবং এখনো জানাই। তারা কমিটিতে যোগ দিলে আমরা স্বাগত জানাব। আমরা চাই— আমাদের মধ্যে কোনো বিভক্তি না থাকুক, ঐকমত্যের ভিত্তিতেই আমরা কাজ করতে চাই।
গণভোট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চব্বিশের ৫ আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী বাতিল হওয়ায় ১৪২ অনুচ্ছেদটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সংবিধানে এমন কিছু পরিবর্তন আসতে পারে যেমন প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে অবশ্যই জনগণকে গণভোট দিতে হবে। বিল পাসের পর এই সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সুরক্ষায় গণভোটের প্রস্তাব প্রসঙ্গে বিশেষ কমিটির সভাপতি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য তারা ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে, ভবিষ্যতের কোনো সংসদ যেন তা সহজে বাতিল করতে না পারে, সেজন্য এ-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোতে সংশোধনী আনতেও যেন গণভোটের প্রয়োজন হয়, সেই বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান সংশোধনে অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের অগ্রাধিকার হলো জুলাই জাতীয় সনদ। তবে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ম্যান্ডেট পাওয়া বিষয়গুলোও আমরা ধারণ করব। সংবিধানে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’, যা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রস্তাবনায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে অনুচ্ছেদ ৮-এ যুক্ত করেছিলেন, তা আমরা ফিরিয়ে আনব। এটি আমাদের ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি।
সংবিধান সংশোধনের সময়সীমা সম্পর্কে কমিটির সভাপতি জানান, এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপনের জোর প্রচেষ্টা চলছে। ওই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আইন মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিল আসবে। আশা করা যাচ্ছে, জানুয়ারির অধিবেশনে (বছরের প্রথম অধিবেশন) বিলটি সংসদে আসতে পারে। এরপর বিলের ওপর আলোচনা ও সংশোধনী শেষে পাস হলে গণভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, কমিটির সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, কমিটির সদস্য সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।



